হানাদারমুক্ত মুন্সিগঞ্জ

সাহাদাত পারভেজ: ১১ ডিসেম্বর মুন্সিগঞ্জ জেলা হানাদার মুক্ত দিবস। একাত্তরের এই দিনে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে বর্বর হানাদার বাহিনী এই এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়। মুন্সিগঞ্জে প্রথম শত্রুমুক্ত হয় টঙ্গীবাড়ী উপজেলা। ১৪ নভেম্বর এই উপেজলা মুক্ত হয় । ১৫ নভেম্বর বিবিসিতে এই সংবাদ প্রচারিত হয়। বিবিসির তথ্য মতে, টঙ্গীবাড়ীই বাংলাদেশে সর্বপ্রথম হানাদার মুক্ত হয়। ১৫ নভেম্বর হানাদার মুক্ত হয় লৌহজং উপজেলা। এই সংবাদও বিবিসি ও আকাশ বাণী থেকে প্রচার করা হয়। ১৭ নভেম্বর শ্রীনগর ও ২০ নভেম্বর সিরাজদিখান শত্রুমুক্ত হয়। গজারিয়া মুক্ত হয় ৯ ডিসেম্বর। গেরিলাদের সাঁড়াশি আক্রমণে ১০ ডিসেম্বর গভীর রাতে হানাদার বাহিনী লেজ গুটিয়ে মুন্সিগঞ্জ শহর ছেড়ে পালায়। গা-ঢাকা দেয় পাকিস্তানি বাহিনীর দোসর রাজাকাররাও। ৯ মাসের নিস্তব্ধতা ভেঙে মুন্সিগঞ্জের আকাশে ওড়ে বিজয় কেতন। মুক্তিবাহিনী ও জনতার আনন্দ মিছিলে মুখরিত হয় মুন্সিগঞ্জের পথ-পান্তর।

গজারিয়া গণকবর

একাত্তরের নয় মাস মুন্সিগঞ্জের বিশাল ক্যানভাস ছিল রক্তমাখা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরাসরি নির্দেশে ২৫ মার্চ রাত ১০টার মধ্যে বাউশিয়া ও মেঘনাঘাটের ফেরিগুলো রামচন্দ্রপুরে পাঠিয়ে দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের যোগাযোগ বন্ধ করে দেন স্থানীয় এমএনএ অধ্যাপক কে এম শামসুল হুদা। ২৬ মার্চ সকালে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার সংবাদ পান মুন্সিগঞ্জের মুক্তিকামী মানুষ। শহরের প্রাণকেন্দ্র গোয়ালপাড়ায় অবস্থিত মুন্সিগঞ্জ টেলিফোন এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর পাঠানো এই নির্দেশ গ্রহণ করেন তৎকালীন মহকুমা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা মোহাম্মদ হোসেন বাবুল। সকাল ৯টার দিকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আবুল কাশেম মোহাম্মদ তারা মিয়া শহর জুড়ে মাইকিং করে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার কথা প্রচার করেন। এই সংবাদ শুনতে পেয়ে মুন্সিগঞ্জের আপামর জনতা দিনভর শহরে বিক্ষোভ করতে থাকেন। ওই দিনই স্বাধীনতাকামী মানুষ হরগঙ্গা কলেজে জড়ো হয়ে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে মুন্সিগঞ্জে প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করেন। এ সময় পাকিস্তানি হানাদারদের প্রতিরোধের শপথ গ্রহণ করেন হাজার হাজার জনতা। অন্যদিকে বিক্ষুব্ধ জনতা মুন্সিগঞ্জ থানার সামনে বিক্ষোভ মিছিল করেন। স্থানীয় সুভাষচন্দ্র সাহাসহ কয়েকজন যুবক মুন্সিগঞ্জ পুলিশ স্টেশনের স্ট্যান্ডে বাঁধা পাকিস্তানি পতাকা পুড়িয়ে দেন।

হরগঙ্গা কলেজে বধ্যভূমি স্মৃতিস্তম্ভ

ওই দিন দুপুরেই মহকুমা সংগ্রাম পরিষদের নেতারা এবং মুক্তিকামী ছাত্র-যুবক সম্মিলিতভাবে অস্ত্রের ট্রেজারি লুট করেন। ট্রেজারি লুণ্ঠনে মুন্সিগঞ্জের তৎকালীন এসডিও জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর নেপথ্য সমর্থন ছিল। তাই অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের সময় পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের বাধা আসেনি। সংগ্রাম পরিষদের নেতারা ট্রেজারির চারটি তালা ভেঙে ১৬০টি রাইফেল আর বিপুলসংখ্যক গোলাবারুদ লুট করে স্থানীয় ছাত্র-যুবকদের মধ্যে বিতরণ করেন। এটিই ছিল মুন্সিগঞ্জের মুক্তিপাগল যুবকদের প্রথম বিদ্রোহ, যা পাকিস্তানি হানাদারদের টনক নাড়িয়ে দিয়েছিল। সমবেত ছাত্র-জনতা শ্রীনগর, লৌহজং ও টঙ্গীবাড়ী থানার রাইফেল ও গুলি লুট করে। সিরাজদিখান থানার ওসি মুজিবর রহমান ও গজারিয়া থানার ওসি সৈয়দ আমীর আলী নিজে থেকেই মুক্তিকামী বিদ্রোহী যুবকদের অস্ত্র দিয়ে দেন। অস্ত্র হাতে পেয়ে যুবকরা মুন্সিগঞ্জ লঞ্চঘাট, সৈয়দপুর লঞ্চঘাট, আবদুল্লাহপুর লঞ্চঘাট, তালতলা লঞ্চঘাট, গজারিয়া লঞ্চঘাট ও লৌহজং নৌবন্দরে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

