বিশেষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়ে এগিয়ে চলছে পদ্মা সেতুর কাজ

মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে বাংলাদেশসহ গোটা বিশ্ব প্রায় অচল। অথচ কোটি মানুষের কাঙ্ক্ষিত স্বপ্নের পদ্মা সেতুর কাজের অগ্রগতি অনেকটাই আশা জাগানিয়া। এই অচলাবস্থার মধ্যেই চলছে সেতুটির কাজ। বিশেষ নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করায় করোনাভাইরাস পরিস্থিতির মধ্যেও প্রত্যাশিত গতিতে এগিয়ে চলেছে। মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে পদ্মা সেতুর পুরো প্রকল্পটি অবরুদ্ধ করে রেখে কাজ চালানো হচ্ছে। এছাড়া পদ্মা সেতুর প্রকল্পে কর্মরত কেউ যদি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয় তাদের জন্য চালু করা হয়েছে ’কোভিড-১৯ আইসোলেশন সেন্টার’। এতে সেতু প্রকল্পের আক্রান্ত ব্যক্তিকে তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে।

গত বুধবার মাওয়া প্রান্তের দোগাছি এলাকার সার্ভিস এরিয়া-১ ও জাজিরা প্রান্তের সার্ভিস এরিয়া-২ এ এই আইসোলেশন সেন্টার চালু করা হয়। পদ্মা সেতুর দু’প্রান্তের দুই সার্ভিস এরিয়ায় ১২ শয্যা করে ২৪ শয্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে । ইতোমধ্যে দুই আইসোলেশন সেন্টারে প্রতিটিতে দুইজন চিকিৎসক, দুইজন নার্সসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়েছে । এছাড়া সকল চিকিৎসা সামগ্রীও বসানো হয়েছে। পাশাপাশি জরুরি প্রয়োজনে রোগীকে লাইফ সার্পোট দিয়ে ঢাকায় পাঠানোর জন্য রাখা হয়েছে একটি অ্যাম্বুলেন্সও। তবে আইসিইউ না থাকলেও উন্নতমানের চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সেতু কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, করোনাভাইরাস নিয়ে উদ্বেগের কারণে সেতুর কাজে বিশেষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। যেসব এলাকায় পদ্মা সেতু-সংশ্লিষ্ট কাজ চলছে, তার পুরোটাই ঘিরে রাখা হয়েছে। ওই এলাকার বাইরে যেতে পারেন না কাজে নিযুক্ত কেউই। জরুরি প্রয়োজনে কাউকে বের হতে হলে, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা করতে হয়।

এ বিষয়ে পদ্মা সেতু স্বাস্থ্য বিষয়ক পরামর্শক মাহমুদ হোসেন ফারুকী জানান, ওই সেন্টার দুইটির চালু করার আগে ওখানে কর্মরত চিকিৎসক ও নার্সসহ সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ঢাকায় আইসোলেশনে রেখে ’কোভিড-১৯’ পরীক্ষা করা হয়েছে। তাদের পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভ আসার পর সরাসরি পদ্মা সেতুর নিজস্ব গাড়িতে করে নিয়ে আসা হয়। এতে করে সংক্রমিত হবার ঝুঁকি অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে।

পদ্মা সেতুর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রজ্জব আলী জানান, পদ্মা সেতু প্রকল্পের দু’প্রান্তের মুন্সীগঞ্জ ও শরীয়তপুর জেলার সিভিল সার্জনদের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ বজায় রাখা হয়েছে পাশাপাশি তাদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। তারা যদি মনে করেন দুইটি সেন্টারে আইসিইউ শয্যা ও ভেন্টিলেশন প্রয়োজন তাহলে তা স্থাপনের বিষয়ে আগ্রহ রয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষের। এ পর্যন্ত কাউকে আইসোলেশনে আসতে হয়নি। যদি কোন কর্মীর নূন্যতম উপসর্গ দেখা দিলেই এই আইসোলেশনে সেন্টারে নিয়ে আসা হবে। সোয়াব পরীক্ষা করার পর যদি কারো শরীরে করোনা সনাক্ত হয় তাহলে পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

