করোনার থাবা মাটির ব্যাংক-হাতি-ঘোড়ায়

মামুনুর রশীদ খোকা: রাজধানী ঢাকা থেকে ২৫ কিলোমিটার অদূরে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়ের পাশেই মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার ষোলঘর পালপাড়া। সারা বছর কাঁদামাটির সঙ্গে সংসার এখানকার পরিবারগুলোর।

শত বছর ধরে দেশের বিভিন্ন স্থানের বৈশাখী মেলাতে দোকানদাররা এ পালপাড়ার মাটির তৈরি খেলনা ও জিনিসপত্রের পসরা বসিয়ে আসছে। তাই প্রতি বছর বৈশাখী মেলার অপেক্ষায় বসে থাকেন পালপাড়ার মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত কুমার পরিবারগুলো।

কেননা বৈশাখ এলেই তাদের নিপুণ হাতে তৈরি মাটির খেলনা, ফলফলাদি ও ব্যাংক কিনে নিতে পালপাড়ায় হুমড়ি খেয়ে পড়েন দূর-দূরান্তের পাইকাররা। আর বৈশাখেই এসব মাটির জিনিসপত্র বিক্রি করে সংসারের সারা বছরের খরচ চালানোর উপার্জন হয়ে থাকে পরিবারগুলোর। কিন্তু এ বছর করোনার থাবা পড়েছে মুন্সীগঞ্জের পালপাড়ার মাটির ব্যাংক, হাতি, ঘোড়ায়।

সরেজমিনে জেলার শ্রীনগর উপজেলার ষোলঘর পালপাড়া গিয়ে দেখা গেছে, সেখানে নেই কোলাহল। পাইকার না থাকায় পালাড়ায় তৈরি কোনো পুতুল, খেলনা আর ব্যাংকই বিক্রি হয়নি। দেশজুড়ে এবার বৈশাখী মেলা বন্ধ থাকায় মাটির তৈরি প্রায় ৫০ হাজার ব্যাংক, খেলনা, পুতুল ও ফলফলাদি অবিক্রিত থেকে গেছে।

এতে সেখানকার ঘরে ঘরে চলছে নীরব কান্না। বিষন্ন হয়ে গেছেন নারী-পুরুষ-শিশুরা।

৭০ বছর বয়সী কৃষ্ণ পাল জানান, এক সময় পালপাড়ার দুই শতাধিক পরিবার মৃৎশিল্পের সঙ্গে জড়িত থাকলেও বর্তমানে সর্বসাকূল্যে ৩৫টি পরিবার বাপ-দাদার পেশা ধরে রেখেছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বৈশাখী মেলায় এখানকার তৈরি মাটির ব্যাংকের বিশেষ চাহিদা থাকে। সারা বছর পালপাড়ায় নারী-পুরুষ-শিশুরা সচরাচর আকৃতির ব্যাংক ছাড়াও রাজহাঁস, আম, কাঁঠাল ও পেপে সাদৃশ ব্যাংক তৈরি করে থাকে।

একই সঙ্গে তাদের তৈরি পাঁচ সাইজের মাটির খেলনাও বিভিন্ন বৈশাখী মেলাকে প্রাণবন্ত করে তোলে। কিন্তু করোনা আতঙ্কে দেশের কোথাও বৈশাখী মেলা জমছে না। এতে মাটির তৈরি ব্যাংক, হাতি, ঘোড়া ও সিংহসহ বিভিন্ন খেলনা ও ফলফলাদি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা। এ বছর এসব সামগ্রীর একটিও বিক্রি হয়নি।

রানী পাল জানান, মাটির তৈরি এক হাজার পিস খেলনা তারা পাইকারদের কাছে ২ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি করে থাকেন। সবচেয়ে বড় আকারের একটি মাটির ব্যাংক ১১০ টাকা দরে পাইকারের কাছে বিক্রি করে থাকেন।

এছাড়া হাতি, ঘোড়া ও সিংহ আকৃতিক ব্যাংক যথাক্রমে ৬ টাকা, ১৭ টাকা, ৪০ টাকা ও ৮০ টাকা দরে বিক্রি করেন। এ বছর বৈশাখী মেলা বন্ধ থাকায় তাদের কাছে কোনো পাইকার আসেননি। বিক্রি হয়নি কোনোকিছু।

পালপাড়ার কুমার যাদব পাল বলেন, পূর্ব-পুরুষেরা সারা বছরই মাটির তৈরি জিনিস বিক্রি করত। সাম্প্রতিক সময়ে শুধু মাত্র বৈশাখী মেলাই তাদের তৈরি মাটির জিনিসপত্র বিক্রি করে আসছেন। এ বছর বৈশাখের কোনো মেলা নেই। ক্রেতাও নেই। কাজেই সামনের দিনগুলোতে পরিবারের সদস্যদের মুখে কীভাবে খাবার দিব তা আমাদের জানা নেই।

দেশ রুপান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.