গুলশান ট্র্যাজেডি ও জাপানিদের প্রতিক্রিয়া

রাহমান মনি: শনিবার বন্ধের দিন সাধারণত একটু বিলম্ব করেই ঘুম থেকে উঠা হয়। তার ওপর আবার ১ জুলাই শুক্রবার রাতটি জাপানে পবিত্র শবেকদরের রাত ছিল। স্বাভাবিক রাতের চেয়ে অনেক বেশি ইবাদত বন্দেগি করার কারণ এবং সকালে কোনো তাড়া না থাকার কারণে কিছু আয়েশ করে ঘুমাবার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু সকালেই জেলা পর্যায়ের একজন পদস্থ পুলিশ (জাপানি) কর্মকর্তার ফোনে ঘুম ভেঙে যায়।

আগের রাতে সন্ত্রাসী ঘটনা এবং জাপানি জিম্মি করার বিষয়ে বিশদ খোঁজ নিতে অনুরোধ জানান। তিনি বাংলাদেশ দূতাবাসে জরুরি প্রয়োজনে ‘হেল্প ডেস্ক’ খোলা রয়েছে মনে করে ফোন করেছিলেন। কোনো সাড়া না পেয়ে এবং পূর্ব পরিচয়ের সূত্রে আমাকে ফোন করেন এবং অনুরোধ জানান।

৩ ঘণ্টা সময়ের ব্যবধানজনিত কারণে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনাটি জাপানের মধ্যরাতে প্রকাশ পায় যখন আমি ইবাদতরত। তাই সর্বশেষ খবর জানা থেকে বঞ্চিত হই। ফোনটি রেখে কম্পিউটার ওপেন করেই নিউজ যা দেখতে পেলাম তার জন্য কখনোই প্রস্তুত ছিলাম না। প্রিয় বাংলাদেশে এমনটি ঘটার আশা কোনোদিন কামনাও করিনি।

‘স্বাধীনতার পর এত বড় সংকটে বাংলাদেশ কখনো পড়েনি’ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও প্রিয় সম্পাদক গোলাম মোর্তোজার স্ট্যাটাস দেখে কিছুটা ভড়কে যাই। তাহলে আসলেই ভয়ানক কিছু ঘটেছে। জাপানি জিম্মি কথাটি মাথায় রেখে টেলিভিশন খুললে প্রায় প্রতিটি চ্যানেলেই সংবাদটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গেই সম্প্রচার এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন শঙ্কার কথাও জানানো হচ্ছে চ্যানেলগুলোর প্রতিনিধিদের মাধ্যমে লাইভ প্রতিবেদনের মাধ্যমে। তখনো কমান্ডো অভিযান শুরু হয়নি তাই সন্দেহের ডালপালা উঁকি দেয় মনের গহীনে। সেই সঙ্গে শুরু হয় স্থানীয় জাপানিসহ অনেক বিদেশি বন্ধুদের (সাংবাদিক মহল) কাছ থেকে একের পর এক ফোন। আর ওখানকার প্রবাসী সমাজ তো রয়েছেই। টিভি সম্প্রচার, বিভিন্ন জাতীয় এতো ফোন পেয়ে মনে হলো সত্যিই তো বাংলাদেশ সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রবাসীদের এতো বড় বিব্রতকর পরিস্থিতিতে কখনোই পড়তে হয়নি।

বরং তার উল্টোটাই ঘটেছিল। ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে প্রফেসর ডক্টর ইউনূস-এর নোবেল প্রাপ্তিতে জাপানে বা প্রবাসে বাংলাদেশিদের মাথা যতোটুকু উঁচুতে স্থান পেয়েছিল দীর্ঘ এক দশক পরে সেই স্থান হঠাৎ করেই ধস নেমে বরং আরও বেশ কয়েক ধাপ নিচে নেমে গেল। কিন্তু কেন? এটা তো কাম্য ছিল না।

