পাঠক সংখ্যা

  • 8,846 জন

বিভাগ অনুযায়ী…

পুরনো খবর…

বঙ্গবন্ধুর পারিবারিক সংহতি: নাছিমা বেগম

স্বামী-স্ত্রীর মর্যাদাকর সম্পর্ক পরস্পরের আস্থা ও বিশ্বাসের ওপর নির্ভর করে। এর ওপর ভিত্তি করেই পরিবারের ভিত মজবুত হয়। একগুঁয়েমি বাদ দিয়ে পরস্পরের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকলে সংসারে সুখ থাকে। আমরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তার সহধর্মিণী বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা রেণুর দাম্পত্য জীবনে দেখেছি, তারা পরিবারের সুখের জন্য কতটা ত্যাগ করেছেন। তাদের দাম্পত্য জীবনে বঙ্গবন্ধু ৩০৫৩ দিন কারাগারে আটক ছিলেন। কখনও কখনও একটানা দুই বছরের ওপর কারাগারে থেকেছেন। কিন্তু তাদের আস্থা ও বিশ্বাসের মধ্যে কোনো ঘাটতি হয়নি, কোনো চির ধরেনি। তাদের দু’জনের পারস্পরিক বোঝাপড়া ছিল চমৎকার। বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনীর শুরুতেই উল্লেখ করেছেন, ‘আমার সহধর্মিণী একদিন জেলগেটে বসে বলল, বসেই তো আছো, লেখ তোমার জীবনের কাহিনী।’ খাতা নিয়ে লেখা শুরু করতে গিয়ে প্রথম পৃষ্ঠাতেই আবার লিখেছেন, ‘আমার স্ত্রী যার ডাক নাম রেণু- আমাকে কয়েকটা খাতাও কিনে জেলগেটে জমা দিয়ে গিয়েছিল। জেল কর্তৃপক্ষ যথারীতি পরীক্ষা করে খাতা কয়টা আমাকে দিয়েছে। রেণু আরও একদিন জেলগেটে বসে আমাকে অনুরোধ করেছিল। তাই আজ লিখতে শুরু করলাম।’ স্ত্রীর প্রতি কতটা শ্রদ্ধাবোধ এবং ভালোবাসা থাকলে জীবনের খাতার শুরুতেই স্ত্রীর অনুরোধ মেনে চলার স্বীকৃতি দিতে বঙ্গবন্ধু ভোলেননি। অসমাপ্ত আত্মজীবনী এবং কারাগারের রোজনামচায় তাদের পারস্পরিক বোঝাপড়ার অনেক প্রমাণ রয়েছে। বঙ্গবন্ধু তার আত্মজীবনীতে লিখেছেন, ‘রেণু খুব কষ্ট করত, কিন্তু কিছুই বলত না। নিজে কষ্ট করে আমার জন্য টাকা জোগাড় করে রাখত, যাতে আমার কষ্ট না হয়।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-১২৬)

বঙ্গমাতা রেণু বঙ্গবন্ধুর খাবার নিজ হাতে তৈরি করতেন। বঙ্গবন্ধুর যত্নের প্রতি তিনি বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করেননি। বঙ্গবন্ধুও বঙ্গমাতাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। সবার কাছে তার প্রশংসা করতেন। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের সময় বঙ্গমাতা বঙ্গবন্ধুকে বলেছেন, ‘তোমার চেয়ে বাংলার মানুষকে কে ভালো জানে? তোমার মন যা চায়, তুমি তাই বলবে।’ তাদের জ্যেষ্ঠ কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভাষণ থেকে এই সত্যটি জানা যায়। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের বক্তৃতার মঞ্চটি আমরা দেখেছি, রোস্টামে বঙ্গবন্ধুর চশমা ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কত নেতারা কত স্ট্ক্রিপ্ট, কত কথা লিখে দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু কিছুই অনুসরণ করেননি। স্ত্রী রেণুর কথামতো নিজের মনের কথাগুলো বলতে পেরেছিলেন বলেই সেই ভাষণ আজ বিশ্বনন্দিত। ইউনেস্কোর বিশ্ব প্রামাণ্য ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃত বিশ্বের দেওয়া ১০০টি ভাষণের মধ্যে অন্যতম। বাঙালি হিসেবে আমরা এই ভাষণের জন্য গৌরব অনুভব করি। বঙ্গমাতার পরামর্শে বঙ্গবন্ধু প্যারোলে যাওয়া থেকেও বিরত ছিলেন।

