জন্মদিন – ব.ম শামীম

অফুরন্ত বৃষ্টি চাই আজ। হে আষাঢ় হে বর্ষা শর্বরী হে ঘন মেঘের তটিনী এসো, নির্ঘুম তুমি, অফুরন্ত তব ভান্ডার নিয়ে এসো। বাদলের নির্ঘুম তটিনী জাগো, মুছে দাও ঘুচে দাও যত জ্বালা মম। পুরাতন জীর্ন হৃদয়টা ভারাকান্ত তোমার স্পর্শের স্বাদ নিবো নিরন্তর । যে লেখকের জন্ম বাদলের পরীর কালো তটের রেখার স্লান স্পর্শের ঘ্রান শুকে। অঝর কান্নার বেদনার বর্ষার বাদলের অশান্ত নিঘোর বর্ষনে তার জীবনের শান্তি ও স্বস্তির বারতা থাকতে নেই। হে বর্ষা তুমি ঝড়ো বাদলের পরীরা তোমার অশান্ত উন্মুক্ত রঙটা আবার উন্মোচন কর।

কতদিন ধরে সেই যে জন্মের পর হতে কালে কালে কালো সীমাহীন বেদনার যে রেখাচিত্রে খন্ডিত জীবনটা রুদ্ধ, রুগ্ন, রুক্ষ হয়ে আছে তোমার উন্মুক্ত উলঙ্গ ধারায় আজ সারাদিন ভিজে আমি এই রুগ্ন রুক্ষ জীবনের পরিক্লান্তি পরিশান্তি চাই। জীবনের কতটা পথ, কতটা ক্লেশ, কতটা সময়ের পর আজ আমি যুবক না বৃদ্ধ এ সমাজে আমার সংজ্ঞা কি? ত্রিশতো বেশ আগেই পেরুয়েছি বয়সের হিসাব মিলিয়ে কি হবে? ত্রিশশোর্ধ মানুষের সংজ্ঞাইতো জানিনা আমি। তাই বয়সের হিসাবের গন্ডিটা মিলিয়ে লাভ কি? আলো জ্বালিয়ে কারা যেন এমন দিনে আলোকিত করে তাদের ভূবন।

বয়সের তোড় বাড়ার সাথে সাথে আলোর অস্ফালনের গতিটা বাড়াতে মোমের আগুনের শিখার অঞ্জলির উত্তাপটাও বাড়ায় তারা। আমার জীবনেতো আলো নেই, আষাঢ় শষ্য এমনো দিনে বাদলেরা যে ঘন ঘারো দৃষ্টি ফেলে পৃথিবীতে সেখানে মমের আলো অতি তুচ্ছ ক্ষুদ্র। এ বর্ষার আধারের তো শেষ নেই রাতের অধারের শেষ আসে, দিনের আলো ফুটে রাত আবার রাত প্রেরিয়ে দিনের কখনো আলো কখনো অন্ধকারের সময় সীমার হিসাবের গন্ডিটা থাকলেও আষাঢ়ের ঘন গাঢ়ো মূর্তির হিসাবের গন্ডিতো নেই। তাই ওখানে মম অথবা অন্য আলো তুচ্ছ ও নগ্ন। তাই আষাঢ়ের স্বাদ নিয়ে জন্ম নেওয়া যে মানুষ আমি শুধুতো অন্ধকারই আমি চাই। আঘাঢ় তুমি স্বরুপে এসো কতো প্রেরলো আমার বয়সের সেই হিসাবের খাতার পাতাগুলো গুনার সময় নেই। তাই নাইবা জ্বাললাম তোমার অভয় প্রকৃতির রুপের রুগ্ন মূর্তির কাছে এই তুচ্ছ আলোর টিকা সে তো শুধু অবহেলার অভয়ছটা। তাই হিসাবের গন্ডিটা কষে লাভ কি কতোইবা পেরুলাম।

তবুও আজকাল কেন জানি নিজেকে বড় বেশি ভাড়াকান্ত মনে হয়। মনে হয় এই আষাঢ়েই যদি একবারে চির নিঘোর ঘুমে কোন একটি কদমফুল গাছের নিচে চির শায়িত শয্যায় এই বর্ষায়। কবরের কালো মাটির উপরে আষাঢ়ের ঘারো বর্ষনে কদমের শরীর খসে খসে আমার কবরের মাটির উপরে হে বৃষ্টি তুমি বিছিয়ে দিয়ো। মাটির ভিতরে শুয়ে শুয়ে এই বর্ষায় আমি কদমের সুদা গন্ধ যদি নিতে পারতাম নিরন্তর।

এমন ঘন বরিষায় সব পাখিরা আপন কূলায় যদি একটি তির্থের কাক বসে ডালে সারা শরীর তার বৃষ্টিতে ভিজে একেবারে টাইটুম্বুর হয়ে সারথির খোজেঁ কা কা স্বরে যদি উঠে ডাকে, তাহলে তো আবার এ জীবনের ব্যাথা পুঞ্জভার আমার কবরেও করিবে হাহাকার। না অপূর্ণতার আর কোন ব্যাথা নেই আমিতো চীর মুক্তির স্বাদ চাই তাই কোন এক মসজিদের কোনে একটি কদম গাছ যদি হয় আর এই বর্ষায় তার তলে যদি একটি সমাধি হয় যদি আমি কদমের সুধা গন্ধ বুকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ি মুয়াজ্জিনের গগণ ফুকারী আযানের ধ্বনি শুনি ক্ষনে ক্ষনে উঠি জাগি। আবার কদমের ঘ্রানে ঘুমিয়ে পড়ি।

