প্রসঙ্গ জাপানে লকডাউন , জাপান প্রবাসীদের আহাজারি

রাহমান মনিঃ আমরা বাংলাদেশিরা বিশ্বের যে দেশেই থাকিনা কেন সেদেশের আইন শৃঙ্খলা, নিয়ম কানুন, শিল্প সংস্কৃতি, ম্যানার এবং সরকার কর্তৃক সিদ্ধান্ত মেনে চলাটাই বুদ্ধিমানের পরিচয়। কিন্তু আমরা ক’জনা তা মেনে চলছি, বা চলার চেষ্টা করছি।

বরং বুঝেই হউক বা না বুঝেই হউক অনেকেই আমরা কিছু কিছু ক্ষেত্রে চিন্তা চেতনায় বাংলাদেশী ভাবটা ছাড়তে পারি নাই। বিশেষ করে ধর মার কাট এর ব্যাপারে অর্থাৎ আন্দোলন বা দাবী আদায়ের ক্ষেত্রে ।

বলছিলাম অতি সম্প্রতি বিশ্ব কাঁপানো করোনা ভাইরাস ( কোভিড ১৯ ) নিয়ে জাপান সরকার গৃহীত পদক্ষেপ এ জাপান প্রবাসীদের বিভিন্ন অসন্তুষ্টি , আক্ষেপ এবং বিভিন্ন পরামর্শের কথা নিয়ে।

আর এই আক্ষেপ বা অসন্তুষ্টির প্রধান কারন হলো, জাপান সরকার কেন লকডাউন দিচ্ছে না। আর এই জন্য সরকার প্রধান হিসেবে শিনযো আবে কে প্রবাসি বাংলাদেশিদের বিভিন্ন গালমন্দও শুনতে হচ্ছে অহরহ। এই গালমন্দ প্রকাশের প্রধান মাধ্যম হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘ফেসবুক’।

এইসব গালমন্দের মধ্যে জাপানের প্রধানমন্ত্রী আবে একটা ঘোলায়ে জল খাওয়া গাধা, সঠিক সময়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছুতে না পারা বলদ, ঠাণ্ডা মাথার খুনী, কৃপণ, ইতিহাসে স্থান করে নেয়ার আকাংখ্যা ( যদিও শিনযো আবে জাপানের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ইতোমধ্যে স্থান করে নিয়েছেন ) অসভ্য সরকার প্রধান সহ আরো কতো কি !

কারন, ফেসবুক এ লিখতে কোন বাঁধার সম্মুখীন হতে হয় না। কোন এডিটরের এডিট এরও কোন ঝামেলা নেই। যা খুশী তাই লিখে দেয়া যায়। শিশুদের জন্য যেমন ঘরের দেয়াল বড় ক্যানভাস আঁকার জন্য, তেমনি ফেসবুক বড়দের জন্য বড় ক্যানভাস ইচ্ছেমত লিখার জন্য।

এখন আসি প্রবাসিদের ‘লকডাউন’ নিয়ে আহাজারি প্রসঙ্গে।

তার আগে জেনে নেয়া যাক ‘লকডাউন’ এর অর্থ কি ?

লকডাউন শব্দটি ইংরেজী সাহিত্যে পূর্ব থেকেই অস্তিত্ব অক্ষুন্ন রাখতে পারলেও করোনার বদৌলতে বাংলাদেশে নতুন আবির্ভাব হওয়ায় এর বাংলা প্রতিশব্দ বহুল প্রচলিত না থাকলেও হতে পারে “অবরুদ্বতা”বা তালাবদ্ব করে দেয়া বা সরল কথায় প্রিজনে রাখা।

শব্দটির ব্যাখ্যায় ক্যামব্রিজ ডিকশনারিতে বলা হয়েছে, কোনো জরুরি পরিস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষকে কোনো জায়গা থেকে বের হতে না দেয়া কিংবা ওই জায়গায় প্রবেশ করতে বাধা ( মহামারী নিয়ে হাদিস কোরআনেও একই কথা বলা আছে ) দেয়াই হলো ‘লকডাউন।’ এছাড়া অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারিতে বলা হয়েছে, জরুরি সুরক্ষার প্রয়োজনে কোনো নিদিষ্ট এলাকায় জনসাধারণের প্রবেশ ও প্রস্থান নিয়ন্ত্রণ করাই ‘লকডাউন।’সোজা বাংলায় বলা যেতে পারে‘জরুরি প্রয়োজনে কোনো এলাকায় প্রবেশ ও প্রস্থানের নিষেধাজ্ঞাই অবরুদ্ধতা।’