আমাদের সমাজে যদি কেউ স্ত্রীর কথা শুনে তাকে স্ত্রৈণ বলে। বিষয়টি এমন যে, স্ত্রীই শুধু স্বামীর কথা শুনবেন। স্ত্রীর যৌক্তিক কথা শুনলে ভালো ফল মেলে, বঙ্গবন্ধু তা বুঝতেন বলেই স্ত্রীর সব যৌক্তিক কাজে সহমত প্রকাশ করতেন। আমরা অনেক সময় জেন্ডার সমতার কথা বলতে গিয়ে ভুল ব্যাখ্যা করি। সবকিছুতেই দাঁড়িপাল্লা নিয়ে মাপতে বসে যাই। বিশেষ করে নারী-পুরুষের আহার, যেমন- মাছের মাথা কে খাবে ইত্যাদি। এ ক্ষেত্রে আমি মাঠ প্রশাসনে কাজ করার সময়ও বিভিন্ন সভা, সমাবেশে জেন্ডার সমতার নামে, কিছু কিছু কথার সঙ্গে একমত হতাম না। যেমন মা-সন্তানের ভালোবাসা, স্বামী-স্ত্রীর ভালোবাসা ভিন্ন ভিন্ন। মা হিসেবে সন্তানের প্রতি অপত্য ভালোবাসা এবং তাকে লালন-পালনের বিষয়টি কর্তব্যের জায়গা থেকে একজন নারীর কাছে অনেক বড়। আমরা স্বামী-স্ত্রী উভয়েই চাকরিজীবী হওয়ার কারণে আমাদের কর্মস্থলে দুই সন্তানকে নিয়ে বসবাস। সেখানে অন্য কারও খবরদারি ছিল না। যে খাবারটি আমার ছেলেদের পছন্দ, সেটি তাদের না খাইয়ে কখনোই আমি মুখে তুলতে পারিনি। তেমনি আমার স্বামীর পছন্দনীয় খাবারটি তাকে খেতে দিতে আমার ভালো লাগে। বিষয়টি স্বতঃস্ম্ফূর্ত, এখানে কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। একইভাবে আমার স্বামীও আমার পছন্দের গুরুত্ব দেন। আমার বড় ছেলেটির অটিজম আছে। সে সেরকমভাবে তার ভাব প্রকাশ করতে না পারলেও ছোট ছেলেটি আমার পছন্দের বিষয়ে সজাগ। এই যে পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ- এটাই পারিবারিক মূল্যবোধের ভিত্তি, পরিবারের বন্ধনকে মজবুত করে। স্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ স্ত্রীর কাজের মূল্যায়ন সঠিকভাবে অনেকেই করতে পারেন না। এর জন্য অনেকের সংসার ঠুনকো হয়। ভেঙে যায়। সম্প্রতি একটি দৈনিক পত্রিকার প্রতিবেদন আলোকে লেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশের বিয়ে-বিচ্ছেদের সংখ্যা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি। এর মধ্যে বিয়ে-বিচ্ছেদে নারীরা তিনগুণ এগিয়ে। এখানে আমি বঙ্গবন্ধুর বঙ্গমাতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নমুনা হিসেবে কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু, স্ত্রী রেণুর উদ্দেশে ভাবাবেগপূর্ণ যে চিঠি লিখেছিলেন তার উদ্ধৃত দিচ্ছি-

