এ এক অন্য বৈশাখ, নেই হালখাতা

আরেফি রিয়াদ: এই বছরের মতো এত বিষণ্ণ নববর্ষ বোধহয় বাঙালি আগে কখনও কাটায়নি। দেশ অঘোষিত লকডাউনের মধ্যেই পড়েছে বাঙালির নববর্ষ। হাত-পা যে বাঁধা কিছুই যে করার নেই। তাই বিষণ্ণ মনেই বাঙালিকে কাটাতে হয়েছে নববর্ষ। বাঙালি নববর্ষ পাশাপাশি বৈশাখ মাস কাটছে হালখাতা ছাড়াই। তাতেই মন ভার বাঙালির। এ যেনো এক অন্য বৈশাখ । মনের হাল হদিশ দেবে এই হালখাতা, তারও নেই কোনো খোঁজ। তার খোঁজ নিতে খুব ইচ্ছে করছে। ইচ্ছে করছে কেউ খোঁজ নিক। কিন্তু প্রশ্ন জাগে এমনই সময়েই কেউ খোঁজ রাখল না তো । করোনার জেরে এই অঘোষিত লকডাউনে কে তার খোঁজ রাখবে ? তাই খোঁজ নেয়নি কেউ, ১৩ দিন কেঁটে গেলো বাঙালীর ঐতিহ্য, সেই হালখাতার দেখা মেলেনি কোথায়ও। কিন্তু হালখাতা না হলেও হিসাব-নিকাশ ঠিকই কষে চলছে ব্যবসায়ীরা ।

সেই বিখ্যাত গানটা মনে পড়ে ? জীবন খাতার প্রতি পাতায়, যতই লেখ হিসাব নিকাশ, কিছুই রবেনা। কে বলে কিছুই রবে না? ব্যবসায়ীরা বলছেন অবশ্যই থাকবে। সেই হিসাবই ১৪২৭ এর হালখাতায় লিখে রাখলেন। যা পরের বছরের জন্য রাখলেন তুলে। যা এই বছরে হলো না , তা সব হিসাব নিকাশ মিটিয়ে নেবেন সামনের বছরে। তাই তো লিখে রাখা নতুন বছরের প্রত্যেকটি ইচ্ছা, আশা, আকাঙ্ক্ষা। তারা বলছেন, আতঙ্কে অনেকে এখনই মনের থেকে শেষ হয়ে যাচ্ছেন। তারা হার মানতে রাজি নন। তাই করোনার এই কঠিন সময়েও আগামীর স্বপ্ন দেখেন। সুন্দর দিনের আজও তাদের ভাবনায়। নেই কোনও খারাপ ভাবনা। তবে, এই বিপর্যয়ে মাথায় হাত পড়েছে মুন্সীগঞ্জের ছোট-বড় দোকানদারদের। এমন কিছু যে হতে পারে তা আঁচ করতে পারেননি ব্যবসায়ীরা।

মুন্সীগঞ্জের ব্যবসায়ীরা বলছেন, এসময় পুরাণ বছরের সব হিসাব-নিকাশ শেষ করা হয়। ব্যবসার সকল লেনদেন ও পাওনা টাকা ক্রেতারা মিষ্টিমুখে পরিশোধ করেন । এতে ব্যবসায়ীদের মুখের হাসিও চওড়া হয়। কিন্তু এবার করোনা ঠেকাতে লকডাউনে চাপা পড়েছে সব। লাল রঙা সেই খাতার চাহিদা কমে গেছে। উৎসবের চেয়ে দোকানের কর্মচারীদের বেতন দেয়ার চিন্তায় অস্থির ব্যবসায়ীরা।

দিঘিরপাড় বাজারের ব্যবসায়ী রহমান শেখ জানান, এই সময়টা আমাদের ব্যবসার যেমন অন্যতম সময়, তেমনি হিসাব-নিকাশ, পাওনা আদায়েরও বিশেষ সময়। এ বছর যে অবস্থা, তাতে ব্যবসায় বড় ধরনের লোকসান গুনতে হবে।

এই বাজারের আরেক ব্যবসায়ী উজ্জ্বল বলেন, হালখাতা দূরে থাক, দেশের যে পরিস্থিতি, তাতে ঘর থেকে কবে বের হওয়া যাবে সেটাই তো বুঝতে পারছি না। দীর্ঘদিন যদি ব্যবসা বন্ধ রাখতে হয়, তাহলে তো ঋণগ্রস্ত হয়ে যেতে হবে।

মা জুয়েলারির মালিক সিমান্ত দাস বলেন, সারা বছর ধরে এ মাসটির জন্য আগ্রহ ভরে অপেক্ষা করেন তারা। কাস্টমার তাদের লক্ষ্মী। সারা বছর যারা বকেয়ায় স্বর্ণালঙ্কার কেনেন, তারা বৈশাখ মাসে প্রায় সব টাকা পরিশোধ করেন।

কাপড় ব্যবসায়ী জয়নাল মিঝি জানান, মনে হচ্ছে শনি আমাদের চতুর্দিক থেকে ঘিরে রেখেছে। বছর শুরু হচ্ছে, ব্যবসার যাত্রাটাই করতে পারছি না। আমরা যারা ব্যবসায়ী বিশেষ করে দীর্ঘকাল যাবত ব্যবসার সাথে জড়িত তাদের জন্য এটা কত দুশ্চিন্তার, কত উৎকণ্ঠার তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারছি না।

মুন্সীগঞ্জ বড় বাজার, দিঘীরপাড় বাজার , সিপাহীপাড়া , বাংলাবাজার, মিরকাদিম, শ্রীনগর, সিরাজদিখান, টংগিবাড়ীসহ জেলাজুড়ে বৈশাখ মাস হালখাতা উৎসবে মাতিয়ে রাখলেও এবছর যেনো সবকিছু স্তব্ধ । ব্যবসায়িক লাভ-ক্ষতির হিসাব তো আছেই, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন সবার মনে করোনাভাইরাস থেকে মুক্তি মিলবে কবে?

দৈনিক অধিকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.