লৌহজংয়ে বিশেষ কার্ড প্রাপ্ত হয়ে জেলেদের মা ইলিশ ধরার হিড়িক

মুন্সিগঞ্জ জেলা এ বছর সবচেয়ে বেশী মা ইলিশ ধরায় ইলিশ জোন হিসেবে ঘোষিত হয়েছে। মুন্সিগঞ্জে যেভাবে মা ইলিশ ধরা হচ্ছে এ ধরনের মা ইলিশ ধরা হয়নি কোন সময় কোন কালেও। এবার জেলেদের বিশেষ কার্ড প্রদান করে মাছ ধরার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। বিশেষ কার্ডধারীদের মধ্যে লৌহজং উপজেলায়ই রয়েছে ৬০ জন জেলে। ৬০ জন জেলের কাছ থেকে অগ্রিম দাবীকৃত টাকার পুরোটাই আদায় করে ইলিশ ধরার অনুমতি দেয়া হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামীলীগ নেতা সেলিম দেওয়ান এই ৬০ জন জেলের বিশেষ কার্ডের ব্যবস্থা করেছেন এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে।

বৃহস্পতিবার এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত সকল অভিযানকে ব্যর্থ করে দিয়ে মা ইলিশ নিধন চালিয়ে এক শ্রেণির অসাধু মাছ ব্যবসায়ী। একটি বিশ্বস্ত সূত্র থেকে জানা গেছে, বিশেষ কার্ড প্রাপ্তীর জন্য সর্বমোট ৬০ হাজার টাকা অগ্রিম পে করতে হয়েছে জেলেদের।

ইলিশ সংরক্ষন ও ইলিশ প্রজনন চলমান মৌসুমে জেলার পদ্মা ও মেঘনা নদীতে দুই সপ্তাহে অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। মা ইলিশ ধরার অপরাধে জেলে ও ক্রেতাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জরিমানা ও সাজা দেয়াও হচ্ছে প্রতিদিন। একদিকে অভিযান চলছে অপরদিকে বিশেষ কার্ড দিয়ে মাছ ধরার অনুমতি। বিষয়টি এখন লৌহজংয়ে টক অব টাউনে পরিণত হয়েছে।

বিশেষ কার্ডধারী ৬০ জন জেলের মধ্যে ৩ জনের নাম পাওয়া গেছে, আল আমিন, পিতা আব্দুল আলী দেওয়ান, গ্রাম: খড়িয়া, কুমারভোগ, লৌহজং।
আবুল কালাম দেওয়ান, পিতা বাবুর আলী দেওয়ান, দক্ষিণ হলদিয়া গ্রাম, লৌহজং। সোহরাব ফকির, পিতা নয়ন ফকির, দক্ষিণ হলদিয়া, লৌহজং উপজেলা।
এই তিন জনের মধ্যে আবুল কালাম দেওয়ান এর ভাই সেলিম দেওয়ান প্রশাসন থেকে শুরু করে সর্বমহল থেকে বিশেষ কার্ডের ব্যবস্থা করেছেন। ৬০ জনের কাউকেই প্রশাসনের কোন টিম মাছ ধরতে বাঁধা দিবে না। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ায় এখন লৌহজংয়ে মা ইলিশ ধরার বেপরোয়া প্রতিযোগিতা চলছে।

তিন জনের মধ্যে দুই জনের সাথেই মোবাইলে কথা হয় মোবাইলে আল আমিন নিজেকে একজন ছাত্র ও গার্মেন্স ব্যবসায়ী বলে দাবী করলেও তার বাবা আলী দেওয়ান এর কয়েকটি জেলে নৌকা রয়েছে যার মাধ্যমে লৌহজংয়ের পদ্মা নদীতে দেদারছে মাছ ধরা হচ্ছে। অপরদিকে আবুল কালাম দেওয়ানের মোবাইলে ফোন দিলে তিনিও এখন বাসায় আছেন বলে জানান। সোহরাব ফকিরকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন আমরা একটি কার্ড পেয়েছি যা সব সময় সাথে রাখি। কার্ডটির মাধ্যমে আমরা সরকারি সাহায্য পাই। আমরা এ মৌসুমে মাছ ধরি না। তবে সেলিম দেওয়ানকে ভালোভাবেই চিনেন তিনি। তার মোবাইল নাম্বারটি চাইলে তিনি বলেন তার কাছে নাই। সেলিম দেওয়ান হলো আবুল কালাম দেওয়ানের ভাই।

গত ৭ অক্টোবর থেকে ২৫শে অক্টোবর সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। সবচেয়ে মজার বিষয় হলো প্রশাসন দিনের বেলায় অভিযান চালায় জেলে, ক্রেতা, বহনকারীদের বিরুদ্ধে। সন্ধ্যার পরেই নদীতে নেমে পড়ে কার্ডধারী জেলেরা। রাতভর মাছ ধরে আর বিক্রি করে। ধ্বংস করে দিচ্ছে দেশের সম্পদ ইলিশের প্রজনন মৌসুমে ইলিশ মাছ বৃদ্ধি।