টঙ্গীবাড়ীর পালবাড়িতে স্মৃতিস্তম্ভ

এদিকে ২৬ মার্চ সকাল থেকেই ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ থেকে হাজার হাজার মানুষ স্রোতের মতো মুন্সিগঞ্জের দিকে আসতে থাকেন। মুন্সিগঞ্জের প্রায় প্রতিটা বাড়ি, স্কুল আর নদীর পাড়ের গ্রামগুলো হয়ে ওঠে শরণার্থী শিবির। মে মাসের শুরুতে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন ও আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক হামিদুর রহমান সপরিবারে মুন্সিগঞ্জের উত্তর কোটগাঁওয়ে এসে আশ্রয় নেন। এরপর তারা জীবন ঝুঁকির মধ্যে নানা জায়গায় ঘোরপাক খেতে থাকেন। সে সময় মুন্সিগঞ্জের মানুষ তাদের আশ্রয় দিতে পারলেও পাকিস্তানি হানাদার ও দালালদের কারণে নিরাপত্তা দিতে পারেননি। ৩১ মার্চ নারায়ণগঞ্জ শহরে হানাদার আক্রমণের খবর পেয়ে মুন্সিগঞ্জের একঝাঁক বিপ্লবী তরুণ নারায়ণগঞ্জে গিয়ে সম্মিলিতভাবে সেই আক্রমণ প্রতিহতের চেষ্টা করেন। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যেন মুন্সিগঞ্জে অনুপ্রবেশ করতে না পারে, সে জন্য মুক্তিপাগল বিদ্রোহীপ্রাণ যুবকরা ধলেশ^রী নদীর পাড়ে অসংখ্য বাংকার তৈরি করে পাহারায় থাকেন। এসব খবরের ভিত্তিতে মে মাসে হানাদার বাহিনী মুন্সিগঞ্জে এসে দানবের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। এরা মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় গণহত্যা চালিয়ে রক্তবন্যা বয়ে দেয়।

সিরাজদিখানের রামসিংয়ের বাড়ি

একাত্তর সালে মুন্সিগঞ্জ ছিল ঢাকা জেলার একটি মহকুমা। নদীবেষ্টিত গজারিয়া থানা মুন্সিগঞ্জের অন্তর্গত হলেও মূলত এটি ছিল একটি বিচ্ছিন্ন এলাকা। ৮ মে মধ্যরাতে একজন পাকিস্তানি মেজরের নেতৃত্বে বেলুচ রেজিমেন্টের দুই শতাধিক সৈন্য গজারিয়ায় অনুপ্রবেশ করে। পরদিন ৯ মে ভোর বেলায় এক ভয়াবহ অভিযান শুরু করে। এটিই মুন্সিগঞ্জের প্রথম গণহত্যা। বর্বর হানাদার বাহিনী গজারিয়া উপজেলার ফুলদী নদীর উপকণ্ঠের গ্রামগুলোতে নারকীয় অভিযান চালিয়ে তিন শতাধিক নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করে। ওই দিনই সকাল বেলা হানাদার বাহিনী নৌপথে মুন্সিগঞ্জ শহরে অনুপ্রবেশ করে। ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্টের মেজর আবদুস সালামের নেতৃত্বে দুই শতাধিক সৈন্যের একটি কোম্পানি মুন্সিগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজে ঘাঁটি স্থাপন করে। মুন্সিগঞ্জে ফ্রন্টিয়ার ফোর্স রেজিমেন্ট পাঠানো হয় মূলত গণহত্যা পরিচালনার জন্য।

শ্রীনগরে শহিদ মুক্তিযোদ্ধা বোরহান উদদিন খানের নামে সড়ক

ট্রেজারি লুটের ঘটনায় ১১ মে হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রধান দেহরক্ষী মোহাম্মদ মহিউদ্দিন, মহকুমা সংগ্রাম পরিষদের নেতা ডা. আবদুল কাদের, মহকুমা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হারুন-অর-রশীদ, মোহাম্মদ হোসেন বাবুল, আনোয়ার হোসেন অনু, ডা. আবদুল মতিন ও ব্যাংকার দেলোয়ার হোসেন পাগলার বাড়িতে আগুন দেয়। এ দিন তারা পেট্রল ঢেলে শহরের বেশ কয়েকটি হিন্দুপাড়াও জ্বালিয়ে দেয়। এর আগের দিন ১০ মে টঙ্গীবাড়ী উপজেলার পালবাড়ি, ১২ মে সিরাজদিখান উপজেলার রশুনিয়া রামসিংয়ের বাড়ি ও ১৪ মে মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার মহাকালি কেদার রায় চৌধুরীর বাড়িতে ভয়াবহ গণহত্যা চালায়। ১২ মে থানায় থানায় ক্যাম্প স্থাপনের মাধ্যমে হানাদাররা পুরো মুন্সিগঞ্জকে মৃত্যু উপত্যকায় পরিণত করে।

