মুল সাইটে যাওয়ার জন্য ক্লিক করুন

পাঠক সংখ্যা

  • 11,189 জন

বিভাগ অনুযায়ী…

পুরনো খবর…

দখলে অস্তিত্বহীন ঐতিহ্যবাহী রজতরেখা নদী

নদীটি চওড়ায় ছিল প্রায় ৪৮০ ফুট। এই নদী দিয়েই চলত লঞ্চ-স্টিমারসহ ছোট-বড় বিভিন্ন নৌযান। পাওয়া যেত মিষ্টি পানির হরেক রকম দেশীয় মাছ। পাশাপাশি নদীর পানি দিয়ে চলত কৃষিসহ স্থানীয়দের দৈনন্দিন কাজ। তবে এখন এসব শুধুই অতীত।

বলছি মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুর এলাকার ঐতিহ্যবাহী রজতরেখা নদীর কথা যার উৎপত্তিস্থল পদ্মা নদী। পূর্ব পাশে মুন্সীগঞ্জ সদর ও পশ্চিম পাশে টঙ্গিবাড়ি উপজেলা। দিঘিরপাড় হতে বেশনাল-পুরা ও বাজার-মাকাহাটি হয়ে সদরের কাটাখালি দিয়ে মুন্সীগঞ্জ শহরের লঞ্চ চলাচল করত। একইভাবে বিভিন্ন নৌযানে দুই উপজেলায় আসা-যাওয়া করত স্থানীয়রা। প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ নদীটি ধলেশ্বরীতে গিয়ে মিশে গেছে। তবে দখলের কারণে বর্তমানে নদীটি নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে, রূপ নিয়েছে একটি মৃত খালে।

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, ধবধবে সাদা উত্তাল জলরাশির জন্যই এই নদীটির নামকরণ করা হয়েছিল রজতরেখা। বাংলার কৃতি সাঁতারু পরেশ নাথ দত্ত ছিলেন বিক্রমপুর নশংকর এলাকার বাসিন্দা। তিনি এ নদীতে প্রায়ই সাঁতার কাটতেন। পরবর্তীকালে বোম্বেতে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত সাঁতার প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জনও করেছিলেন তিনি। সে সময় নদীটি ৪৮০ ফুট চওড়া ছিল। আর এখন সংকুচিত হয়ে পরিণত হয়েছে মৃত খালে।

সরেজমিনে দিঘিরপাড় এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদীর উৎস মুখে বাঁধা রয়েছে একটি ড্রেজার। মুখটি বালু দিয়ে বন্ধ করে পাশের জমির সমান উঁচু করে রাখা হয়েছে। ভরাট করা অংশের পাশেই রয়েছে বড়বড় গর্ত। এভাবে কমপক্ষে নদীর প্রায় ২০০ মিটার ভরাট করা হয়েছে। ভরাট করা অংশগুলোর সূত্র ধরে সামনে এগোতেই চোখে পড়ে নদীর অস্তিত্ব। তবে নদী এখন সম্পূর্ণ শুকিয়ে আছে। আর দিঘিরপাড় বাজার থেকে চর বেশনাল পর্যন্ত এক কিলোমিটারের মধ্যে নদীতে এক ফোটাও পানি নেই। এরপর থেকে সামান্য পরিমাণ কাদাপানি চোখে পড়ে। এভাবেই নদীটির আকার বর্তমানে ৪০ থেকে ৫০ ফুট চওড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, বছর বিশেক আগেও নদীটি প্রবহমান ছিল। বর্ষাকালে এই নদীতে কানায় কানায় পানি থাকত। ফলে নদী থেকে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। পাশাপাশি এই নদী দিয়েই ছোট-বড় অসংখ্য লঞ্চ-স্টিমার, ট্রলার ও মালবাহী নৌকা চলাচল করত। এখন সবকিছুই অতীত। দখলের কারণে নদীটি নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে।

