নকল চিপস কারখানাগুলো সচল ॥ প্রশাসন নিরব

এম.এম.রহমান: মুন্সীগঞ্জের সদর উপজেলার বিভিন্ন স্থানে নিয়মরীতির কোন তোয়াক্কা না করে গড়ে উঠেছে একাধিক নকল চিপস কারখানা। জেলা সদরের পঞ্চসার ইউনিয়নের পঞ্চসার, ভট্রাচার্যেরভাগ, দশকানি, কাশিপুর, গোসাইবাগ, বনিক্যপাড়া, ভূইয়াবাড়ী, কেপিরবাগসহ বিভিন্ন স্থানে প্রায় ১৫ টি ভেজাল ও নকল চিপস তৈরীর কারখানা রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষায় এটাকে রেডি চিপস বলে থাকে। এতে সব ধরনের উপাদান দেয়া থাকে বাসা বাড়ীতে এনে শুধু তেলে বাজলেই খাওয়া যায়। সেসব কারখানাগুলোতে ঈদকে সামনে রেখে অসাধু মালিকরা অবাধে তৈরী করছে নকল সেমাই।

সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্রে জানা যায়. কারখানা স্থাপন করতে প্রিমিসেস লাইসেন্স, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, পরিবেশের ছারপত্র, ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স, ট্রেড লাইসেন্স প্রয়োজন হয়। এসকল প্রয়োজনীয় কাগজপত্র না থাকলে কারখানা স্থাপন করতে পারবেনা। সরেজমিনে গিয়ে পঞ্চসার ইউনিয়নের দশকানিতে গোলাম মোল্লার চিপস কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, প্রশাসনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে লাইসেন্সবিহীন কারখানাগুলো অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশে আটা, ময়দা, রং এবং বিভিন্ন কেমিক্যাল মিশিয়ে তৈরী করছেন নকল রেডি চিপস। কারখানার ভেতরে নারী শ্রমিকরা অপরিস্কার-অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে প্যাকিংয়ের কাজ করছেন। বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন কালারের রং এর পাত্র, সোডা, ক্ষতিকার কেমিক্যাল ও মানব দেহের জন্য ক্ষতিকারক এ্যামুনিয়া জাতীয় পদার্থ। শ্রমিকরা খালি গায়ে ঘাম ঝড়ানো শরীরে আটা ময়দা পানি দিয়ে ভিজিয়ে দুই হাত দিয়ে মেশাচ্ছেন।

শ্রমিকদের আরেকটি গ্রুপ পানিতে গোলানো আটা ময়দার সাথে যাবতীয় পদার্থ মিশিয়ে মেশিনে দিচ্ছেন। এক মিনিটের মধ্যে মেশিন থেকে এক ইঞ্চি আকারের পাইপের মতো বের হচ্ছে। শ্রমিকরা সেগুলোকে কেটে টুকরা করেন। সেখান থেকে ডাইনিং রুমে নিয়ে বিভিন্ন কালারের রং এর ড্রামে চিপসগুলো ডুবিয়ে রাখেন। পাঁচ মিনিট পর সেগুলোকে বের করে রোধে শুকানোর জন্য টুকরিতে ভরে রাখে। এর পর নারী শ্রমিকরা সেগুলোকে কারখানার ছাদ, বা বিস্তির্ন খোলা মাঠে শুকানোর জন্য নিয়ে যায়। সেখানে নারী শ্রমিকরা সারাদিন পা দিয়ে একটু পর পর নাড়া দিয়ে থাকেন। সারাদিন শুকানোর পর চিপসগুলোকে পাটের তৈরী বস্তায় ভরে গোডাউনে মজুদ রাখেন। তাছাড়া এসব কারখানাগুলোতে বিভিন্ন প্রকার ভেজাল সেমাই তৈরী করতেও দেখা গেছে। একই এলাকার মোশারফ মিয়ার চিপস কারখানা, আহসানউল্লার সততা ফুড প্রডাক্টস, করিম শেখের আইরন চিপস ইন্ডাষ্টিজসহ প্রায় ৫টি কারখানায় ঘুরে একই চিত্র দেখা গেছে।

এসব কারখানার মালিকরা কোন বৈধ লাইসেন্স দেখাতে পারেনি। শুধুমাত্র ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ট্রেড লাইসেন্স নিয়ে চালাচ্ছেন তাদের কারখানাগুলো। ইতিপূর্বে এসব কারখানাগুলোতে ম্যাজিস্ট্রেট গিয়ে একাধিকবার আর্থিক জরিমানা করেছিল। তারা এখন আরো বেপরোয়া হয়ে তাদের উৎপাদনের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শ্রমিক বলেন, কারখানার মালিক আমাদের যেভাবে কাজ করতে বলেছে সেভাবে আমরা কাজ করতাছি। চিপসগুলোতে কি ধরনের রং আর কেমিক্যাল মেশানো হয় জবাবে শ্রমিকরা বলেন, ফ্রুডগ্রেডের রং এবং সাধারন খোলা রং বেশী ব্যবহার হয়।এসব রং খেলেতো সমস্যা হয়? জানি স্যার আমরা কি করবো মালিকের হুকুম পালন করি আমাদের কি দোষ?

নকল চিপস বিষয়ে কারখানার মালিক গোলাম মোল্লা নিকট জানতে চাইলে তিনি বলেন, আপনার সাংবাদিকরা কি করবেন? এখানে কতো ম্যাজিস্ট্রেট আসলো গেলো কিছুই করতে পারেনি আমাদের। প্রশাসন থাকে আমাদের পকেটে। যান আপনারা, যা মন চায় তা লিখেন গিয়ে।

উপজেলার স্যানেটারি ইন্সপেক্টর মুহাম্মদ জামাল উদ্দিন মোল্লা জানান, ইতিপূর্বে এসব প্রতিষ্ঠানগুলোতে চার-পাঁচবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছিল। আর্থিক জরিমানার পাশাপাশি তিনটি কারখানাকে সিলগালা করা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের কোন বৈধ লাইসেন্স বা বিএসটিআই এর কোন অনুমোদন নেই।

এ ব্যাপারে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট একেএম শওকত আলম মজুমদার বলেন, এসব কারখানাগুলোর বিরুদ্ধে আগেও একাধিকবার মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছিল। এ সাপ্তাহের মধ্যে এসব ভেজাল কারখানাগুলোতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হবে।

চমক নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.