মুল সাইটে যাওয়ার জন্য ক্লিক করুন

পাঠক সংখ্যা

  • 9,749 জন

বিভাগ অনুযায়ী…

পুরনো খবর…

সিরাজ হায়দার: বিক্রমপুরের কিংবদন্তি অভিনয় শিল্পী

সিরাজ হায়দার ছিলেন একজন জাতশিল্পী। যার রক্তের অনু পরমাণুতে প্রবাহমান ছিল অভিনয়ের প্রতিটি ধারা, যার শিরায় উপশিরায় অভিনয় যেন আমূল প্রোথিত ছিল গভীরতর ভাবে সেইতো সিরাজ হায়দার।

সিরাজ হায়দারের বাড়ি মুন্সিগঞ্জ জেলা ও উপজেলার মিরকাদিম পৌরসভার দরগাবাড়ি মহল্লায়। ছোট বেলা কেটেছে ফরিদপুর পিতার কর্মস্থলে। সেখানেই স্কুলে পড়াশোনা করতে গিয়ে স্কুল নাটকে অভিনয়। আর প্রথম নাটকেই প্রশংসা আর প্রশংসা কুড়ায় সে।

পিতার বদলির কারণে মুন্সিগঞ্জ চলে আসে সিরাজ হায়দার পরিবার। ভর্তি হয় রামপাল এনবিএম হাই স্কুলে। এখানে এসে পড়াশোনার ফাকে ফাকে খুজে বেড়ায় সাহিত্য সংস্কৃতির সংগঠন। খুজে পায় রিকাবিবাজার গ্রীন ওয়েল ফেয়ার সেন্টার।

এই প্রতিষ্ঠানে সাহিত্য সংস্কৃতি ও ক্রীড়ার নানাবিধ সুযোগ থাকায় বিকেল হলেই ফুটবল খেলার মাঠে গোলকিপার হয়ে খেলাধুলা করতো। লাইব্রেরী থেকে গল্প উপন্যাস ও নাটকের বই নিয়ে পড়াশোনা করতো।

বিশেষ বিশেষ জাতিয় দিবস ও উৎসবে এই প্রতিষ্ঠান থেকে নাটক মঞ্চায়ন করা হলে সবচে উৎসাহিত হতো সিরাজ হায়দার। কারণ তাকে যে হিরোর রোল করতে হবে, তাই।

লেখাপড়ার চাইতে অভিনয় তাকে বেশী টানতো। তাই যে কোথাও নাটক মঞ্চায়ন হলে চলে যেতো সিরাজ। তার অভিনয় নৈপুণ্য আর খুজতে ও রিকোয়েস্ট করতে হতোনা তাকে। যারাই নাটকের আয়োজন করতো তারাই সিরাজ হায়দারকে খুজে নিয়ে যেতো। এভাবে অসংখ্য প্রতিষ্ঠানে সে নাটকে অভিনয় করেছে সিরাজ হায়দার।

যে কোন চরিত্রের গভীরে সহজেই প্রবেশ করতে পারতো সিরাজ হায়দার। যৌবনে সিরাজ নায়কের ভূমিকায় অভিনয় করলেও আমি প্রথমত সেই ধারা ভেঙ্গে খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করার প্রস্তাব দেই।

আর সে খলনায়ক চরিত্রে সে এতোটাই ভালো অভিনয় করেছে সেখানে নায়ক চরিত্রের অভিনেতা যেন ম্লান হয়ে উঠেছিল। এরপরে আমার প্রতিটি নাটকেই সিরজা হায়দার খলনায়কের ভূমিকায় অভিনয় করে যথেষ্ট প্রশংসা কুড়িয়েছিল।

অভিনয়ের পাশাপাশি সিরাজ হায়দার নাটক পরিচালনা করতো। পরিচালক হিসেবেও সিরাজ হায়দার ছিল অতুলনীয়। যে কোন নাটককে নিজ পরিচালনার দক্ষতার গুণে একটা অবশ্যই একটা বিশেষ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারতো অনায়াসেই।