ঘটনাটি নিয়ে চিন্তা করছিলাম জাপানি সমাজে যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হবে তা সামাল দিব কীভাবে। অথচ এই জাপানে প্রবাসীদের সুনাম (বাংলাদেশ কমিউনিটির) সবচেয়ে বেশি এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ কমিউনিটি বেশ পরিচিত। জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী এবং মডেল রোলা জাপানে বাংলাদেশকে বেশ উঁচু আসনে আসীন করেছে। একমাত্র এই জাপানেই দেশের স্বার্থে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এক টেবিলে বসে কাজ করে। মাত্র ৫ দিন আগে মুন্সিগঞ্জ-বিক্রমপুর সোসাইটি কর্তৃক আয়োজিত ইফতার মাহফিলে কতো জাপানিই তো উপস্থিত ছিলেন। টোকিও বৈশাখী মেলায় হাজার হাজার জাপানির দর্শন মিলে। মন্ত্রী, এমপিদের অংশগ্রহণ থাকে। এসব সাতপাঁচ ভাববার সময় স্বম্বিৎ ফিরে পেলাম ছেলের ডাকে। ছেলে আশিক কাজে যাবে (পার্টাইম) কিন্তু কর্মস্থলে বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে তাকে এই নিয়ে আশিক বেশ চিন্তিত। বললো, আজ আমাকে আবার ইসলাম ধর্ম এবং বাংলাদেশ নিয়ে প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। কী বলবো তাদেরকে? ছেলের প্রশ্নের উত্তরে শুধুই বললাম যে, তুমি যেই বাংলাদেশ সম্পর্কে জানো, তুমি যেই ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে ধারণা পোষণ করো তাই বলে দিও। আর বলে দিও সন্ত্রাসীদের আসলেই কোনো ধর্ম নেই। ধর্মের দোহাই দিলেও আসলে এরা ধর্ম সম্পর্কে কিছুই জানে না। আর জানে না বলেই তারা এই কুকর্মগুলো করে। কারণ কোনো ধর্মেই সন্ত্রাস সমর্থন করে না আর ইসলাম ধর্মে তো নয়ই।

টিভিতে কিছুক্ষণ দেখার পর এবং পত্রপত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ঘেটে কিছু একটা সংবাদ পুঁজি করে দুরু দুরু মন নিয়ে বের হই ২ জুলাই শনিবার বিকেলে। ১৬ বছর এই এলাকাতে বসবাস এবং এলাকার বেশ কিছু সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিয়মিত অংশগ্রহণের কারণে এলাকার লোকজনের কাছে পরিচিত মুখ হিসেবে কিছুটা শঙ্কিত ছিলাম, না জানি কোনো বিব্রত অবস্থায় পড়তে হয়।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো আমাকে বিরূপ পরিস্থিতির মোকাবিলা তো দূরের কথা বিনয়ী এই জাপানি জাতি উল্টো আমাকে নিয়েই উদ্বিগ্ন। আমার পরিবারের লোকজন, বন্ধুবান্ধব সবাই ঠিক আছে কি না তারা জানতে চাচ্ছেন। স্বজাতি হত্যাকাণ্ডে ব্যথিত হবার পাশাপাশি আক্রমণকারী জাতির জন্য উদ্বিগ্ন হতে পারে তা জাপানিজ ছাড়া আর কোনো জাতি আছে কি না আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

দুইদিন ছুটি কাটানোর পর কর্মক্ষেত্রে গেলে সবাই আমার সঙ্গে অত্যন্ত স্বাভাবিক আচরণ করে। এমন কি কিছুটা নমনীয় এবং সর্বদা সহযোগিতাসুলভ আচরণ করতে থাকেন। বিভিন্ন কৌশলে আমাকে উৎফুল্ল রাখতে চেষ্টা করতে থাকেন। কিন্তু হৃদয়ে যার রক্তক্ষরণ হচ্ছে তাকে কি আর শত চেষ্টাতেও উৎফুল্ল রাখা যায়? অন্যভাবে বললে ম্যাকি সাজা যায়? অথচ এই আমি আমার জাপান জীবনের পুরো সময়টা এই কোম্পানিতেই কাজ করছি এবং প্রতিটি মুহূর্ত উৎফুল্ল থাকার চেষ্টা করি এবং সবাইকেও রাখার চেষ্টা করি সর্বদা। কারণ, আমি মনে করি কর্মক্ষেত্রে নিজেকে বস না ভেবে বা বসসুলভ ব্যবহার না করে কলিগদের সঙ্গে মিশে যাওয়া যায়, তাদের উৎফুল্ল রাখা যায়, তাদের ভালো মন্দের অংশীদার হওয়া যায় তা হলে তাদের কাছ থেকে অধিক পরিমাণ কাজ আদায় করে নেয়া যায়। কলিগদের কাছ থেকে কাজ আদায় করে নেয়ার এই কৌশলের জন্য কোম্পানিতে আমার একটা সুনামও রয়েছে। অথচ সেই আমি কি না আজ ওদের কাছেই অসহায়, মাথা অবনত। কাজ শেষে বিদায় নেবার সময়ও সবাই ফটক পর্যন্ত এগিয়ে দেন।