তবে, বাংলাদেশে যেভাবে লকডাউন চাপিয়ে দেয়া হয়েছে বা হচ্ছে প্রকৃত লকডাউন নয়। সরকার কর্তৃক লকডাউন করতে হলে তার আগে জনগণের দৈনন্দিন জীবনের সার্বিক দায়িত্ব সরকারকে বহন করতে হয়। বিশেষ করে অন্নের যোগান।

প্রশ্ন জাগা টা স্বাভাবিক বাংলাদেশ সরকার কি সেই কাজটি করতে পেরেছে ? অপ্রিয় সত্য হচ্ছে ‘না’। অন্নের ব্যবস্থা না করেই লকডাউন দিয়ে জোর করে ঘরে রাখার চেষ্টা করছে বাংলাদেশ সরকার। এতে যা হবার তাই হচ্ছে। পেটে খেলে না পিঠে স’বে ।

জাপান সরকার কি তা করতে পারবে ? সরকার ইচ্ছে করলেই কি জনগনের মৌলিক অধিকার হরণ করতে পারবে ? পারে না । অনুরোধ করতে পারে । আবে করেছেন ও তা।

জাপানের জনগনের অধিকার সম্পর্কে নারিতা বিমান বন্দরের রানওয়ে এলাকাতে ব্যাক্তি মালিকানায় বাড়িটির অস্তিত্ব কি যথেষ্ট নয় ?

বাস্তবতার প্রেক্ষিতে কি জাপানে বিশেষ করে টোকিও ( যেখানে প্রায় দুই কোটি লোকের বসবাস ) তে লকডাউন দেয়া সম্ভব ? আর যদি , একান্তই লকডাউন দেয়া প্রয়োজন হয় তাহলে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আবের দায়দায়িত্ব কি কম ? আবের গাফিলতিতে যদি একটি প্রাণও ঝরে পড়ে তাহলে এর দায় যে সরকার প্রধান হিসেবে তাঁর কাঁধে পরবে তা কি আবে বুঝে না ! আমাদের বুঝিয়ে দিতে হবে ?

আর লকডাউন সরকারকে দিতে হবে কেন ? নিজে নিজে নিতে অসুবিধা কোথায় ? সরকারের চাপিয়ে দেয়ার আশায় বসে না থেকে নিজে নিজেও তো নেয়া যায়। জীবনটা যেহেতু নিজের তাই এর রক্ষা করার প্রথম দায়িত্ব নিজের উপরই বর্তায়।

জীবনের প্রতি যদি এতোই মায়া লাগে তাহলে ছুটি নিয়ে ঘরে বসে থাকলেই তো লেটা চুকে যায়। এতে তো কোন বাঁধা নেই। আহাজারি করতে হচ্ছে কেন ? আপনি নিজে ছুটি নিয়ে ঘরে থাকছেন না কেন ? করোনা জনিত কারনে যদি প্রতিষ্ঠান আপনার ছুটি মঞ্জুর না করে সেক্ষেত্রে আপনি প্রতিবাদী হতে পারেন । এমন কি আইনের আশ্রয় নিতে পারেন ।

এই প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ টানতে চাই। আমি যেখানে বসবাস করি সেই একই বিল্ডিং এ ২য় তলায় বসবাসকারী জহিরুল হক মিলন ভাই স্ত্রী এবং ২ টি সন্তান নিয়ে বসবাস করেন। ফুটফুটে দুটি সন্তানের স্বাস্থ্য রক্ষায় তিনি সদা সচেতন। করোনা ভাইরাস এর প্রাদুর্ভাব শুরুতেই তিনি ২ট সন্তান সহ নিজ স্ত্রীকে ঘরবন্দী বা লকডাউন করে রেখেছেন। আর্থিক ক্ষতি বা সরকারের আর্থিক সহযোগিতা প্রাপ্তির আশায় কিঙ্গা কারোর হুকুমের অপেক্ষায় বসে থাকেন নি। এর আগেও তিনি বিভিন্ন প্রাদুর্ভাবে একইভাবে নিজ পরিবারকে সুরক্ষা দিয়ে চলেছেন। লকডাউন নিয়ে কোন আহাজারিও নেই।