এলাকায় অভিযোগ রয়েছে মামলা ও জরিমানার টাকা একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্থদের প্রদান করা হয়। ফলে সকল অভিযান ব্যর্থ করে দিয়ে মা ইলিশ ধরা অব্যহত রয়েছে। বিগত বছরগুলোতে এত মা ইলিশ ধরার নজির নেই বাংলাদেশে। কিন্তু এ বছর আইনী তৎপরতাও বেশী মাছ ধরার প্রতিযোগিতাও বেশী। বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে মুন্সিগঞ্জবাসীকে। এ মৌসুমে ৩৬৭১ জন জেলে পরিবারকে যৎসামান্য ২০ কেজি করে চাল দেওয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত দেয়া হয়নি বরাদ্ধকৃত চাল। চাল বরাদ্ধ হলেও কেন দেওয়া হলো না এই চাল। চাল না দেওয়ার বিষয়টিও ভাবিয়ে তুলছে মুন্সিগঞ্জবাসীকে।

মুন্সিগঞ্জ জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নৃপেন্দ্র নাথ বিশ্বাস বলেছেন, মা ইলিশ প্রজনন মৌসুমে জেলার পদ্মা ও মেঘনা নদীতে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। বিশেষ কার্ডের ব্যবস্থার কথা সরাসরি স্বীকার না করলেও লৌহজং উপজেলায় এমন ঘটনা ঘটতে পারে। তবে বিষয়টির প্রমাণ পেলে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

তিনি আরো বলেন, ৭৪টি মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয়েছে। জেলা ও উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা, পুলিশ ও র‌্যাবের সমন্বয় ৩৪০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। ১০৯টি মাছ ঘাটে ৪০১টি আড়ৎ, ১২৬৮টি বাজার অভিযান চালিয়ে ৯.৩১২ মেট্রিক টন ইলিশ, ৬ কোটি ১লাখ ৮৬৯ মিটার কারেন্টজাল যার বাজার মূল্য ৫ কোটি ৯লাখ ৫৫হাজার জব্দ করা হয়। মোট মামলার সংখ্যা ২৬৬টি। ৭ অক্টোবর থেকে ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত সর্বমোট জরিমানা করা হয়েছে ৭লাখ ৬৫ হাজার টাকা। ১৬০জন জেলে, বিক্রেতা ও ক্রেতাকে ৭দিন থেকে সর্বোচ্চ ২মাস সাজা প্রদান করা হয়েছে।

এ বছরের মা ইলিশ ধরার ক্ষতি কয়েক বছরেও ক্ষতিপূরণ হবে না। অদ্য পর্যন্ত আভিযানিক দলকে লক্ষ্য করে জেলেদের গুলি বিনিময় হয়ে একজন গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন। কতটা বেপরোয়া হলে জেলেরা এভাবে প্রশাসনের লোকদের দেখলে গুলি ছুড়ে। এর আগেও লৌহজং দুইজন ম্যাজিষ্ট্রেটকে লক্ষ্য করে হামলা করার উদ্দেশ্যে তেড়ে আসছিল। কিভাবে সম্ভব প্রশাসনের সকল অভিযান ব্যর্থ করে দিয়ে মাছ শিকার করে এবং অভিযানে যাওয়া প্রশাসনকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে মারে! স্থানীয়রা মনে করে প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই মাছ শিকার চলছে দেদারছে। ম্যানেজ করার পরেও যদি অভিযানে যায় তাদের উপরতো গুলি ছুড়বেই জেলেরা এমনটি মনে করছেন লৌহজং এলাকার একাধিক জেলে।

উলেখ্য, ৭ অক্টোবর থেকে ২৮ অক্টোবর এই ২২ দিন মা ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত, বাজারজাতকরণ সম্পূণ্য নিষিদ্ধ করেছে মৎস্য মন্ত্রনালয়।

দেশের মৎস্য সম্পদক রক্ষার জন্য এ ধরনের সিন্ডিকের সাথে যারা জড়িত তাদেরকে আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন। এভাবে দুর্বল অভিযান চালিয়ে মা ইলিশের মতো জাতীয় সম্পদ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব নয়। একদিনে অভিযান চলবে জেল জরিমানা হবে অপরদিকে এক শ্রেণির বিশেষ জেলে মাছ ধরার অনুমতি পাবে! কিভাবে সম্ভব? বিশেষ কার্ডের ব্যাপারে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা খুবই জরুরী বলে মনে করছেন মুন্সিগঞ্জবাসী।

মুন্সিগঞ্জ নিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.