এদিকে, পদ্মা সেতুর পুনর্বাসন প্রকল্পের মুন্সীগঞ্জ প্রান্তে দু’টি ও জাজিরা প্রান্তে তিনটি, মোট দু’প্রান্তের পাঁচটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের সেবা আগের মতই স্বাভাবিক রয়েছে। স্বাস্থ্য কেন্দ্রের এমবিবিএস চিকিৎসক ও অন্যান্য স্বাস্থ্য কর্মীরা স্বাস্থ্য বিধি মেনে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) পরিধান করে নিয়মিত পুনর্বাসন প্রকল্পের বাসিন্দাদের পাশাপাশি বহিরাগত লোকজনদের সেবা দিচ্ছে তারা। এছাড়া স্বাস্থ্য কেন্দ্রে বিনামূল্যে দেওয়া ওষুধের বরাদ্দ পাঁচ হাজার টাকা বৃদ্ধি করে এখন প্রতি মাসে ১৫ হাজার টাকার জরুরী ওষুধ দেওয়া হচ্ছে বলে জানাযায়।

অন্যদিকে, মে মাসের প্রথম সপ্তাহে পদ্মা সেতুর ১৯ ও ২০ নম্বর খুঁটির ওপর বসছে ২৯তম স্প্যান ’৪এ’। তবে, গত ৩০ এপ্রিল স্প্যানটি বসানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও স্প্যানটির সর্বশেষ রঙের কাজ অসমাপ্ত থাকায় শিডিউল পরিবর্তন হয়েছে। প্রকৌশলী সূত্রে জানাযায়, বর্তমানে স্প্যানটির চূড়ান্ত রঙের কাজ সমাপ্ত হয়েছে। রঙের কাজ শেষ করার পর এখন দেখা হচ্ছে কোথায়ও কোনো সমস্যা রয়েছে কিনা। বাকি কাজ শেষ করতে সপ্তাহ খানেক সময় লাগবে। অতএব প্রাথমিকভাবে পরিকল্পনা রয়েছে আগামী মাসে প্রথম সপ্তাহের যেকোনো দিন স্প্যানটি খুঁটিতে উঠানো হবে।

এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান মো. আব্দুল কাদের জানান, চীন থেকে খ- খ- আকারে স্প্যানগুলো আসে । পরে ওয়েল্ডিংয়ের মাধ্যমে ফিটিং করা হয়। মেশিনের সাহায্যে খসামাষা ও পরিষ্কার করা হয় । এরপর মৌমনের মাধ্যমে পেন্টিং কাজ করা হয়। এসব কাজ প্রায় দু’শ শ্রমিক করেন। তবে, ধান কাঁটা ও করোনার কারণে এখন মাত্র ১২০জন শ্রমিক এই কাজগুলো করছেন। তাই এ সেক্টরের কাজে কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।

উল্লেখ্য, গত ১১ এপ্রিল পদ্মা সেতু জাজিরা প্রান্তের ২০ ও ২১ নম্বর খুঁটির ওপর বসানো হয় ২৮ তম স্প্যান। এর ফলে ৪ হাজার ২০০ মিটার দৃশ্যমান হয়েছে পদ্মা সেতু। স্প্যান বসানোর পাশাপাশি রোড স্ল্যাব ও রেল স্ল্যাব বসানোর কাজও চলছে। সেতুর জন্য বসবে আর মাত্র বাকি ১৩টি স্প্যান। এর মধ্যে বাংলাদেশে আছে ১১টি। দুটি স্প্যান এখনো চীনে রয়েছে। করোনাভাইরাসের প্রভাব কেটে গেলে ওই দুটি স্প্যান বাংলাদেশে আনা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া গত ৩১ মার্চ পদ্মা সেতুর ২৬ নম্বর খুঁটির কংক্রিটের ঢালাই কাজ সম্পন্ন হয়। এর মাধ্যমে শেষ হয় পদ্মা সেতুর পুরো ৪২টি খুঁটির কাজ। এ ছাড়া উভয় প্রান্তে থাকা ৯১টি ভায়াডাক্টের (খিলান) কাজও শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছেন পদ্মা সেতুর এক প্রকৌশলী।

পদ্মা সেতু ঢাকা বিভাগের দুই জেলা মুন্সীগঞ্জ ও মাদারীপুরকে সংযুক্ত করেছে। এই সেতু চালু হলে দেশের দক্ষিণবঙ্গের সঙ্গে রাজধানী ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী উন্নতি হবে।

দৈনিক অধিকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.