নদী তীরবর্তী ৩ কিলোমিটার ভাঙনে হেলে পড়েছে মসজিদ

বৃষ্টি ও উজান হতে নেমে আসা ঢলের পানিতে স্রোতের কারণে মুন্সীগঞ্জের নদী তীরবর্তী এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। টঙ্গীবাড়ি উপজেলার হাইয়ারপাড় এলাকা থেকে দিঘীরপাড় বাজার পর্যন্ত প্রায় ২ কিলোমিটার ও মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার শিলই ইউনিয়নের পূর্বরাখি এলাকা থেকে দেওয়ানকান্দি পর্যন্ত ১ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে।

সরেজমিনে দেখা যায়, পদ্মার ভাঙন কবলিত এ শাখা নদীতে প্রচণ্ড স্রোত বয়ে যাচ্ছে। হাইয়েরপাড় এলাকা ধরে দিঘীর পাড় বাজার পর্যন্ত যাওয়ার সময় নদী ভাঙতে দেখা যায়। ভাঙনের কারণে স্থানীয়রা তাদের বাড়ি ঘর অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে। হাইয়ারপার জামে মসজিদটি মাটি সড়ে গিয়ে বাঁকা হয়ে পদ্মা নদীর দিকে হেলে পড়েছে। যে কোনো মুহূর্তে মসজিদটি পদ্মায় বিলীন হতে পারে।

জানা যায়, চলতি বর্ষা মৌসুমে শুধু হাইয়ারপাড় এলাকার সুজ্জত আলী বেপারী, সায়েদ হালদার, নুরুল হক হালদার, আ. খালেক শেখ, ইদ্রিস হালদার, করিম হালদার, রহিম হালদারসহ কমপক্ষে ২৫টি পরিবারের বাড়ি পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে।

স্থানীয় ও ভাঙন কবলিত ভুক্তভোগীরা জানান, নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলন, কয়েক দিন পর পর বৃষ্টি, অন্য দিকে নদীতে প্রচণ্ড স্রোত। এ কারণে প্রতিদিন নদীর ভাঙন অব্যাহত রয়েছে। গত কয়েক বছর ধরেই একটু একটু করে ভাঙছে এ নদীটি। টঙ্গীবাড়ি উপজেলার দিঘীরপাড়, হাইয়ারপাড়, সরিষাবন, বড়াইল, ভাঙ্গনিয়া, বাগের পার, দশত্তর, বাগবাড়ি, চৌসাড় ও মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার পূর্বরাখি, দেওয়ানকান্দি এলাকায় পদ্মার ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ভাঙন কবলিত মানুষ রাস্তার পাশে অন্যর জমি ভাড়া নিয়ে ঘর উত্তোলন করে তাতে বসবাস করছে।

আব্দুল খালেক শেখ নামে এক ব্যক্তি জানান, তার বসত বাড়ির একটি ঘর এ বছর পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। পাশের ছোট একটি ঘরে পরিবারে ৬ জন সদস্য নিয়ে বসবাস করছেন। ওই ঘরটিও যে কোনো দিন নদীতে বিলীন হতে পারে। নদীটির এক কিলোমিটার দক্ষিণে তাদের বসত ভিটা ছিল। ভাঙনের কারণে এক কিলোমিটার উত্তরে এসেছেন। সেখানেও ভাঙন অব্যাহত রয়েছে।

তিনি আক্ষেপের সাথে জানান, পদ্মা নদী হতে ড্রেজার বসিয়ে অবৈধভাবে মাটি উত্তোলনের কারণে ভাঙনের তীব্রতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ ভাঙন কমাতে নদীতে বাঁধ, অবৈধ মাটি উত্তোলন বন্ধ করতে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না।

উপজেলার কামারখাড়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মহিউদ্দিন হালদার জানান, ভাঙনে কামাড়খাড়া ইউনিয়নের বিলেরপাড়, বড়াইল, বাগবাড়ি, ভাঙ্গনিয়া গ্রামের অনেক পরিবার ঘর বাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছে। এই অঞ্চলের শত শত একর আবাদি জমি নদীতে বিলীন হয়েছে। দিঘিরপাড় বাজারের নদীর বিপরীত পারের চরাঞ্চলের আবাদি কৃষি জমি পদ্মায় বিলীন হচ্ছে। বিগত এক যুগের পদ্মার ভাঙনে উপজেলার দিঘিরপাড় ও হাসাইল ইউনিয়নের ৯০ ভাগ অংশ এবং পাচঁগাও ও কামারখাড়া ইউনিয়নের প্রায় অর্ধেক অংশ পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ১০ বছর আগে পাঁচগাও ও হাসাইল অঞ্চলে স্থায়ীভাবে বাঁধ নির্মাণ করা হলেও কামারখাড়া, দিঘিরপার এলাকায় কোনো বাঁধ নির্মাণ হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি জানান, মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের সাংসদ সাগুফতা ইয়াসমিনের নির্বাচনি এলাকা এটি। সাংসদ নিজের বাড়ি লৌহজংয়ে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নিচ্ছেন। আমাদের এলাকার জন্য কোনো ব্যবস্থা তিনি নিচ্ছেন না।

এ বিষয়ে জানতে সাগুফতা ইয়াসমিনের মুঠোফোন একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি। তার সহকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করেও সাংসদের সঙ্গে কথা বলা যায়নি।

টঙ্গীবাড়ি উপজেলা চেয়ারম্যান জগলুল হালদার জানান, এ নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙনের তীব্রতা বেড়েছে। ভাঙনের কারণে প্রতিবছর নদীগর্ভে ঘর-বাড়ি, বাজার বিলীন হচ্ছে। ব্যক্তি উদ্যোগে কিছু জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। পানি সম্পদ প্রতিমন্ত্রী এসেছিলেন, বরাদ্দের আশ্বাস দিয়েছেন।

মুন্সীগঞ্জ পানি সম্পদ অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী রকিবুল ইসলাম জানান, লৌহজং উপজেলার সামুরবাড়ি হতে টঙ্গীবাড়ি উপজেলার হাইয়ারপাড় পর্যন্ত ১২ দশমিক ৯ কিলোমিটার এলাকায় বাঁধ নির্মাণের জন্য ৫৮৩ কোটি টাকার ইস্টিমেট তৈরি করা হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডে একটি হিসাব পাঠানো হয়েছে। যাচাই-বাছাই করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। বরাদ্দ পেলে কাজ শুরু করা হবে। এর মধ্যে দিঘীরপাড় বাজার থেকে হাইয়ারপাড় এলাকার অতিরিক্ত ভাঙন কবলিত দেড় কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

দৈনিক অধিকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.