আদালতের নকল সীল বানিয়ে ভুয়া গ্রেফতারি পরোয়ানা

পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় থানা পুলিশ ও আদালত পাড়ায় গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী দালাল চক্র। এরা আর্থিকভাবে লাভবান হতে নিরীহ সাধারণ মানুষকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে সর্বশান্ত করার পাশাপাশি ভুয়া গ্রেফতারী পরোয়ানা মূলে গ্রেফতার করিয়ে কারাগারে বন্দি করে রাখার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এমনকি পুলিশের হাতে আটক কিংবা গ্রেফতারকৃত আসামীকে আইনি সহায়তা প্রদানের নামে এরা সর্বশান্ত করে ফেলছে। এর নেপথ্যে রয়েছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। কারাগারেও এদের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত। এরা আসামী গ্রেফতারের পর চালান মূলে আদালতে হস্তান্তর হয়ে কারাগারে প্রেরণের পূর্বে জামিন করিয়ে দেয়ার কথা বলে প্রভাবিত করে কৌশলে নির্দিষ্ট ল’চেম্বারের ওকালত নামায় স্বাক্ষর রেখে আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছে।

আর এতে সহায়তা করছে দু’একটি ল’চেম্বারের সহকারী, থানা, কারাগার ও আদালত পাড়ায় দীর্ঘদিন ধরে কর্তব্যরত কতিপয় পুলিশ সদস্য।

নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, মুন্সীগঞ্জ জেলার দক্ষিন চরমুশুরী গ্রামের ফকিরা কান্দা এলাকার আবুল মৃধার পুত্র শাহেদ আলী তার জীবদ্দশায় কলাপাড়া আসেনি। অথচ ২২ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা নিয়ে প্রতারনা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে কলাপাড়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের একটি মামলায় নিজ বাড়ী থেকে ১০ আগষ্ট গ্রেফতার হয়ে ১৭দিন মুন্সীগঞ্জ জেলা কারাগারে হাজতবাস করতে হয় তাকে। পরিবারের সদস্যরা ধার-দেনা করে তার মামলা খূুঁজতে গিয়ে জানতে পারে কলাপাড়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের (সি.আর-২৮০/২০১৯) মামলার গ্রেফতারী পরোয়ানা মূলে মুন্সীগঞ্জ থানা পুলিশ তাকে আটক করে।

এরপর জামিন নিতে আইনজীবির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট আদালতে দরখাস্ত করে তার পরিবারের সদস্যরা। বিজ্ঞ আদালতে মামলার নথি উপস্থাপনের পর তারা জানতে পারে আসামীর কলামে শাহেদ আলী’র নাম নেই এবং মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। গ্রেফতার কিংবা সমন কিছুই আদালত ইস্যু করেনি। এরপর বিজ্ঞ আদালত গ্রেফতারী পরোয়ানা ইস্যুর স্মারক নম্বর, রেজিষ্ট্রার ও পরোয়ানায় ব্যবহৃত সীল-মোহর যাচাই করে মামলার দায় থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়ায় বন্দিদশা থেকে মুক্ত হয় শাহেদ আলী।

কারাগার থেকে মুক্তির পর এখন একটাই তার জিজ্ঞাসা এর কি কোন প্রতিকার নেই? একই মামলায় আদালতের সীল-মোহর, পরোয়ানা ইস্যুর স্মারক নম্বর জাল জালিয়াতি করে মুন্সীগঞ্জ জেলার দক্ষিন চরমুশুরী গ্রামের ফকির কান্দা এলাকার লাল মিয়ার পুত্র মহসিন, অলি হাওলাদারের পুত্র অলু এবং আলী মিয়া’র পুত্র মাসুমের নামে অপর ৩টি পৃথক গ্রেফতারী পরোয়ানা ইস্যু করা হয়েছে মুন্সীগঞ্জ থানায়। পুলিশী অভিযানে তারা এখনও পালিয়ে বেড়াচ্ছে। ভুক্তভোগী শাহেদ আলী’র মত তারাও মুক্তি চায় এই হয়রানী থেকে।

সূত্রটি আরও জানায়, কলাপাড়া সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে স্থানীয় একটি ব্রীক ফিল্ডের শ্রমিক সর্দার হিসেবে সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর থানার আটুলিয়া ইউনিয়নের বিরালক্ষী গ্রামের শামসুর রহমান’র পুত্র জাহাঙ্গীর হোসেন গত ২৪ এপ্রিল ২০১৯ তার নিজ জেলার ৪৯জন শ্রমিক’র বিরুদ্ধে ২২ লক্ষ ৭০ হাজার টাকা নিয়ে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে মামলা করে।

বিজ্ঞ আদালত মামলাটি তদন্তের জন্য ওসি কলাপাড়ায় প্রেরণ করেন, যা এখনও তদন্তাধীন রয়েছে। অথচ এ মামলায় হাজত বাস করতে হয়েছে শাহেদ আলীকে এবং এখনও পালিয়ে বেড়াচ্ছে মাসুম, অলু এবং মহসিন।

এদিকে এক ল’চেম্বার সহকারীর গোপন চিরকুট সূত্রে জানা যায়, চাঁদপুর জেলার দক্ষিণ মতলব থানার পূর্ববাড়ী গাঁও ও পাঁচ গুড়িয়া গ্রামের গৌরাঙ্গ চন্দ্র, পিতা-মৃত জিনেস চন্দ্র, গোবিন্দ চন্দ্র, পিতা-গৌরাঙ্গ চন্দ্র, শাহ আলম, পিতা-সিরাজ উদ্দীন, গাফ্ফার, পিতা- সামাদ মিয়া এদেরকে যেকোন মামলায় আসামী দেয়ার কন্ট্রাক্ট নিয়েছেন তিনি।

এভাবে আসামীর তালিকায় অন্তর্ভূক্তির জন্য জনপ্রতি ২ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত আর্থিক সুবিধা নিয়ে নিরপরাধ মানুষকে মামলায় জড়িয়ে হয়রানী করছে এ চক্রটি। টাকার পরিমান ২০ থেকে ৫০ হাজার হলে ধর্ষণ, ডাকাতির মত জামিন অযোগ্য ধারার মামলায় আসামী অন্তর্ভূক্তির কন্ট্রাক্ট নেয় চক্রটি।

কলাপাড়া জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতের বেঞ্চ সহকারী মো: ফেরদৌস জানান, ভুয়া পরোয়ানায় গ্রেফতারকৃত মুন্সীগঞ্জের আসামীকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। অপর ৩টি ভুয়া পরোয়ানার বিষয়ে কিছুই করা হয়নি। আদালত থেকে কোন পরোয়ানা সংশ্লিষ্ট মামলায় ইস্যু করা হয়নি বলে জানান তিনি।

পটুয়াখালী গোয়েন্দা বিভাগের ওসি মো: জাকির হোসেন জানান, কোন পোষ্ট অফিস ব্যবহার করে ভুয়া পরোয়ানা ইস্যু করা হয়েছে? মুন্সীগঞ্জ থানা এটি কিভাবে পেলো? ভুক্তভোগীর নিযুক্তীয় কৌশুলী বিজ্ঞ আদালতে দরখাস্ত দাখিল করে এর প্রতিকার চাইতে পারে। এছাড়া সুনির্দিষ্ট লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে এটি তদন্ত করা যেতে পারে।

আওয়াজবিডি/

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.