মুক্তিযুদ্ধকালে সে দেশ ছেড়ে ভারতে চলে যায়। সেখানে গিয়ে একজন কন্ঠযোদ্ধা হিসেবে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং ক্যাম্পে আবৃতি ও অভিনয়ের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের রণাঙ্গনে যুদ্ধ করতে উৎসাহ যোগাতো সে।

স্বাধীনতার পড়ে ঢাকায় এসে প্রথমেই নাট্যশিল্পীদের নিয়ে ঊর্মি শিল্পী গোষ্ঠী নামে নিয়ে একটি নাট্যদল গড়ে তুলেন। এই নাট্যদল থেকে কয়েকটি নাটক মঞ্চায়নের পর আর্থিক অভাব অনটনে সে নাট্যদল পড়ে পুরোপুরিভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

এরপরে আবদুল্লাহ আল মামুন সহ অনেক বিজ্ঞ ও স্বনামধন্য চলচ্চিত্র নির্মাতার সাথে সিরাজ হায়দার চলচ্চিত্র ও নাটকের বিভিন্ন কাজে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন ।

মুন্সিগঞ্জের মিরাকাদিমে স্থানীয় বন্ধু বান্ধবদের সহযোগীতায় ভাস্কর সাহিত্য সংস্কৃতি গোষ্ঠী গঠন করে বেশ কিছু গোষ্ঠীর নাট্যকাদের যুগোপযোগী সম সাময়িক নাটক পরিচালনা সহ অভিনয় করে প্রচুর সুনাম অর্জন করেন।

এরপর ঢাকায় গড়ে তুলে রঙ্গনা নাট্য গোষ্ঠী। মহিলা সমিতি মিলনায়তনে একের পর এক চলতে থাকে সিরাজ হায়দার রচিত ও পরিচালিত এবং অভিনীত নাট্যমঞ্চায়ন।

মঞ্চ নাটকের পাশাপাশি সিরাজ হায়দার টিভি নাটক ও চলচ্চিত্রে একের পর এক অভিনয় শুরু করেন। তার অভিনয় নৈপুণ্য এতোটাই জনপ্রিয় ছিল যা আজও দর্শক হৃদয়ে অম্লান।

আমাদের দেশে প্রকৃত গুণী শিল্পীর যথাযথ কোনই মূল্যায়ন হয়না, তাই এতো এতো প্রতিভা থাকা স্বত্ত্বেও সিরাজ হায়দারকে রাষ্ট্রীয় ভাবে আজও কোনই মূল্যায়ন করা হয়নি।

সিরাজ হায়দার একজন শব্দ সৈনিক মুক্তিযোদ্ধা। ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তিযোদ্ধাদের উৎসাহিত করতে ক্যাম্পে ক্যাম্পে নাটক ও আবৃতির মাধ্যমে নানা ট্রেনিং ক্যাম্পে কাজ করেছে। অথচ স্বাধীনতার পরে সার্টিফিকেটের প্রতি উদাসীনতা আজ সে সকল মুক্তিযোদ্ধার সুযোগ সুবিধা থেকেও সে বঞ্চিত।

গত এক বছর যাবত সিরাজ হায়দার আমাদের মাঝে নেই। আর তাকে সেই প্রাণোচ্ছল সহাস্য মুখে কাছে আর কখনোই দেখতে পাবোনা। তাই তার জন্য আমাদের দায়িত্ব কর্তব্য কোনভাবে অবহেলা করার সুযোগ নেই। অথচ এই এক বছরেই আমরা তাকে ভুলতে বসেছি।

আশাকরি আমাদের জাতিয় নাট্য চলচ্চিত্র যে কোন বিষয়ে যেকোন শাখা থেকে পরবর্তী পর্যায়ে যেন অবশ্যই সিরাজ হায়দারকে মূল্যায়ন করা হয়, তার জন্য স্থানীয় এমপি সহ রাজনীতিবিদ ও সাহিত্য সংস্কৃতি সংগঠকদের অব্যাহত চেষ্টা চালিয়ে জোরালো পদক্ষেপ নেয়া উচিৎ।

আজকের প্রয়াণ দিবসে সিরাজ হায়দারকে জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও প্রাণভরা ভালোবাসা।

 

আলীম আল রশিদ

১২ জানুয়ারী, ২০১৯

Leave a Reply

You can use these HTML tags

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

  

  

  

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.