নদীতে ভাসা জীবন

নৌকায় খাওয়া, নৌকায় ঘুম; নৌকায় চলে পড়ালেখা। চলে রান্নাবান্নার মতো সাংসারিক কাজকর্ম। কত বিচিত্র তাদের জীবন! জীবন যেন ভিন্ন এক ছকে বাঁধা। যেকোনো গল্প-নাটককে হার মানাবে তাদের বাস্তব জীবনের গল্প। তবুও বেঁচে থাকার সংগ্রামে থেমে নেই তাদের জীবন। এমনই বিচিত্র জীবন যাপন করছেন মুন্সীগঞ্জ জেলার সিরাজদিখান উপজেলার চিত্রকোট ইউনিয়নের মরিচা সেতুসংলগ্ন পানির ওপর ভাসমান অবস্থায় বসবাসকারী এসব পরিবার। নানা প্রতিকূল অবস্থায় সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন নতুন কোনো স্বপ্ন কিংবা নতুন জীবনের জন্য।

জানা যায়, আজ থেকে প্রায় দেড় শ’ বছর আগে নিয়তির কাছে হার মেনে মুন্সীগঞ্জ উপজেলার শেখেরনগর গ্রামের ‘সওদাগর’ বংশের কয়েকটি পরিবারের স্থান হয়েছিল ইছামতি নদীতে। বংশবৃদ্ধির কারণে বর্তমানে এখানে প্রায় ২০০ পরিবারের বসবাস। এরই মধ্যে দেড় শ’ বছর অতিক্রম হলেও নদী থেকে মুক্তি মেলেনি এসব পরিবারের।

নদীর তীরে বসবাসকারী সওদাগরদের জীবনকাহিনী নিয়ে আমাদের দেশে অনেক সিনেমা-নাটক নির্মাণের পর সেসব সিনেমা-নাটক ব্যবসায়িকভাবে সাফল্যের মুখ দেখলেও ভাগ্যের কোনো উন্নতি হয়নি সওদাগর পরিবারের সদস্যদের। বর্তমানে ২০০ পরিবারের সদস্যরা মানবেতর জীবন যাপন করছে। দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের জন্য প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে যেতে হচ্ছে তাদের। অভাব যেন তাদের গলা চেপে ধরেছে, তাই সহজেই মুক্তি মিলছে না। এরা নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখলেও মুক্তির পথ খুঁজে পাচ্ছে না। ক্ষোভের সাথে অনেকে বলেন, আমরা এতগুলো পরিবার এখানে বাস করছি। কোনো দিন কেউ আমাদের খোঁজ নেয় না। তাদের অভিযোগ, নির্বাচনের সময় কদর বাড়ে তাদের, আর ভোট হয়ে গেলে কারো খোঁজ পাওয়া যায় না। জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ালেও সামান্যতম সাহায্য মেলেনি তাদের কপালে।

এ পল্লীর বেশির ভাগ পুরুষ সদস্য পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন মাছ ধরাকেই। ইছামতি নদীই তাদের মাছ ধরার প্রধান উৎস। মাছ বিক্রি করেই চলে তাদের সংসার। বর্ষাকালে এ নদীতে মাছ পাওয়া গেলেও শুষ্ক মওসুমে প্রায় বেকার হয়ে পড়েন এসব মানুষ। পুরুষদের পাশাপাশি মেয়েরাও বিভিন্ন ধরনের পেশায় জড়িত। কেউ প্রসাধনসামগ্রী ফেরি করে বিক্রি করেন গ্রামে গ্রামে। আবার কেউ কেউ বিভিন্ন ধরনের কাপড়ও বিক্রি করে থাকেন। আবার অনেকে মেলামাইনের জিনিস বিক্রি করেন। ১০ বছরের ওপরের শিশুদের কাজ করে চালাতে হয় জীবন। কাজ না হলে নাকি ভাত জোটে না কারো।

এ পল্লীতে ১০০ জন শিশুর মধ্যে হাতেগোনা পাঁচ-ছয়জন শিশু স্কুলে আসা-যাওয়া করে। অন্যরা স্কুলে না যাওয়ায় শিক্ষা ছাড়াই বেড়ে উঠছে। শিশুদের স্কুলে যাওয়া বাধ্যতামূলক করা হলেও স্থানীয় প্রশাসনসহ জনপ্রতিনিধিরা কখনোই স্কুলে যাওয়ার ব্যাপারে তাগিদ দেননি, এমন অভিযোগও আশপাশের লোকজনের। চিত্রকোট ইউনিয়নের উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রে গেলে মেলে না স্বাস্থ্যসেবা। তাই অসুখ হলেও তাদের নিজস্ব দাওয়াই দিয়েই চলে চিকিৎসাব্যবস্থা। মোট কথা, মানুষের মৌলিক যে চাহিদা তা এখানে বিপর্যস্ত ও বিধ্বস্ত। চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না।

এ পল্লীর বাসিন্দা সত্তরোর্ধ্ব লতা বেগম জানান, ‘হেই ছোটকাল থাইকাই সংগ্রাম কইরা যাইতাছি; কিন্তু দিন দিন মনে অইতাছে বাকি জীবনে মনে অয় আর কিছু করবার পারুম না। সরকার যদি আমাদের দিকে একটু দেখত, তাইলে মনে হয় কিছু একটা অইত। ঠিক এমনই আক্ষেপ করে খালেক নামের এক ব্যক্তি বলেন, ‘এ পর্যন্ত আমরা সরকারের কাছ থেকে ১০ কেজি চালও সাহায্য হিসেবে পাইনি। আমরা যে সরকারের কাছে আমাগো সমস্যার কতা কমু, এমন মানুষও পাই না। তয় সাংবাদিকেরা যদি আমাগো সমস্যার কতা সরকারের কাছে তুইল্যা ধরে, তাইলে আমাগো অনেক উপকার অইব।’ তারা জানান, জীবনের নানা তিক্ততার কথা। যে নৌকায় তাদের বসবাস, সামান্য ঝড় হলে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়তে হয় সবার। সবচেয়ে অনিরাপদ অবস্থার মুখে পড়ে শিশু ও বৃদ্ধ মানুষেরা। তাই ঝড়ো হাওয়া বইতে শুরু করলে তাদের জীবনে নেমে আসে এক অমানিশা অন্ধকার। আর ঝড় কেটে গেলে ফিরে পায় নতুন জীবন। তারা জানান, তাদের এ জীবন আর ভালো লাগে না। তাই অন্য দশজনের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে চান। স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন।

এ বিষয়ে সিরাজদিখান উপজেলার উপজেলা নির্বাহী অফিসার তানভির আজিম বলেন, ‘আমি শুনেছি সিরাজদিখান উপজেলার চিত্রকোট ইউনিয়নের কিছু পরিবার দীর্ঘ দিন ধরেই ভাসমান অবস্থায় নৌকায় বসবাস করছে। আমি সরেজিমনে পরিদর্শন করব এবং তারা যদি সত্যিকার অর্থে ভূমিহীন হয়ে থাকে, তাহলে অবশ্যই আলাপ-আলোচনা করে পর্যায়ক্রমে তাদের পুনর্বাসনের জন্য জমির ব্যবস্থা করা হবে।

হাসি-কান্না ও সুখ-দুঃখ নিয়ে মানুষের জীবন। ইছামতি নদীর ওপর ভাসমান এসব মানুষও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারলে মুক্তি মিলবে বন্দিজীবনের।

নয়াদিগন্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.