আমি কিন্তু কিছুতেই অস্বস্তিটা দূর করতে পারছি না। ওদের অমায়িক ব্যবহার আমাকে আরও বেশি বেশি অস্বস্তিতে ভোগায়। মনে নানান প্রশ্নের উদ্রেগ দেখা দেয়, এদিকে কেউ কিছু বলছে না দেখে নিজ থেকেও ঘটনা নিয়ে কোনো আলোচনার পক্ষপাতি নই।

এদিকে বাসায় ফেরার পর মূল রহস্য বুঝতে পারি। কলিগরা সবাই প্রায় অভিন্ন ভাষায় ই-মেইল, এসএমএস করে কেউবা ফোন করে জানায় তাদের বক্তব্য। অনেকটা একই ভাষায় তারা বলেন, ‘আমি জানি আমার মধ্যে যে রক্তক্ষরণ হচ্ছে তার চেয়েও বেশি রক্তক্ষরণ হচ্ছে তোমার মধ্যে। কিন্তু আমরা বাংলাদেশকে চিনি ও জানি এবং দেখি তোমার মধ্যে। তুমিই আমাদের কাছে বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। সদা হাস্যোজ্জ্বল প্রাণোচ্ছল, চির সতেজ মনি সান (মি. মনি) মানেই বাংলাদেশ। সন্ত্রাস বা খুনের যে ঘটনা ঘটেছে একটি অনাকাক্সিক্ষত দুর্ঘটনা হিসেবেই তা ইতিহাসে বহাল পাক মনের মন্দিরে নয়। আর এই ঘটনার জন্য তুমি দায়ী নও। দায়ী নয় ইসলাম ধর্মও। কেবলি সন্ত্রাস এই জন্য দায়ী। সন্ত্রাস কারও কাম্য নয় এবং সন্ত্রাসের মাধ্যমে কারও মন যেমন জয় করা যায় না তেমনি নিজেদের মন গড়া অভিমতও কারোর উপর চাপিয়ে দেয়া যায় না।

কলিগদের কাছ থেকে এমন ম্যাসেজ পাওয়ার পর নিজেকে এবার সত্যিকার অর্থেই আরও বেশি অপরাধী মনে হয়েছে। একই সঙ্গে তাদের প্রতি যারপরনাই বিনম্র শ্রদ্ধাবোধ আরও বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। কী বিনম্র এক জাতি। যারা নিজ চেষ্টাতেই আমাদের দেশসহ বিশ্বের অনেক দেশের অবকাঠামো তৈরিতে নিরলস অবদান রেখে চলেছেন।

হিরোশি তানাকা (৮০), হিদেকি হাসিমতো (৬৫), কোয়ো ওগাসাওয়ারা (৫৬), নোবাহিরো কুরোসাকি (৪৮), ইউকো সাকাই (৪২), মাকোতো ওকামারা (৩২) এবং রুই শিমোদাইরা (২৭) নামের যে সাতজন নিহত এবং তামায়োকি ওয়াতানাবে (৪০) নামের যে একজন আহত হয়েছেন তারা প্রত্যেকেই জাপানের খুব এলিট শ্রেণির, স্ব স্ব ক্ষেত্রে অসাধারণ তাদের যোগ্যতা এবং অবদান। বাংলাদেশের উন্নয়নে তারা গিয়েছিলেন। তার প্রতিদান কি এভাবে আমরা দিলাম? এটা কি তাদের প্রাপ্য ছিল। এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই কেবল খুঁজতে ছিলাম।

