পাঠক সংখ্যা

  • 8,785 জন

বিভাগ অনুযায়ী…

পুরনো খবর…

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিচারণ করে এখনও আবেগাপ্লুত হন মুন্সীগঞ্জের মহিউদ্দিন

মীর নাসিরউদ্দিন উজ্জ্বল: জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নানা স্মৃতি এখনও স্পট মুন্সীগঞ্জ জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ মোঃ মহিউদ্দিনের চোখে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার শেষ সময়গুলোর বর্ণনা করেছেন রবিবার সন্ধ্যায়। বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মদিনে তিনি এসব স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি অকপটে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু ছিলেন এক মহামানব।’ বঙ্গবন্ধুর গভীর মমতা আর তার সন্তানের মত স্নেহ তিনি বর্ণনা করছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৪ আগস্টে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শেষ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আলহাজ মোঃ মহিউদ্দিন বলেন, বঙ্গবন্ধু গণভবনে ব্যস্ত সময় কাটান। অনেকের সঙ্গে সাক্ষত দেন। এদিনও সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত।

কিন্তু রাষ্ট্রপতি হিসেবে বঙ্গবন্ধুর প্রথম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা পরদিন ১৫ আগস্ট সকালে। তাই গণভবনে বঙ্গবন্ধু যেন বেশি রাত না করেন, সে জন্য তৎকালীন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ভিসি আব্দুল মতিন চৌধুরী তৎপর ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সব সময় কাছে থাকা প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোঃ মহিউদ্দিনকে বার বার তাগাদা দিচ্ছিলেন ভিসি আব্দুল মতিন চৌধুরী।

মহিউদ্দিন স্মৃতি চারণ করতে গিয়ে বলেন, ভিসি আব্দুল মতিন চৌধুরী চাচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধু আগে বাসায় ফিরে গেলে পরদিন সকালে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ে অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর প্রস্তুতি ভাল হবে। বঙ্গবন্ধু তার বক্তব্য নিয়েও ভাবনার সময় পাবেন।

ভিসি মতিন চৌধুরী বলছিলেন, মহিউদ্দিন তুমি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বাসায় যাও। এই লোক আসে, ওই লোক আসে। সকালেই অনুষ্ঠান। বঙ্গবন্ধুকে ভাবনার সময়টুকু করে দাও। বঙ্গবন্ধুকে উঠিয়ে নিয়ে যাও।’

মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমি বললাম ঠিক আছে। উনাকে তো ওঠানোর একটা নিয়ম আছে। এই যে বঙ্গবন্ধু পাইপটা খান। পাইপের যে তামাকের ব্যাগটা আছে। সেটা ও পাইপ তার টেবিলের সামনে থাকে। চশমাটাও থাকে। আমার যখন বঙ্গবন্ধুকে ওঠানোর সময় হয়, তখন আমি পাইপের ব্যাগটা উঠিয়ে হাতে নেই। তখন বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেন উঠতে হবে। যখনই আমি উনার সামনে গিয়ে দাঁড়াই, উনি বুঝতে পারেন ওঠার সময় হয়েছে।’

মহিউদ্দিন বলেন, ‘প্রথমে ওইদিন আমি বঙ্গবন্ধুর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। কিন্তু সেদিন আসলে তখনই তার (বঙ্গবন্ধু) বাসায় ফেরার ইচ্ছা নাই। আমি দাঁড়িয়ে আছি। কিন্তু আমার দিকে বঙ্গবন্ধু তাকাচ্ছেন না। অন্যদিন দাঁড়ালে উনি সাধারণত বলেন, কি রে যাইতে অইব, গাড়ি লাগাইছস? কিন্তু সেদিন বঙ্গবন্ধু অন্য লোকের সঙ্গে কথা বলেন। আমার দিকে তাকানই না। তাই ভাবলাম, বঙ্গবন্ধু উঠবেন না। কি করমু, আমি বাইরে চলে আসলাম।’ ভিসি আব্দুল মতিন চৌধুরী জিজ্ঞেস করলেন, কি উঠাইলা না? বঙ্গবন্ধুকে তো উঠাইতে হবে। আমি বললাম, অন্য আরেকটা পলিসি করে দেখি। আমি (মহিউদ্দিন) দ্বিতীয় বার বঙ্গবন্ধুর কাছে গেলাম। টেবিলের ওপর থেকে তামাকের ব্যাগ ও পাইপটা হাতে নিলাম। বঙ্গবন্ধু আমাকে ধমক দিয়ে বলেন, রাখ এগুলা।

