কতটা প্রস্তুত মুন্সীগঞ্জের আইসোলেশন সেন্টার?

রিয়াদ হোসাইন: করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব সারাদেশের ন্যায় মুন্সীগঞ্জেও দিন দিন বৃদ্ধি পেয়ে চলছে। এপর্যন্ত জেলায় ৪৩ জন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছেন, মৃত্যুর সংখ্যা ৫ জন এবং করোনা পরীক্ষার ফলাফলের অপেক্ষায় রয়েছেন ১২০জন। তবে, করোনা চিকিৎসার প্রধান হাতিয়ার ভেন্টিলেশন ছাড়াই জোড়াতালি দিয়ে তৈরি করা হয়েছে ৫০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার । এছাড়াও জেলায় নেই কোনো আইসিইউ ও সিসিইউ।

এদিকে, সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, বাংলাদেশ কোভিড-১৯ মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় দেশের অন্যান্য জেলাগুলোর মতো প্রস্তুত রয়েছে মুন্সীগঞ্জ জেলা। ইতোমধ্যে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের নতুন ভবনে প্রস্তুত করা হয়েছে ৫০ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার । পাশাপাশি পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচটি করে আইসোলেশন বেড রাখা হয়েছে, মোট ২৫ শয্যা। এছাড়া সদ্য সরকারকে হস্তান্তর করা লৌহজংয়ের সামুরবাড়িতে ইউনাইটেড হাসপাতালের ১৪ শয্যার আইসোলেশন সেন্টার তৈরি করা হয়েছে। এরমধ্যে সামুরবাড়িতে ইউনাইটেড হাসপাতালের দেওয়া আইসোলেশন সেন্টারে দুইটি ভেন্টিলেশন থাকলেও তা ব্যবহার করার মতো প্রশিক্ষিত চিকিৎসক নেই। এসব আইসোলেশন সেন্টার আসলে কতটা আন্তর্জাতিক মানের হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক একাধিক চিকিৎসক জানান, আইসোলেশন ওয়ার্ডের নামে যা করা হচ্ছে সেগুলোকে আদর্শ বলা ঠিক হবে না। আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড মানা হয়নি। আইসোলেশনের জন্য ঠিক যেরকম রুম হওয়া দরকার, সেরকম রুম হাসপাতালেই নেই। পৃথক কক্ষ, পৃথক ওয়াশরুম, ভেন্টিলেশন থাকার কথা, কিন্তু সেগুলো নেই। কেবল পাশাপাশি কয়েকটি বেড রাখা হয়েছে, এক মিটার দূরত্বে।

এ বিষয়ে দৈনিক অধিকারের মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রতিনিধির সাথে কথা বলেছেন মুন্সীগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আবুল কালাম আজাদ।

দৈনিক অধিকার- কি ধরনের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে আইসোলেশন সেন্টারে ?
সিভিল সার্জন- মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালের নতুন ভবনে ৫০ শয্যা আইসোলেশন সেন্টারে জেনারেল হাসপাতালের ২০ জন চিকিৎসকের মধ্যে রোস্টার অনুযায়ী প্রতি শিফটে একজন করে দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়া প্রতি শিফটে দুইজন নার্স ও একজন আয়া সেবা প্রদান করবেন। শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দিলে , তার জন্য ৫০টি অক্সিজেন সিলিন্ডার ও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা অবনতি হলে ঢাকায় পাঠানোর জন্য সবসময় একটি অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে। অন্যদিকে পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচটি করে আইসোলেশন বেড রাখা হয়েছে। এছাড়া লৌহজংয়ের সামুরবাড়িতে ইউনাইটেড হাসপাতালের ১৪ বেডের হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

দৈনিক অধিকার- এসব কি আন্তর্জাতিক মানের আদর্শ আইসোলেশন সেন্টার ?
সিভিল সার্জন – না এসব আন্তর্জাতিক মানের আইসোলেশন সেন্টার নয়। শুধু মুন্সীগঞ্জে নয় বাংলাদেশের জেলা পর্যায় কোথায়ও আন্তর্জাতিক মানের আইসোলেশন সেন্টার নেই । তবে, আইসিইউ ও ভেন্টিলেশন ছাড়া সবকিছুর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এরমধ্যে লৌহজংয়ের সামুরবাড়িতে অবস্থিত আইসোলেশন সেন্টারে দুইটি ভেন্টিলেশন রয়েছে কিন্তু এগুলো ব্যবহার করার জন্য প্রশিক্ষিত চিকিৎসক এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।

মুন্সিগঞ্জ করোনা হাসপাতাল

দৈনিক অধিকার- একটি রোগীর জন্য ব্যবহৃত সরঞ্জাম পুনরায় ব্যবহার করা হবে কি?
সিভিল সার্জন- করোনা ইউনিটে ব্যবহৃত সরঞ্জাম আমাদের প্রটোকল অনুযায়ী জীবাণুমুক্ত করা হবে । শুধুমাত্র করোনায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার সেবার জন্য এসব সরঞ্জাম ব্যবহার করা হবে। পুনরায় ব্যবহার করতে চাইলে সেগুলো পুরোপুরিভাবে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।