পরিচিতজনরা (প্রবাসী) বাংলাদেশিদের তো আমাদের চিনে জানে এবং বুঝে, তাই তাদেরকে বুঝ দেয়া সহজ হয়। কিন্তু অপরিচিতদের সন্দেহের চোখ বা কৌতূহলী চোখের ভাষায় উত্তর দেব কী ভাবে? বিশেষ করে ট্রেনে চড়ে কর্মক্ষেত্রে বা অন্য কোথাও যাতায়াতের সময় যখন মনিটরে ট্রেন নিউজ ৩ মনিটরে ভেসে বাংলাদেশে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা তখন পাশে থাকা সহযাত্রীরা একবার মনিটরের দিকে চোখ রেখে পরক্ষণেই আবার আমার দিকে চোখ রেখে পরখ করে নেয় আমি যে বাংলাদেশি তা পর্যবেক্ষণে। সে এক বিব্রতকর অবস্থা। অনেক বন্ধুদের কাছেই শুনেছি কর্মস্থলে তাদের সঙ্গে নাকি মুখ দেখাতেও লজ্জা করে। যদিও আমার বেলায় তা ঘটেনি তবুও বন্ধুদের মনের ভাষা বুঝতে অসুবিধা হয় না।

জাপানে কড়া আইন এবং তা প্রয়োগে কঠোর আইন এবং জাপানি জাতির বিনয় ও নম্রতা অনুযায়ী এখানে রাস্তাঘাটে কেউ কিছু বলবে না বা পাল্টা আঘাত আসবে না এই বিশ্বাস আমার বরাবরই ছিল এবং অটুট আছে। যেটা ইউরোপ বা আমেরিকার মতো দেশেও সম্ভাবনা থেকে যায়। জানি না ইতালিতে বসবাসরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের কি রকম পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। নিশ্চয়ই তারাও আমাদের মতো এক বিব্রতকর পরিস্থিতির সঙ্গে আতঙ্কেও রয়েছেন। কারণ সংখ্যার দিক থেকে সেখানে বাংলাদেশিদের সংখ্যাটা যেমন বেশি আবার ন্যক্কারজনক ঘটনার শিকার ইতালীয়দের সংখ্যাও বেশি। ৯ জন।

জাপানে বসবাসরত প্রায় প্রতিটি বাংলাদেশিই যে যার সামর্থ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের ভাবমূর্তি রক্ষায় কাজ করছেন। ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জাপানিদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সহানুভূতি জানাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এ নিয়ে ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

পূর্বঘোষিত কিছু কিছু অনুষ্ঠান বদল কিংবা স্থগিত করা হয়েছে। তার মধ্যে ১০ জুলাই রোববারের ঈদ আনন্দ অনুষ্ঠানটি স্থগিত করা হয় এবং একই দিন ও একই সময়ে ‘বাংলাদেশ কম্যুনিটি জাপান’ ব্যানারে একটি শোক সভার আয়োজন করা হয়েছে। ঈদ আনন্দ অনুষ্ঠানটিতে বাংলাদেশ থেকে শিল্পী আসার কথা ছিল। তার বদলে এখন জাইকা এবং জাপান পার্লামেন্ট মেম্বারসহ বেশ কিছু ভলান্টিয়ার সংগঠনের প্রতিনিধিগণ উপস্থিতি আশা করা যাচ্ছে। এদের সকলেই বাংলাদেশের সুহৃদ।
এছাড়াও ১০ জুলাই এবং ১৭ জুলাই ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান বাতিলসহ প্রবাসীদের যেকোনো আয়োজনেই হত্যাকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিশেষ সহানুভূতি জানানো হচ্ছে। জাপানি মিডিয়াগুলোতেও প্রবাসী বাংলাদেশিসহ বাংলাদেশে বাংলাদেশিদের বিভিন্ন আয়োজনে জাপানিদের প্রতি সহানুভূতি জানানোর কথা স্থান পাচ্ছে। জাপান সরকার পরিচালিত জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যম এনএইচকেতে বিষয়গুলো স্থান পাচ্ছে।

