সিঙ্গাপুরে জঙ্গী সনাক্তকারী জসিমের পরিবার বিস্মিত!

সিঙ্গাপুরে জঙ্গী সন্দেহে গ্রেফতার হওয়া জসিমের পরিবার বিষয়টি কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছে না। পরিবার কেন গ্রামের লোকজনও বিস্মিত! পরিবারের কেউ কল্পনাও করতে পারেননি জঙ্গীর সাথে সম্পৃক্ততা রয়েছে জসিমের। অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশুনার সময়ই সিঙ্গাপুরে যান। সেখানে কাজ করছেন প্রায় চার বছর ধরে। এলাকায় ছোট বেলা থেকেই ধর্মিক এবং ভালো ছেলে হিসাবে পরিচিত জসিম। পরিবারের ছোট ছেলে জসিমের এই পরিনতিতে নির্বাক তার বৃদ্ধ মা জগুনা বেগম (৬০)। এই মায়ের কথা বলতে গিয়ে বুক ফেটে যাচ্ছিল। আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “মানুষ সন্দেহ করে এটি করেছে। অনর্থক জেল খাটাচ্ছে। সিঙ্গাপুরে একটি পরীক্ষা দিয়ে ভালো রেজাল্ড করে। এরপরই শত্রুতা বশতঃ ওকে এর মধ্যে জড়িয়েছে। আট হওয়ার আগের দিন সকালেও কথা হয়। বলে- ‘মা আমি পরীক্ষায় ভালো করেছি, এখন ছুটিতে দেশে আসতে পারবো।’ কিন্তু চার বছর পরে দেশে আসলো ঠিকই কিন্তু মায়ের সাথে দেখা হলো জেল খানায়। গেল মাসে ঢাকা কেন্দ্রীয় ছেলের সাথে দেখা হয়েছে। সেই দৃশ্য বলতে গিয়ে কেদে ফেলেন জগুনা বেগম। কাজে থেকে বাসায় আসছে মাত্র। এরই মধ্যে পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায়। সেই কাপড়েই দেশে ফেরত পাঠায়। জসিম কোন ভাবেই এর সাথে জড়ি না। আমার ছেলেকে আমি চিনি ও কখনও মিথ্যা কথা বলে না।

আটক হবার পর সিঙ্গাপুরে পরিচিত অন্যরা তার মেয়েকে জানায়। পরিবারের অন্য সদস্য বিষয়টি জানলেও তাকে (মা) জানানো হয় ১৫/১৬ দিন পর। নিয়মিত ফোন করতো। কিন্তু ফোন না করাতেই জানতে চায় জসিমের অবস্থা। পরে তাকে জানায়। এরপর থেকেই তার কষ্টের যেন সিমা নেই।

জসিমের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলায়। সিরাজদিখান উপজেলার জৈনসার ইউপির চাইনপাড়া গ্রামের বাসিন্দা পরিবারটি। নি¤œ মধ্য বৃত্তের এই পরিবারের আনন্দের পরিবর্তে এখন কান্নার রোল। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে সবার ছোট জসিম। বাবা কাজী শেখ প্রায় এক যুগ আগে মারা গেছেন। অনেক কষ্টে পরিবারের এই অবস্থানে নিয়ে আসেন মা জগুনা বেগম। জসিমের তিন ভাই প্রবাসী। বড় ভাই জব্বর শেখ মালেশিয়ায় আছেন দু বছর ধরে। তবে প্রথম বিদেশে যান মেঝ ভাই জহিরুল ইসলাম। তিনি সৌদি আরবে আছেন প্রায় ছয় বছর। তার সহযোগিতায়ই জসিম এবং জব্বর শেখ বিদেশে যান।

চাইনাপাড়া গ্রামের (৭ নং ওয়ার্ডের) সাবেক ইউপি মবজল শেখ বলেন, জসিমদের পরিবার গরীব হলেও সম্ভান্ত। কোন আজেবাজে দিকে নেই। তাই বাবা না থাকা সত্ত্বেও পরিবারটি ভালোর দিকে যাচ্ছে। আর জসিম ছিল গ্রামের সবার মধ্যে ব্যতিক্রম। সে কোনদিনও অন্যায় তোদূরের কথা সাতে-পাচেও নেই। ছোট বেলায়ই বিদেশ গেছে।

পারিবারিক সূত্র জানায়, পাশের খিদিরপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছে জসিম। অষ্টম শ্রেণিতে পরার সময়ই বিদেশে চলে চায়। বাস্তবে জমিরে বয়স কুড়ি বছরের বেশী হবে না। কিন্তু পাসপোর্টে বেশী বয়স দিয়ে বিদেশ যায়।

জসিমের বড় ভাইয়ের স্ত্রী শাহনাজ বেগম বলেন “অতিভদ্র এবং ভালো একটি ছেলে জসিম, আমার স্বামীর ব্যপারেও গ্যারান্টি দিতে পারবো না, কিন্তু জসিমের ব্যাপারে এক বাক্যে বলতে পারি ও কোন খারাপ কাজে যেতেই পারে না। পরিবার জসিম নিয়মিত নামাজ পড়ে।

চাইনপাড়া আবু সায়েদ মেম্বারও অকপটে বলেন, জসিম জঙ্গী হতেই পারে না। জৈনসার ইউপি সচিব মো. শফিকুল ইসলাম খালেক বলেন, “ নানাভাবে জসিম সম্পর্কে খোঁজ খবর করেছি। সবাই জসিমকে ভালো বলেছে। দেশে থাকতে জঙ্গীতো দূরের কথা কোন অন্যায়ের ধারে কাছেও ছিল না। মাদ্রাসায় পড়াশুনা করেনি, তারপরও গ্রামের মসজিদে নামাজও পড়িয়েছে।

জগুনা বেগমের একমাত্র মেয়ের বিয়ে হয়েছে। থাকে স্বামী বাড়ি। তিন ছেলেই বাইরে। এখন আট বছরের নাতি আর ছেলে বউ নিয়ে বাািড়তে থাকেন। মেঝ বৌ সন্তান জন্ম দিয়েছে ক’দিন আগে। তাই বাবার বাড়িতে থাকছেন।

বেশ কয়েক বছর ধরে পরিবারের তিন ভাই বিদেশে থাকলেও অর্থনৈতিক অবস্থায় খুব উন্নতি হয়নি। সাধারণ-টিন কাঠের ঘরে বসবাস। সাধারণ পরিবার। বিদেশে যাওয়ার আগে তিন ভাই কৃষি কাজের সাথেই জড়িত ছিলেন। ভালো জায়গায় বোনকে বিয়ে দিয়েছেন। এখন সংসারের উন্নতিতে তিন ভাই চেষ্টা চালাচ্ছিলেন। কিন্তু হোচট খেয়ে এখন নির্বাক।

জনকন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.