তারা অভিযোগ করেন, নদীর উৎপত্তিস্থল দিঘিরপাড় এলাকা। দীর্ঘদিন ধরে সেখানে নদীর মুখ বন্ধ করে বালুর ব্যবসা করে আসছেন শিলই ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হাসেমের ভাই ও সাবেক ইউপি সদস্য ইসমাঈল ব্যাপারি। ফলে নদীটির প্রবাহ একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে। আর এ সুযোগে নদীর দুই ধার দখল করে ইসমাঈলের মতো অনেক প্রভাবশালীরা দোকানপাটসহ অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ করেছেন।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি- উৎস মুখ ভরাট করার কারণেই ১২ কিলোমিটার প্রশস্ত নদীটি অস্তিত্ব হারিয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে ড্রেজার দিয়ে বালু ফেলে নদীর মুখটি ভরাট করেন ইসমাঈল। শুকনো মৌসুম জুড়ে গভীর গর্ত করে সেই বালু বিক্রি করেন তিনি। কৌশলে রাতের আঁধারে পদ্মার শাখা নদীতে ড্রেজার বসিয়ে আবারও ভরাট করে দেন সেই গর্ত। এভাবেই চলছে তার রমরমা বালু ব্যবসা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, ইসমাঈল ও তার অনুসারীরা পদ্মার শাখা নদী থেকে বালু উত্তোলন করে কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা করছে। পাশাপাশি রজতরেখা নদী দখল করে ১০ থেকে ১২টি দোকান নির্মাণ করেছেন ইসমাইল। চেয়ারম্যান আবুল হাশেম ব্যাপারির ছত্রছায়ায় ইসমাইল ও দখলদাররা তাদের আগ্রাসন চালিয়ে যাচ্ছে। প্রাণ হারানোর ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না। প্রশাসনও সবকিছু জানা সত্ত্বেও কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এমন করেই প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সব খাল-নদী দখল করে নিচ্ছে।

এ দিকে, অভিযোগের ব্যাপারে ইসমাঈল ব্যাপারি জানান, তিনি বালু ভরাট করেননি, নদীর মুখ এমনিতেই ভরাট হয়ে গেছে। তবে নদীর মুখটি তার রেকর্ডিয় সম্পদ। ভূমি অফিস এখন পর্যন্ত ১৮ বার এসে দেখে গেছে। বর্তমানে সেখান থেকে বালু কেটে তিনি বিক্রি করছেন।

রাতের আঁধারে পদ্মার শাখা নদী থেকে বালু উত্তোলনের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, রাতের আঁধারে নদী থেকে বালু উত্তোলন এখন বন্ধ আছে। তার ভাই চেয়ারম্যান আবুল হাসেম উমরা হজ্জে গেছেন। সেখান থেকে আসলেই পুনরায় তারা কাজ শুরু করবেন।

সম্প্রতি রজতরেখা নদী থেকে সৃষ্ট রজতরেখা খালের ওপর পাকা স্থাপনা নির্মাণ করছিলেন ইসমাঈল ব্যাপারি। এ নিয়ে গত বছরের ১৫ মে ও ১৪ অক্টোবর দৈনিক অধিকারে সচিত্র দুটি প্রতিবেদনও প্রকাশিত হয়। প্রতিটি প্রতিবেদনের বক্তব্যে স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ করে খাল পুনঃখননের কথা জানান জেলা প্রশাসক। এরপর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।

এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীরা। তারা অভিযোগ করেন, প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দখল করা খালে পাকা দোকানঘর নির্মাণ করা হলো। আবার বুক চওড়া করে নদী-খাল দখল, বালু ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন ইসমাঈল ব্যাপারি। আর প্রশাসনও ইচ্ছে করেই বিষয়টিতে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

গত শুক্রবার (১৭ জানুয়ারি) বিকাল পর্যন্ত, ওই খালের ওপর ৮ থেকে ১০টি পাকা দোকানঘর বানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে অগ্রীম জমা গ্রহণ করে দোকান ভাড়াও দিয়েছেন ইসমাঈল। সেই দোকানে চলছে এখন মুরগি বিক্রয়ের ব্যবসা। এছাড়া অন্য দোকানগুলো ভাড়া দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলেও অনুসন্ধানে জানা গেছে।

এ ব্যাপারে নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘খালটি উদ্ধারে কাজ শুরু করা হয়েছিল। এ ব্যাপারে দখলকারীদের চিঠিও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য শক্তি এই খালটি উদ্ধারে কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছে।’

রজতরেখা খাল ও রজতরেখা নদীর উদ্ধারের ব্যাপারে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, ‘খাল ও নদী কারও ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এগুলো সরকারি সম্পদ, যে কোনো মূল্যে তা উদ্ধার করা হবে। খাল-নদী পুনরুদ্ধারে আমাদের দুইটি পরিকল্পনা রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথমে দখলমুক্ত করা হবে। পরবর্তীকালে নদী ও খালের স্বাভাবিক নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে খননকার্য পরিচালনা করা হবে। রজতরেখা নদী খননের বিষয়ে খুব শীঘ্রই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

দৈনিক অধিকার

Leave a Reply

You can use these HTML tags

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>

  

  

  

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.