‘যদি লাশটাও পাওয়া যেত’: মৈনট ঘাট ট্রাজেডি

‘পৃথিবীতে সবচেয়ে ভারি বোঝা হচ্ছে, পিতার কাঁধে সন্তানের লাশ। এ বোঝার ভার বহন করা কতটা কষ্টের সেটা একমাত্র সেই বাবা ছাড়া কেউ জানে না, তবুও আমি সেই বোঝা কাঁধে নিতে চাই, সন্তানকে শেষ দেখাটা দেখতে চাই। কোনওভাবে যদি ওর লাশটাও পাওয়া যেত’, কিছুটা থেমে থেমে বাংলা ট্রিবিউনকে কথাগুলো বলছিলেন জামালউদ্দিন। নদীতে নিখোঁজ হওয়া সালমান বিন জামালের বাবা তিনি।

প্রিয় সন্তানের অপেক্ষায় মৈনট ঘাটে জামালউদ্দিন (ফোনে কথা বলছেন) ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়াপ্রসঙ্গত, ঈদের পরদিন দোহারে বেড়াতে গিয়ে মৈনট ঘাট থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার পূর্ব-দক্ষিণে ঝাঁওকান্দি এলাকায় ঘুরতে গিয়ে নদীতে তলিয়ে যায় পাঁচ বন্ধু। এসময় এলাকাবাসী দু’জনকে উদ্ধার করে। এছাড়া বাকি তিনজনের মধ্যে মহিমের মৃতদেহ পাওয়া যায় ঘটনার পরদিন সকাল ৯টার দিকে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। বাকি দু’জন সালমান বিন জামাল এবং সুপ্রিয় ঢালী এখনও নিখোঁজ। পুলিশ, কোস্টগার্ড ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল তল্লাশি করলেও তাদের কোনও সন্ধান পাওয়া যায়নি।

এখনও নিখোঁজ রয়েছেন সুপ্রিয় ঢালী

নিখোঁজ তরুণদের মধ্যে ঢাকার মিরপুরের নাসির ঢালীর ছেলে সুপ্রিয় ঢালী মিরপুর কমার্স কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী। আর সালমান মিরপুরের মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র। এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ড. জামাল উদ্দিন তার বাবা।

তবে এখনও জীবিত না হোক অন্তত তাদের লাশ পাওয়ার আশা ছাড়েনি সালমান এবং সুপ্রিয়ের পরিবার। সালমানের বাবার মতো একই বক্তব্য সুপ্রিয় ঢালীর বাবা নাসির ঢালীরও। ছেলেকে খুজঁতে গিয়ে মুন্সীগঞ্জ থেকে এখনও ফেরেননি তিনি, পণ করেছেন ছেলেকে নিয়েই ফিরবেন।

এখনও নিখোঁজ রয়েছেন সুপ্রিয় ঢালীনিখোঁজ সালমানের বাবা ও মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক ড. জামাল উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার দুই মেয়ে আর এক ছেলে। ছেলেটি ছিল চুপচাপ আর শান্ত। আমার ছেলেমেয়ের সঙ্গে আমার এবং ওদের মায়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সর্ম্পক। ছেলেটি এতো লাজুক ছিল যে, কারও বাসাতেও যেতে চাইতো না। খুব সীমিত বন্ধুদের সঙ্গে মিশতো। সেই ছেলে যখন ঈদের পরদিন বন্ধুদের সঙ্গে দোহার যেতে চাইলো আমি নিষেধ করিনি, কিন্তু ওখানে গিয়ে যে ওরা নদীতে নামবে সে কথা আমাকে বলেনি। বললে আমি নিষেধ করতাম, কারণ যে পাঁচজন মিলে ওখানে গিয়েছে তারা কেউ সাঁতার জানতো না।’

প্রিয় সন্তানের অপেক্ষায় মৈনট ঘাটে জামালউদ্দিন (ফোনে কথা বলছেন) ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

এসময় পাশে থাকা সালমানের ভগ্নিপতি তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘ডুবে যাওয়ার ৪৮ ঘণ্টা পার হয়েছে। নৌ বাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, ডুবুরি দল, নৌপুলিশ সবার পাশাপাশি আমরা নিজেরাও গতকাল দুপুরের পর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদীর প্রায় ২০ থেকে ৩০ মাইলের মতো জায়গায় ট্রলারে করে ঘুরেছি, যদি লাশটা পাওয়া যায়, যদি নদীর কোনও কিনারে কিছুর সঙ্গে আটকে থাকে এ আশায়। কিন্তু পাইনি, ছেলেটার হাসিমুখ না দেখি, ওর নিথর লাশটাও যদি পেতাম আমরা। তাহলে কবরটা দিতে পারতাম, জানতাম ছেলেটা ওখানে রয়েছে, কবর জিয়ারত করতে যেতাম। কিন্তু এখনতো সেই উপায়টাও দেখতে পাচ্ছি না।’

ডুকরে কেঁদে ওঠেন এসময় পাশে থাকা সালমানের বাবা। তিনি বলেন, ‘ছেলেগুলো ওখানে গেল কিন্তু ওদেরকে সেখানে থাকা পুলিশগুলো একবারের জন্যও বাধা দেয়নি বলে ওদের সঙ্গে থাকা ফিরে আসা বন্ধুদের একজন বলেছে, ‘বছরের পর বছর ওখানে গিয়ে মানুষ চোরাবালিতে আটকে মারা যাচ্ছে। প্রশাসন কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না।’

হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছে তিনি বলেন, ‘কর্তৃপক্ষের উচিৎ সতর্ক হওয়া। ওখানে কোনও বিপদসংকেত নেই। মানুষ তো বুঝতে পারছে না, হাঁটু সমান পানির সামনেই রয়েছে ভয়ঙ্কর চোরাবালু, যেখানে পা বাড়ালেই ডুবে যাবে, তারপর স্রোতের সঙ্গে মিশে যাবে। আমি তো ছেলেকে হারালামই, কিন্তু আর কোনও বাবার বুক যেন খালি না হয় সে ব্যবস্থা দ্রুত নেওয়া উচিৎ।’

এদিকে, নিখোঁজ সুপ্রিয় ঢালীর বাবা নাসির ঢালী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গতকাল নদীতে লাশ ভেসে ওঠার খবর শুনে এখানে এসেছি। কিন্তু এসে দেখি, তারা আমাদের নয়। আমার গ্রামের বাড়িও মুন্সীগঞ্জে, তাই ভেবেছি ছেলেকে না নিয়ে ঢাকায় ফিরবো না, দরকার হলে ছেলের লাশই দেখবো’, বলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তিনি।

জাকিয়া আহমেদ: বাংলা ট্রিবিউন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.