মহাসড়কের ‘রাজা’ ছিনতাইকারী: গজারিয়া

মো. মাসুদ খান: মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে প্রায়ই ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। একটি সংঘবদ্ধ চক্র মাইক্রোবাসে করে এসে মালপত্র ছিনিয়ে দ্রুত সটকে পড়ে। দুর্বৃত্তরা যাত্রীবেশে মাইক্রোবাসযাত্রীদের কাছ থেকে ছিনতাই করে। রিকশা, অটোরিকশায়ও ছিনতাই হচ্ছে। ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে সব মালপত্র খুইয়েছেন একজন উপজেলা চেয়ারম্যান ও একটি থানার ওসি। এতে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। এলাকাবাসীর মধ্যে ভয় কাজ করছে। বিভিন্ন যানবাহনের যাত্রী ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেছে এসব তথ্য। তবে পুলিশ বলছে, ছিনতাই ঘটনার বিষয়ে তারা কিছুই জানে না।

স্থানীয় ও আক্রান্ত পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত সোমবার সন্ধ্যায় সোনালী ব্যাংক গজারিয়া শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সুমাইয়া সেপা ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় বাড়ি ফিরছিলেন। পথে মহাসড়কের পুরান বাউশিয়া এলাকায় সাদা একটি মাইক্রোবাসে করে ছিনতাইকারীদল এসে তাঁর হাতে থাকা ব্যাগ ধরে টান দেয়। ব্যাগের ফিতা তাঁর হাতে পেঁচানো থাকায় হেঁচকা টানে তিনি অটোরিকশা থেকে মহাসড়কে গিয়ে পড়েন। এতে গুরুতর জখম হন তিনি। পরে এ নিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাসও দিয়েছেন।

ক্ষোভের সঙ্গে সুমাইয়া সেপা বলেন, ‘মহাসড়কের ওপর পড়ে দেখলাম পেছন দিক থেকে গাড়ি আসছে। কোনো রকমে নিজেকে রক্ষা করে রাস্তার পাশে আসতে সক্ষম হই। তা না হলে গাড়িচাপা পড়ে সেদিন মরেই যেতাম। ’

গত ৬ মার্চ ভবেরচর বাসস্ট্যান্ড থেকে স্বামীর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ৫০ হাজার টাকা ও নিজের এক ভরি ওজনের সোনার গয়না নিয়ে গৃহবধূ খাদিজা বেগম নিজ বাড়ি ভিটিকান্দি আসছিলেন রিকশাযোগে। তিনি বলেন, ‘ভিটিকান্দি বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আসামাত্রই একটি মাইক্রোবাস আমাদের রিকশাটিকে ক্রস করছিল খুব ধীরগতিতে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই মাইক্রোবাস আরোহী ছিনতাইকারীচক্র আমার হাতে থাকা ব্যাগটি ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত মহাসড়ক ধরে চলে যায়। ’

খাদিজা বেগমের বাবা মন্টু মিয়া বলেন, ‘ব্যাগে থাকা মোবাইল ফোন, টাকা ও সোনা মিলে লাখ টাকা নিয়ে চোখের পলকে চলে গেল ছিনতাইকারীচক্র। আমাদের দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। মনটা খারাপ হলেও করার কিছুই ছিল না। হাইওয়েতে পুলিশের টহল জোরদার করা হলে দুর্বৃত্তরা ছিনতাইয়ের সুযোগ পাবে না। পুলিশ ছিনতাইকারীচক্রকে ধরতে পারলে এলাকার মানুষ স্বস্তি পেত। ’

সম্প্রতি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকা কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে ছিনতাইয়ের শিকার হন আলীপুরা এলাকার মহাসড়কে।

গজারিয়া উপজেলা এলজিইডি অফিসে কার্যসহকারী মিছির আলী জানান, এই মহাসড়কে ছিনতাই অনেক বেড়ে গেছে। মাঝেমধ্যেই মাইক্রোবাস থেকে নারী রিকশাযাত্রীদের ব্যাগ টান দিয়ে ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ছিনতাই হচ্ছে আরো এক কৌশলে। ছিনতাইকারীরা ভবেরচর বাসস্ট্যান্ডের কাছে যাত্রীবেশে মাইক্রোবাসে বসে থাকে। এ সময় চালক অন্য যাত্রীদের ডেকে মাইক্রোবাসে ওঠান। দু-একজন যাত্রী পেলেই মাইক্রোবাস ছেড়ে দেন। পরে চলন্ত মাইক্রোবাসে যাত্রীবেশী ছিনতাইকারীরা যাত্রীদের টাকাসহ সব মালপত্র কেড়ে নিয়ে মারধর করে রাস্তার পাশে ফেলে দেয়। কখনো কখনো মাইক্রোবাস থেকে যাত্রীদের এমনভাবে ধাক্কা দেওয়া হয় যে অন্য গাড়ির নিচে পড়ে যাত্রীর প্রাণও যেতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গজারিয়ার একজন চেয়ারম্যান জানান, কিছুদিন আগে রাতে কুমিল্লার একটি উপজেলা চেয়ারম্যান ঢাকা থেকে তাঁর উপজেলায় যাওয়ার সময় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গজারিয়ার ভাটেরচর নতুন রাস্তার পাশে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন। বিষয়টি তিনি গজারিয়ার একজন চেয়ারম্যানকে ফোন করে জানিয়েছিলেন। এ ছাড়া ওই এলাকায় কুমিল্লার একটি থানার ওসির সব মালপত্র কেড়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। তিনি সাদা পোশাকে থাকায় ছিনতাইকারীরা তাঁকে চিনতে পারেনি। ঘটনাটি ওসি কাউকে না জানালেও ভাটেরচর এলাকার অনেকেই জানে।

গজারিয়া থানার ওসি হেদায়েতুল ইসলাম বলেন, ‘এ ধরনের ছিনতাইয়ের ঘটনা সম্পর্কে আমরা মোটেই অবগত নই। আপনার কাছে প্রথম শুনলাম। কেউ আমাদের কাছে কোনো অভিযোগ নিয়ে আসেনি। আপনার মাধ্যমে অবগত হলাম। বিষয়টির প্রতি আমরা গুরুত্ব দিয়ে কাজ করব। ’

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গজারিয়া অংশের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ভবেরচর হাইওয়ে পুলিশের এসআই মো. আবুল হাশেম মুন্সী বলেন, ‘আক্রান্তরা আমাদের তাৎক্ষণিক ঘটনা অবহিত করলে ছিনতাইচক্রকে আটকের চেষ্টা করব। ’

কালের কন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.