মহিউদ্দিন এই প্রতিবেদকের কাছে স্মৃতি চারণে বলেন, ‘আমি কি করমু! আমি ওগুলো রেখে দিলাম। আমি এই প্রক্রিয়ায়ও ফেল করলাম।’ শেষ চেষ্টা করার পরে বের হয়ে আসলাম। মতিন চৌধুরী বললেন, কি মহিউদ্দিন পারলা না? অতঃপর তিনি আমাকে নিয়ে বঙ্গবন্ধুর রুমে ঢুকলেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর সামনে গিয়ে বসলেন। বঙ্গবন্ধুকে শুনিয়ে শুনিয়ে তিনি (ভিসি) বললেন, কিরে মহিউদ্দিন গাড়ি লাগাইছস? আমি বললাম, হ, সব রেডি। এই সময় বঙ্গবন্ধু ভিসি মতিন চৌধুরীকে বললেন, কি আপনিও আমার পেছনে লাগলেন। মহিউদ্দিন পারল না। এইবার আপনি আসছেন? আমাকে ওঠাতে।

তখন বঙ্গবন্ধু বুঝলেন বাসায় যাওয়া দরকার। তারপর তিনি উঠলেন। তখন রাত প্রায় ৮টা। বাসায় গেলাম। দোতলায় গিয়ে বসলাম। আগামীকাল (১৫ আগস্ট) ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অনুষ্ঠান। কখন যাবেন, কি করবেন, তা আগেই ব্রিফ করে দেয়া হয়েছে। এরপর আমি চলে আসলাম। তখন রাত সাড়ে আটটা বাজে। আমি বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে অন্য দিনের মতোই বিদায় নিলাম। বঙ্গবন্ধুকে বললাম, আমি এখন আসি স্যার? বঙ্গবন্ধু হাসি মুখে বিদায় দিলেন। কিন্তু এই বিদায় যে শেষ বিদায়। বিশ^াস করতে পারছি না। এই স্মৃতি বলতে গিয়েই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন মহিউদ্দিন। যেন ফিরে গেলেন ১৯৭৫ সালে। এরপর পরের ঘটনা যেমনটি বলছিলেন তিনি।

মহিউদ্দিন বলেন, আমি চলে আসলাম আবার গণভবনে। তখন বঙ্গবন্ধুর প্রাইভেট সেক্রেটারি মশিউর রহমান (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা) ও গণভবনের জয়েন্ট সেক্রেটারি মনোয়ার ইসলাম পরদিন উচ্চ শিক্ষার জন্য লন্ডনে যাবেন। তাই গণভবনে ডিনার পার্টি। ওই ডিনারে তোফায়েল ভাই (সাবেক শিল্পমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ) ছিলেন। ডিনার শেষে তোফায়েল ভাই ও আমি একত্রে বের হলাম। বের হওয়ার পর তোফায়েল ভাই বললেন, আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলে যাই। তোফায়েল ভাইয়ের সঙ্গে আমি আবার বঙ্গবন্ধুর ধানম-ির ৩২ নম্বর বাসায় আসি। তখন আমি তোফায়েল ভাইকে বললাম আমি দোতলায় যাব না। আপনি যান। কারণ, এত রাত হয়েছে আমাকে দেখলে বঙ্গবন্ধু বকা দেবেন। কেন এত রাতেও আমি বাসায় ফিরি নাই। আমি উনাকে অনেক আগেই বাসায় নামিয়ে দিয়েছি। তাই ভয়ে আমি উপরে উঠলাম না।

