সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী : সমাজ-রূপান্তরের কারিগর

ড. ফজলুল হক সৈকত: কল্যাণময় রাষ্ট্র ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় তিনি নিরলস সাধক। কথায়, জীবনাচরণে, লেখায় এবং সাংগঠনিক কাজে সবসময় তিনি লালন করেন পরিবর্তনকামী প্রবল এক চেতনা।

তার সংগ্রামের পথ ধরেই হয়তো বাংলাদেশে কোনো একদিন ঘটবে চিন্তার রূপান্তর এবং সংঘটিত হবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিপ্লব। জাতির চেতনা বিকাশে এ দিক-নির্দেশকের প্রেরণা ও উৎসাহ একদিন ঠিকই সবার সামনে আরো স্পষ্ট ও বোধগম্য হয়ে প্রকাশ হবে- এ মনীষীর জন্মদিনে এটুকু শুধু প্রত্যাশা

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (জন্ম : মুন্সীগঞ্জ ২৩ জুন ১৯৩৬) কর্মজীবনের প্রায় পুরোটা সময় ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক হিসেবে অ্যাকাডেমিক দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়িয়েছেন দীর্ঘদিন। পড়েছেন এবং পড়িয়েছেন ইংরেজি ভাষা। লিখেছেন বাংলা ভাষায়। সম্ভবত লেখক হওার চিন্তার কালে তিনি মাইকেলের ইংরেজিপ্রীতির কথা মনে করে থাকবেন। আর বোধকরি এও ভেবে থাকবেন যে, মধু কবি শেষপর্যন্ত অনুধাবন করতে পেরেছিলেন মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চার কোনো বিকল্প নেই। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সমকালের সতর্ক লেখক। অসামান্য খ্যাতিও অর্জন করেছেন গদ্যনির্মাতা এবং সাময়িকীর সম্পাদক হিসেবে। সমকালীন বাংলা ভাষার প্রথম সারির প্রাবন্ধিক তিনি। শুধু গদ্য রচনা নয়- গদ্যসাহিত্যে লেখক তৈরির ক্ষেত্রেও তার অবদান বেশ। ত্রৈমাসিক নতুনদিগন্ত সম্পাদনা করছেন দীর্ঘদিন ধরে। এই কাগজটির মাধ্যমে তিনি প্রায় নীরবে সমাজ রূপান্তরের অধ্যয়ন করে চলেছেন। শ্রেণিসংগ্রাম নিয়ে যারা ভাবেন ও লেখেন, তাদের একটি নির্ভরযোগ্য প্লাটফর্ম হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে পত্রিকাটি। বিশেষ ভাবধারার নতুন লেখক তৈরিতেও এর ভূমিকা স্মরণ করা যেতে পারে। শিক্ষক হিসেবে সমাজের প্রতি যে দায় ও দায়িত্ব রয়েছে, তার প্রতি তিনি সবসময় আন্তরিক ও শ্রদ্ধাশীল। নিরন্তর সাহিত্য-সাধনা, গবেষণা আর জাতির চিন্তা-বিকাশে দিক-নির্দেশনার মতো অভিভাবকীয় কাজ করে যাচ্ছেন এ পরিশ্রমী গবেষক, রাষ্ট্রচিন্তক ও সাহিত্য সমালোচক।

সাহিত্যের নানা কৌণিক সমাজলগ্নতা এবং মানুষের চিন্তাবৃত্তির বিকাশে শিক্ষা ও প্রতিবেশের ভূমিকা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ভাবনা-বলয়ের প্রধান প্রধান বিষয়। শিক্ষাকে উপায়-অবলম্বন ভেবে যেমন সমাজের-রাষ্ট্রের ইতিবাচক পরিবর্তন সম্ভব, তেমনই সমকালীন সমাজ রূপান্তরের ধারায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সংযোগে মানুষের জীবনযাপনকে আরো অর্থপূর্ণ করা চলে- এইসব অভিনব চিন্তার সাথে বোধকরি চৌধুরীর সাধনার একটা চমৎকার যোগসূত্র আছে। তিনি মিডিয়া-সন্ত্রাস, মানুষের নৈতিক অবক্ষয় এবং লোভ ও লাভের নেশাগ্রস্ত মানব-সভ্যতার বিপরীত স্রোতে চলতে অভ্যস্ত। অন্যকে তিনি কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে চান না- তার অভিলক্ষ্য হলো তরুণপ্রজন্মের সামনে অনুপ্রেরণা ও উৎসাহের দরোজাগুলোকে খুলে দেয়ার জন্য কাজ করে যাওয়া। জাতীয়তাবাদ চৌধুরীর সমাজলগ্নতার বিশেষ অধ্যায়। অবশ্য সমাজ কিংবা চলমান রাজনীতির নেতিবাচক দিকগুলো পরিবর্তনে চৌধুরীদের কথা ও পরামর্শ যে খুব বেশি কাজে লাগছে, তা কিন্তু নয়। কিন্তু তারপরেও তিনি থেমে নেই। নিজের ভাবনাবলয় খুলে ধরছেন সমকালের ও উত্তরকালের সচেতন মানুষের দরজায়।