দৈনিক অধিকার- চিকিৎসক, নার্স ও আয়াদের নিরাপত্তার জন্য কি ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে ?
সিভিল সার্জন- মুন্সীগঞ্জ ডায়াবেটিক হাসপাতালের নতুন একটি ভবন খালি পড়ে আছে সেখানে করোনা ইউনিটে কর্মরতদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তারা সাতদিন সেবা প্রদান করবে । পরবর্তীতে ১৪দিন কোয়ারেন্টিনে থাকবেন।

দৈনিক অধিকার- চিকিৎসকরা কোয়ারেন্টিনে থাকলে জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হবে কি ?
সিভিল সার্জন- বহির্বিভাগ ও অটির কিছু সংখ্যক চিকিৎসক করোনা ইউনিটের আওতার বাহিরে রয়েছে। এছাড়া কয়েকটি বিভাগের চিকিৎসক ছাড়া করোনা ইউনিটের জন্য আলাদা ভাবে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হবে না বলে আশা করছি।

দৈনিক অধিকার- পিপিই এর মান কি রকম ও পর্যাপ্ত রয়েছে কি ?
সিভিল সার্জন – আমাদের কাছে আসা পিপিই গুলো মানসম্মত। আইসোলেশন সেন্টারে কর্মরতরা পিপিই (পারসোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট) পরবেন। পিপিই-এর ধরন কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, মাথার ক্যাপ, চোখে গগলস, হাতে গ্লাভস, মাস্ক, শরীরে কাভার-অল, ওয়াটার প্রুফ প্যান্ট, পায়ে সু-কাভার এই পুরো পোশাককে বলা হয় পিপিই। আপাতত এন৯৫ মাস্ক ছাড়া আমাদের সবকিছু রয়েছে। এন৯৫ মাস্কের বিকল্প হিসেবে ডাবল সার্জিকাল মাস্ক ও স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে দেওয়া একটি মাস্ক ব্যবহার করার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আমাদের পর্যাপ্ত পিপিই রয়েছে, প্রায় আড়াইহাজার পিপিই পেয়েছে মুন্সীগঞ্জ জেনারেল হাসপাতাল।

দৈনিক অধিকার- করোনায় আক্রান্ত রোগীদের ঢাকায় পাঠাতে নিষেধ করা হয়েছে বলে জানা যায়, এ বিষয়ে কি বলবেন?
সিভিল সার্জন – প্রথমে আমরা করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হওয়ার সাথে সাথেই ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছি। এখন প্রতিদিন এমনভাবে রোগী বাড়ছে ঢাকায়ও রোগী পাঠানো যাচ্ছে না। ভিডিও কনফারেন্সে আমাদের বলে দিয়েছে কুয়েত মৈত্রী ও কুর্মিটোলায় রোগী ভরে গেছে। তিনি আরও বলেন, রোগীকে বাড়িতেও রাখা যায় যদি সমাজ এবং মানুষ সবাই সচেতন হয়। যে রোগীদের সিমটম নাই, ধরা পরলেও সে বাড়িতে থাকতে পারবে এবং বাড়িতে রোগী ধরা পরলে তখন অন্যরা এমনিতেই সতর্ক হয়ে যায়, তার কাছে যাবে না।

দৈনিক অধিকার- করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে করণীয় কি ?
সিভিল সার্জন- করোনা ভাইরাস একটি জীবাণু যা মানুষের শরীরে জ্বর, কাশি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে শ্বাসকষ্ট (নিউমোনিয়া) তৈরি করে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রে এই রোগ নিজে নিজেই ভালো হয়ে যায়। শুধুমাত্র কিছু কিছু ক্ষেত্রে জটিলতা দেখা দেয় এবং হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে যারা বয়স্ক ও শারীরিকভাবে দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে এই রোগের প্রভাব মারাত্মক হতে দেখা যায়। এই রোগটি অতিরিক্ত সংক্রামক, সুতরাং খুব দ্রুত এটি বিস্তার লাভ করে। তবে যথাযথ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিলে, এর বিস্তার অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ,কাশির শিষ্টাচার ও জনসমাগম এড়িয়ে চললে এই রোগ থেকে বাঁচা সম্ভব। সাবান দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া অথবা হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করে হাত পরিষ্কার করা । অপরিষ্কার হাত দিয়ে চোখ, নাক ও মুখ স্পর্শ না করাসহ ডব্লিএইচ এর নির্দেশনা অনুসরণ করলে সংক্রমণ এড়ানো সম্ভব।

দৈনিক অধিকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.