তাহলেইতো মুক্তির আর মৃত্যূর স্বাদ দুটাই একসাথে নেওয়া হয় শেষ হয় সব। শেষ মানে এই মধ্য বয়সে এক যুবকের অন্তিম বিদায়ে শেষ। না সৃষ্টির কল্যানে বিধাতার সৃষ্টি যে মানুষ, সে মানুষ হিসাবে কতটা করলাম মানুষের জন্য তার হিসাবের শূন্যগুলো একটা মিলাতে পারিনা আমি। কবি সাহিত্যিক, সংগঠক, সাংবাদিক, সম্পাদক, আইনজীবী হিসাবে নামের পাশে ভূড়ি ভূড়ি খেতাবে ভূষিত ব্যাক্তি তুমি সমাজে ঋণ করেছো অনেক বেশি।

এতোকিছু নিয়ে কিছু না দিয়ে এভাবে চলে যেতো পারোনা তুমি। কে যেন বুকের ভিতরে দুটি চোখ রাঙিয়ে শাষিয়ে যায় আমারে। তখন মুক্তির আকুলতা খুঁজি আমি কোথায় মুক্তি? মনে পরে কুরবানি গল্পের দুটি লাইন“হায়রে মানুষ তোমার নিস্তার নেই এক চোখে তোমার যখন ঝড়ে অশ্রুপ্রবাহ আর এক চোখে ফুটাতে হবে পরিজাতের হাসি।” তাই মুক্তিইতো নাই, পরিজাতের হাসি খুজেঁ যাই। নিজে হাসি না হাসতে পারলেও যদি এ জগত বা সংসারের কেউ আমার আলোয় একটু হাসি খুজেঁ পায় তার জন্যইতো চলা নিরন্তর। এ জগৎতে জন্মের পর যে সমাজ সভ্যাতার চাঁদরে আবদ্ধ হয়ে বড় হলাম। ছোট একটি পরিবারে জন্ম নেওয়ার পর যে শিক্ষা, যে সভ্যতা আর যে দিক্ষা ধারণ করে বেড়ে উঠলাম। বয়সের ভারটা বাড়ার সাথে সাথে নিজের উপাধির গন্ডিটা আর জগৎটা যখন প্রশারিত হতে শুরু করলো। তখন দেখলাম আমার পরিবার আর এই জগৎ যেন নিরন্তর দুই মেরুতে আবস্থানকারী দুই সভ্যতার খড়গ। ছোট বেলায় কোন এক গ্রন্থে পরেছিলাম প্রেমময় জগৎ সংসার। নিজ সংসারের বাইরে আর কোথায়ও প্রেম খুজে পেলাম না ।

শুধু মুখে মিথ্যা আস্ফালন আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতির প্রলয়। নজরুলের মতো আমিতো প্রেম পেতে প্রেম দিতে এসেছিলাম কিন্তু এ সভ্যতার এই লগ্নে দাড়িয়ে আমি উপলদ্ধি করছি প্রেমতো মানুষের মনে নেই শুধু মুখেই তার স্বর শুনে গেলাম। বদলে যাচ্ছে পৃথিবী ডিজিটাল হচ্ছে দেশ আমার চারপাশের সবকিছুই বদলায় আমি নাকি দুনিয়ার সাথে দ্রুত বদলাতে পারছিনা। কিন্তু এই বদলানো যদি মানুষের কল্যানে না হয়ে হয় যদি নিজের স্বার্থ সিদ্ধির হীন প্রচেষ্টা অপরকে আঘাত অপবাদ ছোট করার হীন তৎপরতা তাহলেতো বদল না হওয়াই ভালো।

এই অযোগ্যতা আমায় তিলে তিলে প্রতিদিন ক্ষনে ক্ষনে বেদনার বিনাপানি বাজিয়ে যায়। বর্তমানে আমার চারপাশের মানুষগুলো বদলে যাওয়ার যে স্বরুপ তুলে ধরে তাতে নিজেকে কেন যেন বারবার অতি তুচ্ছ ক্ষুদ্র এক লোক মনে হয়। কেউ কেউ বলে যতো ভূষনে ভূষিত হওনা কেন তুমি যদি সময়ের সাথে তাল মিলাতে না পারো তাহলে এ পৃথিবীতে থাকার যোগ্য তুমি নও। না আমি এর সাথে কেন যেন একমত হতে পারিনা। এ পৃথিবী অনেকবার বদলে গেছে এ বদল যখন সৃষ্টির কল্যানে না হয়ে অকল্যানের দিকে গেছে তখনি বিধাতা অনেক জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছেন আমরা যে বদলে যাচ্ছি তা কতটা কল্যানের দিকে না অকল্যানের দিকে এগুচ্ছি তা বদলে যাওয়া মানুষগুলোর বদলে যাওয়ার আগে ভেবে দেখা উচিত। আমাদের বদলানো যদি হয় সৃষ্টির অকল্যানে তাহলেতো আমরা ধ্বংসের দিকে এগুচ্ছি।

নিজের অযোগ্যতাকে বুকে ধারন করে কারো উপর দোষ না চাপিয়ে কাউকে অপবাদ, অপরাধী না করে পরিশেষে অষাঢ়ের প্রথম প্রহরে জন্ম নেওয়া এই ক্ষুদে লেখকের হৃদয়টা অষাঢ়ের অবিরাম বর্ষনের পূর্ণ স্লানে যেন শুদ্ধি হয় সুন্দর হয় প্রেমময় হয় তার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়ে বিদায় নিলাম।

লেখকের-জন্মদিন ১৭জুন প্রভাত বেলায় লেখা ছোট একটি গল্প।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.