বাঙালির জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, মানুষের অধিকার, রাষ্ট্রভূমি ও সমাজ ব্যবস্থার ক্রম পরিবর্তন ধারা প্রভৃতি প্রসঙ্গ চৌধুরীর লেখালেখির বিষয়-আশয়। তিনি মনে করেন- জাতীয়তাবাদের পক্ষে যেমন বিপক্ষেও তেমনই অনেক কিছু বলার আছে এবং থাকবে। জাতীয়তাবাদ আর দেশপ্রেম এক বস্তু নয়- জাতীয়তাবাদ অধিকতর রাজনৈতিক বিষয়। বাঙালির জাতীয়তাবাদ ভাষাভিত্তিক এবং আত্মরক্ষামূলক। একসময় এমন ধারণা ছিল যে, জাতীয়তাবাদ বাঙালিকে ঐক্যবদ্ধ করবে কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি। না ঘটার কারণ হচ্ছে সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রবল বৈষম্য। বৈষম্যের মুখ্য প্রকাশগুলোর মধ্যে রয়েছে সাম্প্রদায়িকতা ও শ্রেণিবিভাজন। সাম্প্রদায়িক কারণে বাংলা বিভক্ত হয়েছে, পরে প্রতিষ্ঠা ঘটেছে বাংলাদেশের, কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশেও সব বাঙালি যে ঐক্যবদ্ধ তা নয়, এখানে ঐক্যের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মানুষের সামাজিক দূরত্ব। সমাজচিন্তক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বিশ্বাস ঐক্যের অন্তরায়গুলোকে চিহ্নিত করতে পারলেই সামাজিক সাম্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব- অন্যথায় নয়।

স্বাধীন বাংলাদেশে এখনো অর্থনীতিতে, শিক্ষায়, নারীর রাষ্ট্রীয় অবস্থানে, শিশুর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় রয়েছে বিপুল বৈষম্য। ভাষার দায় গ্রহণের ব্যর্থতা, ধর্মনিরপেক্ষতা প্রতিষ্ঠায় বাঙালি মধ্যবিত্তের অপরাগতা আর আমলাতন্ত্রের অনাকাক্সিক্ষত প্রভাব বাঙালি সমাজে সম্প্রীতি স্থাপনে প্রধান প্রধান অন্তরায়। এসব অন্তরায় দূর করার উপায় বের করার কৌশল আবিষ্কার এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার নৈতিক সংগ্রাম- বুদ্ধিবৃত্তিক ও শিক্ষাকেন্দ্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার একটা প্রত্যয় চৌধুরীর লেখায় আমরা পাই। ইংরেজরা ভারত ছেড়েছে বটে কিন্তু আমরা ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে পারিনি। জাতীয়তাবাদী চেতনা ও ধারণা প্রতিষ্ঠা করার পরিবর্তে আমরা দিনে দিনে শ্রেণিসমাজ ও বৈষম্য সৃষ্টি করেছি। চিন্তার এবং বিশ্বাসের মূল স্রোতে থেকে আমরা ক্রমে ক্রমে দূরে সরে পড়েছি- এই কষ্ট কুরে কুরে খাচ্ছে চৌধুরীর মন ও মননকে।
গবেষক-প্রাবন্ধিক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রকাশিত গ্রন্থগুলোর নাম পাঠ করলেই আমরা তার চিন্তা পরিসর সম্বন্ধে ধারণা লাভ করতে পারি- জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি : ১৯০৫-১৯৪৭, উপরকাঠামোর ভেতরেই, রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি, দুই যাত্রায় এক যাত্রী, শেকসপীয়রের মেয়েরা, লিও টলস্টয় : অনেক প্রসঙ্গের কয়েকটি, দ্ইু বাঙালীর লাহোর যাত্রা, স্বাধীনতার স্পৃহা সাম্যের ভয়, বিচ্ছিন্নতার সত্য-মিথ্যা, রাষ্ট্র ও কল্পলোক, মাঝখানের মানুষেরা, কত মূল্য লইবে ইহার, উপনিবেশের সংস্কৃতি, নেতা জনতা ও রাজনীতি, লেনিন কেন জরুরী, বাঙালীর জয়-পরাজয়, ১৮৫৭ এবং তারপর, কালের সাক্ষী। চৌধুরীর লেখার মূল বিষয় রাজনীতি। তবে নিখাদ সাহিত্য চর্চায়ও তার সাফল্য ও খ্যাতি কম নয়। বিশেষ করে শেকসপীয়রের মেয়েরা, লিও টলস্টয় : অনেক প্রসঙ্গের কয়েকটি গ্রন্থগুলোর পাঠ থেকে অন্তত সে রকম ধারণাই আমরা পাই বটে। আবার ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ এবং আত্মীয়পরিজন ও বন্ধুবান্ধবদের বিষয়ে কিংবা যারা তাকে পথ দেখিয়েছেন, তাদের সম্পর্কে লিখতেও তিনি ভুল করেননি। মাঝখানের মানুষেরা তার একটি আত্মস্মৃতিমূলক বই।

সাহিত্যসেবক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সমকালে জাতির একজন একনিষ্ঠ অভিভাবক। কল্যাণময় রাষ্ট্র ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় তিনি নিরলস সাধক। কথায়, জীবনাচরণে, লেখায় এবং সাংগঠনিক কাজে সবসময় তিনি লালন করেন পরিবর্তনকামী প্রবল এক চেতনা। তার সংগ্রামের পথ ধরেই হয়তো বাংলাদেশে কোনো একদিন ঘটবে চিন্তার রূপান্তর এবং সংঘটিত হবে সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিপ্লব। জাতির চেতনা বিকাশে এ দিক-নির্দেশকের প্রেরণা ও উৎসাহ একদিন ঠিকই সবার সামনে আরো স্পষ্ট ও বোধগম্য হয়ে প্রকাশ হবে- এ মনীষীর জন্মদিনে এটুকু শুধু প্রত্যাশা।

নয়াদিগন্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.