নয় বোনের এক ভাইকে খুনের গল্প

একে একে নয় মেয়ের জন্ম। এরপর ঘর আলো করে আসে ছেলে। তাই মা–বাবা তো বটেই, বোনদেরও তাঁর প্রতি ছিল অন্য রকম ভালোবাসা। নয় বোনের একমাত্র এই ভাইটিকে খুন করা হয় তিন বছর আগে। সেই খুনের মামলার প্রধান আসামিসহ সাতজন খালাস পেয়েছেন। আর সাজা হয়েছে পাঁচজনের।

ঢাকার ৩ নম্বর দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক সাঈদ আহমেদ বৃহস্পতিবার এই রায় ঘোষণা করেন। এঁদের মধ্যে তিনজনের যাবজ্জীবন ও তিনজনের ১০ বছর কারাদণ্ড হয়েছে।

নয় মেয়ের পর একমাত্র ছেলের জন্ম। সেই ছেলে খুনের মামলায় প্রধান আসামি খালাস পেয়েছে। রায় শুনে হতাশ মা আনোয়ারা বেগম জানালেন, রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করবেন তিনি।

নয় বোনের একমাত্র সেই ভাইয়ের নাম আসাদুজ্জামান খন্দকার (৩৫ ‍)। পেশায় ছিলেন প্রকৌশলী। বাবা যখন মারা যান, তাঁর বয়স ছিল কম। তবে মা ও বোনেরা তাঁকে লেখাপড়া শেখায়। বৃদ্ধ মাকে সেবা করার জন্য ঢাকা শহরে বসবাস না করে গ্রামেই থাকতেন আসাদুজ্জামান। তবে গ্রামের জমি নিয়ে বিরোধ ছিল স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে। আর সেই বিরোধই তাঁর জীবনের কাল হলো। ২০১৩ সালের ২০ অক্টোবর মুন্সিগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার রাজানগর বাজারে খুন হন আসাদুজ্জামান। ওই এলাকারই স্থায়ী বাসিন্দা তিনি।

একমাত্র ভাইয়ের খুনের মামলায় প্রধান আসামির খালাস পাওয়ার কথা শুনে আদালত চত্বরেই আহাজারি করেন বোন চারুলতা।

ওই মামলার প্রধান আসামি লিটন চৌধুরীসহ সাতজন খালাস পাওয়ার রায় শুনে আসাদুজ্জামানের মা আনোয়ারা বেগম ও বোন চারুলতা খন্দকার আদালত চত্বরে কান্নায় ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে অচেতন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন চারুলতা। এ অবস্থা দেখে সেখানে আশপাশের লোকজন জড়ো হয়। তাঁদের সান্ত্বনাও দেয়।পরে চারুলতা আক্ষেপের সুরে তখন বলছিলেন, ‘আমাদের নয় বোনের একমাত্র ভাই ছিল ও (আসাদ)। বাবা মারা গেছেন ১৯৯৮ সালে। তখন ওর বয়স ছিল কম। দিশেহারা মা ও আমরা বোনেরা মিলে ভাইকে ঢাকায় পাঠিয়ে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং পাস করিয়েছি। এরপর ওকে বিয়ে দিয়েছিলাম। ছোট্ট একটা মেয়েও আছে। সেই ছোট ভাইকে ওরা হত্যা করেছে।’

নিহত আসাদুজ্জামান খন্দকার।

মামলার এজাহারে আসাদুজ্জামানের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, জমি নিয়ে এলাকার লিটন চৌধুরী ও অলিয়ার রহমানের সঙ্গে শত্রুতা ছিল। ঘটনার দিন আসাদুজ্জামান রাত ৯টার দিকে রাজানগর বাজারে যান। চায়ের দোকানের সামনে আচমকা আসামিরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। তদন্ত শেষে পুলিশ লিটন চৌধুরীসহ ১৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেন। দুই বছর আগে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে এ বিচার শুরু হয়। ২৩ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ নিয়ে আদালত এই রায় ঘোষণা করেন।

আসাদুজ্জামানের মা আনোয়ারা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার জন্মই যেন বৃথা। নয়-নয়টি মেয়ের পর কোল জুড়ে আল্লাহ আমাকে আসাদকে উপহার দিয়েছিল। সেই কলিজার টুকরাকে অনেক কষ্ট করে লেখাপড়া শিখিয়েছিলাম। আর সেই ছেলের লাশ আমার জীবদ্দশায় দেখতে হলো। যারা আমার ছেলেকে খুন করল তাদের অনেকেই পেল খালাস। প্রধান আসামিকে দেওয়া হয়েছে খালাস। আদালতের এই আদেশের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে আপিল করব।’

প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.