মহিউদ্দিন বলছিলেন, আমার বাসা ইস্কাটনে। ধানম-ি ৩২ নাম্বার থেকে ইস্কাটনের পথের সময় মাপা। ৩২ নম্বর থেকে বের হওয়ার একটা নির্দিষ্ট সময় পরে অনেক সময়ই বঙ্গবন্ধু আমাকে ফোন দিতেন, আমি বাসায় পৌঁছেছি কিনা জানার জন্য। অনেক সময় বঙ্গবন্ধুকে নামিয়ে দিয়ে আমি একটু আড্ডা দিতাম। তাই বঙ্গবন্ধু অনেক সময় আমি বাসায় গেলাম কিনা আমাকে ফোন করে জানতেন।

মহিউদ্দিন বলেন, ‘এই যে এখন কথাগুলো বলতেছি, আমার খারাপ লাগতাছে। আমি ডিউটি করি, আমি তার কাছে কি। কিন্তু আমি কোথায় গেলাম, আমি বাসায় পৌঁছলাম কিনা, অন্য কোথাও আড্ডা মারলাম কিনা-জানার চেষ্টা। ওনার উদ্দেশ্য মহৎ। বঙ্গবন্ধু আমার খবর নিতেন। বঙ্গবন্ধু আমার খোঁজ নিতেন। তাই আমি তোফায়েল ভাইকে বললাম, বঙ্গবন্ধু আমাকে বকা দেবেন। আমি দীর্ঘ সময় বাইরে রয়েছি। কি পরিমাণ আমাকে আদর করতেন বঙ্গবন্ধু। আমি আর গেলাম না। তোফায়েল ভাই দোতলায় গিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলেন। কি কথা বলেছেন শুনি নাই। কথা বলা শেষে তোফায়েল ভাই নেমে আসেন। আমি আর তোফায়েল ভাই করিডোর দিয়ে বারান্দায় আসি। দেখি গাজী গোলাম মোস্তফা ভাই ও আরও কয়েকজন আসছেন। গাজী গোলাম মোস্তফা ভাই বারান্দায় আসলে আমি তাকে জানালাম বঙ্গবন্ধু আছেন। তারপর তার সঙ্গে হায়, হ্যালো করে আমরা চলে আসলাম। ওই সময় রাত সাড়ে ১১টা বাজবে। শেষ দিনের এই স্মৃতি মনে করতেই বঙ্গবন্ধুর শততম জন্ম দিনে আলহাজ মোঃ মহিউদ্দিনের চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছিল। শহরের পুরনো কাছারীর পৌর ভবন প্রাঙ্গণে এই স্মৃতি চারণ করেন জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য আলহাজ মোঃ মহিউদ্দিন। বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে রবিবার ৯৯ বছর পূর্ণ হতো। এই বিষয়টি উল্লেখ করতেই বঙ্গবন্ধুর ১৯৭৫ সালের জন্মদিনসহ নানা ঘটনার স্মৃতি মনে করে ফ্যাল ফ্যাল করে কেঁদে ওঠেন।

বঙ্গবন্ধুর জন্ম বার্ষিকীর এই অনুষ্ঠানে পৌর মেয়র আলহাজ ফয়সাল বিপ্লবের সভাপতিত্বে আরও আলোচনা করেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ শেখ লুৎফর রহমান ও জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি সদর উপজেলা চেয়ারম্যান আনিস-উজ-জামান প্রমুখ। মুন্সীগঞ্জ পৌরসভা আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর জন্য বিশেষ দোয়া করা হয়।

জনকন্ঠ

Leave a Reply

You can use these HTML tags

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

  

  

  

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.