সভ্যতার চরম শিখরে অবস্থান নেয়া জাপানি জাতীয় কূটনৈতিক ভাষা এবং রাজনৈতিক শিষ্টাচার প্রশ্নাতীত। এখানে এমন কোনো মন্ত্রী পাওয়া যাবে না। যার নেতৃত্বে এবং পুলিশি প্রহরায় কোনো বিদেশি দূতাবাস ঘেরাও কিংবা এমন কোনো রাজনৈতিক দল নেই যাদের নেতৃত্বে কথায় কথায় কোনো রাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ছিন্নের বাহানা তুলে রাজপথে মহড়া দেয়া হবে। এমন কোনো মঞ্চও তৈরি নেই যেখান থেকে নেতৃত্ব দেয়া হবে।

জাপানিরা ঝানু কূটনৈতিক। তারা কূটনৈতিক ভাষায় যা বলার তা বলে দেবে। দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো কাজে লিপ্ত হবে না বা এমন কোনো কাজ করবে না যাতে করে বহির্বিশ্বে জাপানের বদনাম হয় বা ভাবমূর্তি নষ্ট হয়।

সরকারের প্রতিটি গৃহীত পদক্ষেপের জন্যই জনগণের কাছে জবাবদিহিতা করতে হয়। একজন জাপানিজও যদি অস্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করে তবে তার জন্য সরকারকে জবাবদিহিতা করতে হয়। আর বিদেশে মৃত্যুবরণ করলে তো আরও বেশি কৈফিয়ত দিতে হয় এবং এই জন্য জাপান সরকারের যা যা করণীয় তা নিতে পিছপা হয় না জাপান সরকার। এখানে আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন বলে পার পাওয়া যাবে না। কিংবা মানুষের জীবনের বদলে ছাগল দিলেও প্রতিদান হবে না। জাপান মিডিয়া তুলোধুনো করে ছাড়বে।

গুলশানের ঘটনায় সাত সাতটি প্রাণ ঝরেছে জাপানের। জাপান পুলিশ তার তদন্ত করবে। তদন্ত করবে তারা অত্যাধুনিক এবং নিজস্ব পদ্ধতিতেই। ময়নাতদন্ত ভিসেরা রিপোর্ট সব কিছু হাতে পাওয়ার পরও প্রয়োজনে তারা শতাধিকবার বাংলাদেশে যাতায়াত করবে। গোয়েন্দাগিরি করবে। বেশ সময় নিয়েই তারা এই কাজগুলো করবে।
বাংলাদেশে একের পর এক হত্যাকাণ্ড গুম বা নিখোঁজ হওয়ার পর প্রতিটি সরকারই লুকোচুরি করার একটা প্রবণতা থাকে। কিন্তু গুলশানের ঘটনাটি কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়। এখানে ভারতীয়, জাপানি, ইতালিয়ান এবং বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আমেরিকান নাগরিকও রয়েছেন। প্রতিটি দেশই স্ব স্ব নাগরিকের জন্য প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে কাজ করবে। তাতে করে প্রকৃত রহস্য বের হয়ে আসবে। আর জাপান এবং ইতালি তো রীতিমতো ঘোষণাই দিয়েছে যে, তারা নিজস্ব তদন্ত করবে। কাজেই বাংলাদেশ সরকারের কাছে বিনীত নিবেদন থাকবে গুলশানের ঘটনাটি যেহেতু আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় জড়িত হয়ে গেছে বা হতে বাধ্য হয়েছে, কাজেই এখানে কোনো প্রকারের ধামাচাপা বা দোষ চাপানোর প্রবণতা থেকে বের হয়ে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশে সহায়তা করুন। তাতে করে পরোক্ষ এবং প্রত্যক্ষভাবে সরকারই লাভবান হবে। জঙ্গি দমনে আন্তর্জাতিক সহায়তা যেমন পাবে তেমনি বাংলাদেশের জনগণকেও সম্পৃক্ত করা যাবে।