জাপান সরকার লকডাউন দিলে আপনার লাভ কি ? বিনা পরিশ্রমে ঘরে বসে সুযোগ ভোগ করতে পারবেন ? জাপানের সিস্টেম কিন্তু তা বলে না ।

এদিকে কিছু সংখ্যক রয়েছেন তারা আক্রান্ত এবং মৃতের সংখ্যা গুনে চলেছেন। বিকেলে ২০০ হলে রাতে যে তা ৩০০ পৌঁছবে সেই আশায় মিডিয়ার উপর চোখ রেখে নিজেদের স্থুলমনের পরিচয় দিচ্ছেন। মানুষ মরছেন আর তারা লাশ গুনছেন , ফেসবুক এ আপডেট দিচ্ছেন ভাবতেই কষ্ট লাগে। পৈশাচিক মনমানুষিকতা এদের। কৃষকের গরু মরে আর ঋষিরা চামড়া গুনার মতো।

কেহ কেহ বিভিন্ন বিভিন্ন উপদেশও দিয়ে যাচ্ছেন। সঠিক বাংলা এবং তথ্য জানা না থাকলেও লাইভ-এ এসে ভুল্ভাল্ভাবে বিভিন্ন নসিয়ত করে যাচ্ছেন নির্দ্বিধায়। এ এক বিতিকিচ্ছিরি কাণ্ড। আল্লাহ সবাইকে হেদায়েত দান করুক।

জাপান সরকার এদেশের প্রতিটি নাগরিককে ১ লাখ ইয়েন করে প্রদান করার ঘোষণাতেও তাদের উষ্মা প্রকাশের শেষ নেই।

কেহ কেহ বলে থাকেন সরকার আমাদের টাকা ( ট্যাক্স ) আমাদের দিবে গড়িমসি কেন ? ১ লাখ ইয়েন এদের কাছে কিছুই না। সরকার কে এইজন্য যে কি পরিমান অর্থ বরাদ্দ দিতে হবে তা গুনে দেখেছেন কি ? করোনা বাবদ জাপান সরকারের আর্থিক বরাদ্দ ১৪ লাখ কোটি ইয়েন। যা, বাংলাদেশের এক বছরের মোট বাজেটের কয়েক গুন।

আমার একটি পোষ্ট –এ একজন মন্তব্য করে বসলেন ‘জাপান সরকার আমাদের ট্যাক্স এ চলে’। কথাটি সত্যি , যুক্তি আছে। তার কাছে বিনয়ের সাথে জানতে চেয়েছিলেম , কোন দেশের সরকার জনগনের ট্যাক্স বিহীন চলে ? সে দেশে যাওয়া উচিত ছিল আপনার। এছাড়াও তার কাছে আরও জানতে চেয়েছিলাম, আমেরিকা কানাডা বা অস্ট্রেলিয়ার মতো ডিভি লটারি , ওপি ওয়ান কিংবা সেকেন্ড হোম এর অফার দিয়ে জাপান এনেছিল আপনাকে ?

কোনটারই উত্তর দিতে পারেননি তিনি। তখন শুধু বলেছিলাম “শৈবাল দিঘীরে বলে উচ্চ করে শির , লিখে রেখো একফোঁটা দিলেম শিশির”। জানিনা এর অর্থ বুঝেছিলেন কিনা।

মনে পড়ে, ২০১১ সালে জাপানে মহা বিপর্যয়ের পর জাপান ব্যাপী এসিড বৃষ্টির সম্ভাবনা নিয়ে জাপান প্রবাসীদের আশংকার কথা। তাদের তখন পরামর্শ দিয়ে বলেছিলাম , হাকু এন এর দোকান থেকে বালতি কিনে জমাকৃত এসিড দিয়ে চৌবাচ্চা ভরে রাখতে। পরবর্তীতে সুবিধাজনক সময়ে বাজারে বিক্রি করে ব্যাংক ব্যাল্যান্স বাড়িয়ে নিতে।

বাকীটা ইতিহাস।

জাপান প্রবাসী মাত্রই তা জানেন।

rahmanmoni@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.