নারায়ণগঞ্জে সেই প্রধান শিক্ষককেই সাময়িক বরখাস্ত!

নারায়ণগঞ্জে কান ধরে উঠবস করিয়ে যে প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে অবমাননা করা হয়েছে, তাকেই শেষ পর্যন্ত সাময়িক বরখাস্ত করা হলো। মঙ্গলবার সকালে ম্যানেজিং কমিটির পাঠানো এ সংক্রান্ত চিঠি হাতে পাওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত।

নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার কল্যান্দীতে অবস্থিত পিয়ার সাত্তার লতিফ স্কুলের প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত। চারটি সুনির্দিষ্ট কারণ উল্লেখ করে স্কুল ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি ফারুকুল ইসলাম স্বাক্ষরিত চিঠিতে তাকে বরখাস্তের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। যদিও এর আগে স্থানীয় সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানকে দেওয়া এক চিঠিতে তাকে পুনর্বহাল রাখার আবেদন করেছিলেন শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্ত।

নারায়ণগঞ্জে শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তকে পাঠানো সাময়িক বরখাস্তের চিঠি

স্বাক্ষরের নিচে ১৬ মে ২০১৬ ইং লেখা থাকলেও চিঠির ওপরের ডানদিকে ১৩ মে উল্লেখ করা রয়েছে। মঙ্গলবার সকালে নারায়ণগঞ্জ ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বরখাস্তের চিঠি হাতে পান শ্যামল কান্তি ভক্ত।

চিঠিতে শ্যামল কান্তি ভক্তকে উদ্দেশ করে লেখা হয়,‘আপনার বিরুদ্ধে আনীত নিম্ন বর্ণিত অভিযোগসমূহ অদ্যকার পিয়ার সাত্তার লতিফ স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভায় উত্থাপিত হয়।

১। আপনি ছাত্রদের ওপর শারীরিক নির্যাতন করেন।
২। বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে চাকরি দেওয়ার নাম করে অর্থ গ্রহণ করেছেন।
৩। ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেছেন।
৪। বিদ্যালয়ের ছুটি ব্যতিরেকে অনুপস্থিত থাকেন এবং প্রায়ই দেরি করে বিদ্যালয়ে আসেন।

পূর্বেও এসব অভিযোগ আপনার বিরুদ্ধে উত্থাপিত হয়েছে এবং আপনাকে বহুবার সতর্ক করা হয়েছে। কিন্তু আপনি এরূপ অবৈধ কর্মকাণ্ড থেকে বিরত হননি। তাই ১৩ মে ২০১৬ইং তারিখের ম্যানেজিং কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত মোতাবেক আপনাকে পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।’

তবে এ ব্যাপারে ফারুকুল ইসলামের মোবাইলে ফোন দিলে সেটা বন্ধ পাওয়া যায়। তিনি দেশের বাইরে রয়েছেন জানা গেছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মৌসুমি হাবিব জানান, বিষয়টি স্কুল কর্তৃপক্ষের ম্যানেজিং কমিটির বিষয়।

এর আগে গত ১৫ মে সংসদ সদস্য সেলিম ওসমানকে দেওয়া চিঠিতে শ্যামল কান্তি ভক্ত উল্লেখ করেছেন, ‘গত শুক্রবার ১৩ মে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিক্ষুদ্ধ স্থানীয়দের জনরোষ থেকে আমাকে উদ্ধার করে আমার জীবন রক্ষা করায় আমি এবং আমার পরিবারের সকল সদস্য আপনার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। আমি বিগত দিনে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার কমরআলী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে ৮ বছর, মুন্সিগঞ্জ জেলার বাংলাবাজার বানিরাল মাল্টিলেটারাল হাইস্কুলে ২ বছর এবং বন্দরের পি আর সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয়ে দীর্ঘ ১৫ বছর যাবত সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করে আসছি। আমার বিরুদ্ধে কোথাও কোনও দুর্নীতির অভিযোগ নেই। আমাকে পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে আমার স্থানে অন্য কাউকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে এবং আমার কাছ থেকে জোর করে পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষর রেখে আমার যাবতীয় শিক্ষাগত ও অভিজ্ঞতার মূল সনদ এবং বিদ্যালয়ের যাবতীয় চাবি আমার কাছ থেকে রেখে দেওয়া হয়েছে।