ইলিয়াস আলী গুম, সাগর-রুনি, দীপন এবং নারায়ণগঞ্জের ত্বকী ও সাত খুনের ধামাচাপা দেয়ার প্রবণতা ইতোমধ্যে ডালাপালা গজাতে শুরু করেছে। জনগণ অন্তত বিশ্বাস করতে শুরু করেছে যে, উপরোল্লোখিত খুনের যদি একটিরও সুষ্ঠু বিচার হতো তাহলে আজ আর এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতো না। জল অনেক ঘোলা হয়েছে, কিন্তু আর নয়। এতে যদি তৃতীয় কোনো শক্তির হাত বা ইন্ধন থেকে থাকে তাহলে তাও বের করার জন্য সহায়তা করুন। প্রকৃত সত্য একদিন না একদিন বের হবেই। তবে বিলম্বে কেন? সব হারিয়ে সত্য বের হওয়ার চেয়ে কিছুটা থাকতে সজাগ হওয়াটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

জাপানে প্রবাসীরা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়লেও বিপদজ্জনক পরিস্থিতির শিকার হয়তো হয়নি কিন্তু দেশের বদনাম যা হবার তা হয়ে গেছে। এর প্রভাব নিশ্চয় বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর প্রভাব ফেলবে। জাইকোর প্রধান যতোই পার্শ্বে থাকার ঘোষণা দিক না কেন ব্যক্তি উদ্যোক্তারা কিন্তু ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ব্যবসা গুটানো শুরু করে দিয়েছে। অনেকেই অনেক প্রোগ্রাম ক্যানসেল করছে, ইউনিক্লো’র মতো প্রতিষ্ঠান সফর স্থগিত করেছে। এতে করে বাংলাদেশি ব্যবসায়ীরা যারা যৌথ ব্যবসা করছেন তাদের অপূরণীয় ক্ষতি হবে। এই অবস্থায় তারা না পারবে ব্যবসা করতে না পারবে চাকরি জীবনে ফিরে যেতে। অনেক প্রবাসী ব্যবসায়ীই জানিয়েছেন তাদের শঙ্কার কথাও ইতোমধ্যে ব্যবসায়িক সভা, সফর ক্যানসেল এর কথা।

সামনে ২০২০ অলিম্পিককে সামনে রেখে প্রবাসী শ্রমিকসহ জাপানে বয়স্কদের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় অভিবাসন আইন নমনীয় করে জাপানে সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে। জাপানে বাংলাদেশিদের সুনামের জন্য বাংলাদেশিদের অভিবাসন করার উজ্জ্বল সম্ভাবনা হোঁচট খেয়েছে গুলশান ঘটনায়। নিয়োগদাতারা মুখ ফিরিয়ে নেবেন বাংলাদেশ থেকে।

তবে সব কিছুর মধ্যে জাপান মিডিয়াকে অন্তত একটি কারণে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। কারণ এত কিছুর পরও জাপান মিডিয়া কিন্তু বাংলাদেশ বা বাংলাদেশিদের নিয়ে কোনো বিরূপ মন্তব্য করেনি। তারা ঘটনার প্রচার করেছে অপপ্রচার নয়, স্থান পেয়েছে বাংলাদেশিদের ভালোবাসার কথাও। জাপানিদের জন্য বাংলাদেশিদের সমবেদনা জানানোর চলমান চিত্রও প্রকাশ করেছে।

শুরু করেছিলাম জেলা পর্যায়ের এক পুলিশ অফিসারের ফোন পাওয়ার কথা দিয়ে, এই প্রতিবেদনটি যখন তৈরি করছি তখন টোকিওর এক পুলিশ অফিসার জানতে চাইলেন এই ঘটনায় কোন জাপানিদের কাছ থেকে দুর্ব্যবহার পেয়েছি কি না বা ভবিষ্যতে পেলেও যেন সঙ্গে সঙ্গে তাকে ফোন করে জানাই। শুধু আমার বেলায়ই নয়, যে কোনো প্রবাসী বাংলাদেশিদের বেলায়ও। ভাবলাম আমাদের দেশের পুলিশ ভাইয়েরা যদি এমনটি হতো।

rahmanmoni@gmail.com

সাপ্তাহিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.