‘রেণু,

আমার ভালবাসা নিও। ঈদের পরে আমার সাথে দেখা করতে এসেছ। ছেলেমেয়েদের নিয়ে আসো নাই। তুমি ঈদ করো নাই। ছেলেমেয়েরা ঈদ করে নাই। খুব অন্যায় করেছ। ছেলেমেয়েরা ঈদে একটু আনন্দ চায়। কারণ, তা সকলে করে। তুমি বুঝতে পারো, ওড়া কত দুঃখ পেয়েছে। আব্বা ও মা শুনলে খুবই রাগ করবেন। আগামীতে দেখা করার সময় ওদের সকলকেই সঙ্গে করে নিয়ে এসো কারাগারে। কেন যে চিন্তা করো বুঝি না। আমার কবে মুক্তি হবে তার কোনো ঠিক নাই। তোমার একমাত্র কাজ হবে ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখানো। টাকার দরকার হলে আব্বাকে লিখো। কিছু কিছু মাঝে মাঝে দিতে পারবেন। হাসিনাকে মন দিয়ে পড়তে বলো। জামাল যেন মন দিয়ে ছবি আঁকে। এবার একটি ছবি এঁকে যেন নিয়ে আসে। আমি দেখব। রেহানা খুব দুষ্টু। ওকে কিছুদিন পরে স্কুলে দিও জামালের সাথে। যদি সময় পাও নিজেও একটু লেখাপড়া করিও। একাকী থাকতে একটু কষ্ট প্রথমে প্রথমে হতো। এখন অভ্যাস হয়ে গেছে। কোনো চিন্তা নাই। বসে বসে বই পড়ি। তোমার শরীরের প্রতি যত্ন নিও।

ইতি,
তোমার মুজিব’

রেণুকে লেখা বঙ্গবন্ধুর এই চিঠি পড়লেই দেখতে পাই স্ত্রীর ওপরে তিনি কতটা নির্ভর ছিলেন। সন্তানের লালন-পালন, মানুষ করার সব দায়িত্বভার স্ত্রীকে দিয়ে পরম নিশ্চিন্তে রাজনীতি করেছেন, কারাজীবন পার করেছেন। আমি মনে করি, বঙ্গমাতা তার পরিবারে যে মর্যাদাপূর্ণ আসন প্রতিষ্ঠা করেছেন, তা অনুকরণ করলে অনেকেরই পারিবারিক ভাঙন কমবে। অসমাপ্ত আত্মজীবনীর পৃষ্ঠা ৬-৭ পাঠ করলে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধুর পরিবারে তার মা এবং স্ত্রী উভয়েই পৈতৃক সম্পত্তির মালিক ছিলেন। আমাদের বর্তমান সমাজ ব্যবস্থায় এখনও এই বিষয়টি পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত না হলেও বঙ্গবন্ধুর পরিবারে নারীর মর্যাদাপূর্ণ ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠিত ছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ‘কারাগারের রোজনামচা’ গ্রন্থের ২২২ পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন, ডিসেম্বর মাসে চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন। চার মাস অতিক্রান্ত হলেও কোম্পানি বঙ্গবন্ধুর প্রভিডেন্ট ফান্ডের টাকা দেয়নি। টাকা-পয়সার অসুবিধার কারণে রেণু স্বামী মুজিবকে আশ্বস্ত করেন, যদি বেশি অসুবিধা হয় নিজের বাড়ি ভাড়া দিয়ে ছোট বাড়ি একটা ভাড়া করে নেবেন।

দাম্পত্য জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময়গুলো বঙ্গবন্ধুর জেলখানায় কাটলেও তাদের বোঝাপড়ার কোনো অভাব ঘটেনি। তাদের পারস্পরিক বিশ্বাস ছিল অতুলনীয়। সন্তানদের নিয়ে তাদের ছিল সুখের সংসার। খুব অল্পতেই তারা সুখী ছিলেন। সন্তানদেরও সেভাবেই তৈরি করেছেন। বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতা তাদের সমগ্র দাম্পত্য জীবনে ত্যাগের যে দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, তার কিছুটা হলেও যদি আমাদের দম্পতিরা অনুসরণ করেন, তাহলে অনেকের দাম্পত্য জীবনে শান্তির নীড় রচিত হবে।

সাবেক সিনিয়র সচিব, মহিলা ও
শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়

সমকাল

Leave a Reply

You can use these HTML tags

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

  

  

  

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.