‘ভিক্ষা নয়, সবজি বিক্রি করতে চাই’

রিয়াদ হোসাইন: মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও ব্যবসা করার মতো সহযোগিতা পাননি তিনি। তাই ভিক্ষাবৃত্তির মতো নিচু একটি পেশায় নেমেছেন। আর এ দিয়েই কোনোমতো চলছে তার সংসার। সরকারি সহযোগিতা পেলে ভিক্ষা নয় বরং যন্ত্রচালিত গাড়িতে করে সবজি বিক্রয় করতে চান তিনি। শুধুমাত্র এক লাখ টাকা হলেই তিনি শুরু করতে পারবেন ভ্রাম্যমাণ এ সবজির ব্যবসা।

বহমান জীবনের এ গল্পটা ট্রাকচাপায় পা হারানো মিরাজ হালদারের (৫০)। তিনি মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ী উপজেলার ধীপুর এলাকায় মৃত ইন্তাজউদ্দিন হালদারের ছেলে। বর্তমানে তিন মেয়ে ও এক ছেলে সন্তানের জনক। বড় দুই মেয়ে মাদ্রাসায় পড়াশুনা করে। মেয়েদের পড়াশুনা, সংসার ও ওষুধের খরচ জোগাড় করতে উপজেলার দিঘীরপাড়, কামারখাড়া, কালিবাড়ী বাজারসহ বিভিন্ন বাজারে ভিক্ষা করে দৈনিক ৪শ থেকে ৫শ টাকা আয় করেন। সুস্থ অবস্থায় মিরাজ হালদার রিকশা ও দিনমজুরের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন।

জানা যায়, তিন বছর আগে ঢাকা থেকে বাসায় ফেরার পথে ট্রাকচাপায় একটি পা হারান মিরাজ হালদার। এ দুর্ঘটনায় তার চিকিৎসার জন্য ট্রাক মালিকের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও টাকা পাবার সৌভাগ্য হয়নি তার। পরবর্তীতে মিরাজের মা ও তার শ্বশুর ধার-দেনা করে মিরাজের চিকিৎসা করায়। এ সময় একটি পা কেটে ফেলে দেওয়া হয় এবং সুচিকিৎসার অভাবে তার অপর পা বিকল হয়ে পড়ে।

মিরাজ হালদার জানান, তিন বছর আগে রিকশা, দিনমজুরি কাজ করে মা ও স্ত্রী-সন্তান নিয়ে আমার জীবন ভালো কাটছিল। যা এখন আমার জীবনের শুধুমাত্র সোনালী একটি অতীত। একদিন ঢাকা থেকে লেগুনা গাড়ির পিছনে দাঁড়িয়ে বাসায় ফিরছিলাম। নারায়ণগঞ্জের চাষাড়া এলাকায় আসলে হঠাৎ পেছন থেকে একটি ট্রাক আমার পায়ে আঘাত করে। এতে আমি জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান ফেরার পর আমার পায়ের অবস্থা দেখে সে সময় আর বাঁচার ইচ্ছে ছিলনা। আমার মা ও শ্বশুর ধার-দেনা করে আমার চিকিৎসা করান। কিন্তু চিকিৎসার পর প্রতি মাসে দেড় হাজার টাকার মতো ওষুধ প্রয়োজন ছিল। সে টাকা জোগাড় করা আমার পরিবারের পক্ষে সম্ভব হয়নি। তাই ভিক্ষাবৃত্তির মতো নিচু একটি পেশায় আজ আমাকে নামতে হয়েছে।

এ কথা বলতে বলতেই তার দুচোখ গড়িয়ে অঝোরে পানি পড়তে থাকে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠস্বর নিয়ে মিরাজ হালদার বলেন, ভিক্ষা নয়, ‘আমি সবজি বিক্রি করে আমার সংসার চালাতে চাই। ভিক্ষা করে দৈনিক ৪শ থেকে ৫শ টাকা আয়ের থেকে আমি সবজি বিক্রি করে ২শ টাকা আয় করতে চাই। যে টাকায় তৃপ্তি রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘জমি আছে ঘর নাই’ প্রকল্পে আবেদন করেছিলাম কিন্তু জমি কেনার পরও জমির পর্চা না থাকায় ঘর পাইনি। গরীবকে সবাই মারে। প্রতিবেশী মৃত বদন আলী থেকে জমি কিনেছি, ওই জমিতে আমরা এখন বসবাস করি। কিন্তু জমির দলিল করে দেওয়ার আগেই তিনি মারা যায়। সবাই জানে ওই জমি আমাদের কিন্তু কোনো কাগজপত্র না থাকায় সরকার থেকেও কোনো ঘর দেয়নি।

এ দিকে, তার ছেলেরা জমি বাবদ ২০ লাখ টাকা দাবি করেন। তবে, জমি হিন্দুদের সম্পত্তি বলে তারা লিখে দিতে পারবেন না বলেও আমি শুনেছি। আর এতো টাকাও আমার কাছে নেই যে কেনা জমি আবারও কিনবো।

পা হারানো মিরাজ সহযোগিতা চেয়ে বলেন, সবাই যদি অল্প অল্প করে সহযোগিতা করে, তাহলে অভিশপ্ত এই পেশা থেকে আমি মুক্তি পাবো। উপজেলা প্রশাসন বা স্থানীয় বিত্তবানরা এগিয়ে আসলে পাল্টে যেতে পারে আমার মতো পা হারানো মিরাজের গল্প। কারো সহযোগিতায় আবারও নতুন গল্প শুরু হবে এই প্রত্যাশায় দিন কাটছে আমার।

দৈনিক অধিকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.