লৌহজংয়ে গোয়ালীমান্দ্রা বিজয়স্তম্ভ

তিন সপ্তাহ ধরে লাগাতার গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী নিধন, নারী-শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, ধরপাকড়, অগ্নিসংযোগ ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে মেজর সালাম ৩০ মে মুন্সিগঞ্জ ত্যাগ করে। ঢাকায় ফিরে যাওয়ার সময় সে তার লঞ্চে এসডিও জিয়াউদ্দিন এম চৌধুরীর বিরুদ্ধে রাইফেল লুট বন্ধ করতে না পারা, অস্ত্রের ট্রেজারি লুণ্ঠনকারী ছাত্রদের সমাবেশে উপস্থিতি এবং এসডিও বাংলোতে বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলনসহ নানা অভিযোগ তুলে ধরে। এর প্রতিবাদে এসডিও কিছু বলতে গেলে মেজর সালাম ধমকের সুরে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, ‘আপনার সৌভাগ্য যে, মে মাস বলে আপনি আমার সঙ্গে কথা বলতে পারছেন। আর এক মাস আগে হলে আপনাকে কোনো কথা বলতে দেওয়া হতো না। আপনি শুধু মেশিনগানের শব্দ শুনতেন।’ সেই যাত্রায় এসডিও রেহাই পেলেও পরবর্তী দেড় মাস তাকে ঢাকা সেনানিবাসে মেজর সালামের ঊর্ধ্বতন ব্যাটালিয়ন কমান্ডারের কাছে সপ্তাহে দুদিন হাজিরা দিতে যেতে হতো। এ সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এসডিওর নানা কর্মকা- নিয়ে তদন্ত করে। তদন্ত শেষে সেনাবাহিনী জিয়াউদ্দিন চৌধুরীকে গ্রে [কালো বা সাদা নয়] আখ্যায়িত করে জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে মানিকগঞ্জে বদলি করে। আর মানিকগঞ্জের এসডিও বাহাদুর মুনশি আসেন মুন্সিগঞ্জে।

মেজর সালাম চলে যাওয়ার পর মুন্সিগঞ্জের হানাদার বাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পায় মেজর জাবেদ রহিম। এই জাবেদ রহিম ঢাকায় অপারেশন সার্চ লাইটে সরাসরি যুক্ত ছিল। জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময় মুন্সিগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজে অ্যাসিস্ট্যান্ট সাব-মার্শাল ল’ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হেডকোয়ার্টার স্থাপিত হয়। এর প্রধান হিসেবে যোগ দেয় ক্যাপ্টেন এম ছিদ্দিক [ইপিসিএ]। সে ছিল এক ভয়ংকর বেলুচি সেনা কর্মকর্তা। এই মার্শাল ল’ আদালত পাকিস্তানবিরোধী শত শত যুবকের নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। হুলিয়া মাথায় নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় যুবকরা আত্মগোপনে থেকে শত্রু ঘাঁটিতে কখনো প্রকাশ্যে, কখনো চোরাগোপ্তা হামলা চালায়। মেজর জাবেদ রহিম ও ক্যাপ্টেন সিদ্দিকের প্রত্যক্ষ নির্দেশে মুন্সিগঞ্জের পরবর্তী গণহত্যাগুলো সংঘটিত হয়।

একাত্তরে হানাদার বাহিনী মুন্সিগঞ্জে কাতারে কাতারে মানুষ হত্যা করে। পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে চিকিৎসক, শিক্ষক, আইনজীবী, লেখক, সংবাদকর্মী, সমাজকর্মী, ব্যবসায়ী, অভিনেতা, ক্রীড়াবিদ, সরকারি কর্মকর্তা ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসহ মুক্তিসংগ্রামে নিবেদিত মানুষদের। একাত্তর সালের ৯ মাসে ৩৬৯ বর্গমাইল আয়তনের মুন্সিগঞ্জের ৪২টি স্থানে ১৪৫টি গণহত্যা সংঘটিত হয়।

১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর নাকে খত দিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। কিন্তু দীর্ঘ নয় মাসে তিরিশ লাখ প্রাণ হরণ করে তারা মানুষের মনে যে ক্ষত তৈরি করে, তা কোনো দিন শুকানোর নয়। মুন্সিগঞ্জের প্রতিটি শহিদের বাড়িতে গেলে আজও করুণ কান্নার আওয়াজ পাওয়া যায়।

সাহাদাত পারভেজ এর ফেবু থেকে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.