এমতাবস্থায় আপনার কাছে আবেদন এই যে, আমার পারিবারিক অবস্থা বিবেচনা করে আমাকে চাকুরিতে পুনর্বহাল করা হোক। আমার কাছ থেকে জোর পূর্বক গ্রহণ করা পদত্যাগ পত্র এবং আমার যাবতীয় প্রয়োজনীয় কাগজপত্র উদ্ধার করে আপনি সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে আমাকে ষড়যন্ত্রের হাত থেকে রক্ষা করার দাবি জানাচ্ছি। সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আমি যে কোন ধরনের সহযোগিতা করতে বাধ্য থাকবো। পাশাপাশি আমার শারীরিক অসুস্থতার জন্য আমাকে ১ মাসের ছুটি প্রদানের জন্য বিনীত নিবেদন রাখছি।’

এদিকে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন শ্যামল কান্তি ভক্ত জানান, ‘আমি স্কুলের শুরু থেকেই চাকরি করে আসছি। কলাগাছিয়ার অনেকেই আমার ছাত্র। টিনের স্কুল ঘরকে তিলে তিলে ভবনে পরিণত করা হয়েছে। কিন্তু গত কয়েক মাস ধরেই স্কুলের ম্যানেজিং কমিটি চাচ্ছে না আমি ওই প্রধান শিক্ষক পদে থাকি। তারা চেয়েছিল আমি তাদের পকেটের লোক থাকি। এসব নিয়ে বিরোধ ছিল। এছাড়া স্কুলের দেয়াল ধসসহ স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফারুকুল ইসলামের বোন পারভীন আক্তারকে প্রধান শিক্ষক করতেই মূলত চেষ্টা করা হয়। এছাড়া স্কুলের ব্যবস্থাপনা কমিটির তিনজন সদস্য মতিউর রহমান, মিজানুর রহমান ও মোবারক হোসেন এ তিনজন মিলেই আমাকে পদচ্যুত করার সর্বাত্মক চেষ্টা করে। পুরোটা পরিকল্পিত ও সাজানো। আমি আসলে পলিটিক্স বুঝতে পারি নাই। সে কারণেই আমার ওপর অপবাদ দেওয়া হয়। মতিউর রহমানের নেতৃত্বে মিজানুর রহমান ও মোবারক হোসেন মিলেই শুক্রবার হামলা চালায় এবং তাকে মারধর করে। সেদিন আমার প্রাণনাশের জন্য হামলা চালানো হয়েছে। মতিউর রহমান আমাকে শায়েস্তা করা হবে বলে ঘটনার একদিন আগে হুমকি দিয়েছিলেন। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি চায় প্রধান শিক্ষক তাদের ছাড় দিক। কিন্তু তিনি ছাড় দিতেন না। এই কারণে তারা তাকে নানা সময় বকাঝকা হুমকি ধামকি ও মারধর করতে গেছে।’

শুক্রবারের ঘটনায় শ্যামল কান্তি ভক্তকে এমপি সেলিম ওসমান কানে ধরে উঠ-বস প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন, আমাকে পিয়ার সাত্তার লতিফ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে আমার স্থানে অন্য কাউকে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করা হয়েছে এবং আমার কাছ থেকে জোর করে পদত্যাগ পত্রে স্বাক্ষর রেখে আমার যাবতীয় শিক্ষাগত ও অভিজ্ঞতার মূল সনদ এবং বিদ্যালয়ের যাবতীয় চাবি আমার কাছ থেকে রেখে দেওয়া হয়েছে। ওই সময়ে স্থানীয়দের জনরোষ থেকে এমপি মহোদয় আমাকে উদ্ধার করেন। তখন আমার আসলে হিতাহিত জ্ঞান ছিল না।

অভিযোগ অস্বীকার
স্কুলের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ফারুকুল ইসলাম বর্তমানে দেশের বাইরে আছেন। অন্যদিকে সহকারী প্রধান শিক্ষক পারভীন আক্তার ও ব্যবস্থাপনা কমিটির মতিউর রহমান তাদের বিরুদ্ধে প্রধান শিক্ষকের আনা অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন। বলেছেন, ‘আমরা কোনভাবেই প্রধান শিক্ষককে পদচ্যুত অপসারণের চেষ্টা করি নাই। বিষয়গুলো প্রশাসনিক তদন্ত চলছে।’

বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সদস্য মোবারক হোসেন বলেন, নিয়মিত ম্যানেজিং কমিটির সভা শুরু হলে কমিটির সদস্য মতিউর রহমানের মাধ্যমে অভিযোগ দেওয়া হয় এক স্কুল ছাত্রকে মারধর করা হয়েছে। এই অভিযোগের বিষয়ে স্কুল ছাত্র ও তার মাকে ডাকা হয়। এখানে আমাদের কোনও ধরনের উস্কানি নাই।

বাংলা ট্রিবিউন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.