আজ বাবার জন্মদিন – মৌলি আজাদ

২০০৪ সালের ১২ আগস্ট আমার বাবা প্রথাবিরোধী লেখক ও অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ চলে গেছেন আমাদের ছেড়ে। পেরিয়ে গেছে একে একে ১৭টি বছর। বেঁচে ছিলেন মাত্র ৫৭ বছর। ২৮ এপ্রিল তাঁর নানাবাড়ি কামারগাঁয়ে তাঁর জন্ম। আজ সেই ২৮ এপ্রিল। বাবার জন্মদিনে বিভিন্ন পত্রিকা-টিভি থেকে আমাদের কী অনুভূতি বা আমরা আজ তাঁকে নিয়ে কী করছি, সে বিষয়ে জানতে চায়। আমার খুব অসহায় লাগে তখন। যে মানুষটিই আজ আমাদের মাঝে নেই, তাঁর জন্মদিন পালনই কীভাবে করব আর এসব লোকদেখানো আনুষ্ঠানিকতারই-বা প্রয়োজন কী?

অনেকে বলবেন, কিন্তু তিনি তো আর দশজন সাধারণ মানুষ ছিলেন না। তিনি তো লেখক হুমায়ুন আজাদ। তা বটে। তাঁকে নিয়ে জন্মদিনে বিভিন্ন পত্রিকা, আবৃত্তি সংগঠন নানা আয়োজন করে থাকে। তিনি তো অবশ্য এভাবেই মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকতে চেয়েছেন। কিন্তু মেয়ে হিসেবে তাঁর মৃত্যুর পর থেকে ‘আজ তাঁর জন্মদিন’ বলতে আমার কেন যেন বুকে বাধে। আমি যে তাঁকে দেখতে পাই না। তাঁর কথা শুনতে পাই না। তাহলে কী হবে একটি কেক কেটে জন্মদিন পালন করে? তাই ২৮ এপ্রিল আমার কাছে ক্যালেন্ডারের স্রেফ একটি সংখ্যা কেবল। তাঁকে মনে করতে আমার কোনো দিন লাগে না। প্রতিটি মুহূর্তে মনে পড়ে তাঁর সঙ্গে কাটানো সময়ের কথা। তাঁর জীবনযাপন ভেসে ওঠে আমার চোখের সামনে।

বই, পড়াশোনা আর লেখালেখি ছিল যেন বাবার দ্বিতীয় জীবন। খুব বেশি মানুষের সঙ্গ তাঁর প্রিয় ছিল না। গুটিকয় মানুষের সঙ্গে চলতে পছন্দ করতেন। কবিতায় লিখে গেছেন, ‘মানুষের সঙ্গ ছাড়া আর সব ভালো লাগে; আমের শাখায় কাল কাক, বারান্দায় ছোট চড়ুই, শালিখের ঝাঁক, আফ্রিকার অদ্ভুত গন্ডার, নেকড়ে, হায়েনা, রাস্তার কোনায় মলপরিতৃপ্ত নোংরা কুকুর, বহু দূরে ডাহুকের ডাক সুখী করে, এসব সুখ আছে বলে আজো বেঁচে আছি, এবং এখনো বাঁচতে ইচ্ছে করে।’

সত্যি তা-ই। তাঁকে আমি এমনটাই দেখেছি। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে নিজে চা–মুড়ি খেতেন। আর কিছু মুড়ি জানালার কার্নিশে ছড়িয়ে দিতেন কাকদের জন্যে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাঁর লেখায় মুগ্ধ পাঠকদের সঙ্গে করতেন ফোনালাপ (বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ করতেন। কানে আসত)। পত্রিকার সাংবাদিকেরা বাসায় আসতেন যেকোনো সময়, হয়তো ইন্টারভিউ, নয়তো কলাম লেখার অনুরোধ জানিয়ে। সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে খুব মজা পেতেন। জিনস টিশার্ট পরে তাদের সঙ্গে আলাপ করতে করতে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতেন। এরপর কলাভবনের ক্লাসে অথবা লেকচার থিয়েটারে। রিকশায় যাতায়াত করতে পছন্দ করতেন। মাঝেমধ্যে সাইকেলও চালাতেন। একবার সাইকেল চালাতে গিয়ে ছোটখাটো দুর্ঘটনার শিকার হন। ড্রাইভার তো আর তাঁকে চিনতে পারেনি। ড্রাইভার নাকি তাঁকে বলেছিল, ‘আর কত ছার (স্যার)! এবার দুই চাকা বাদ দিয়্যা একখান চার চাকার বাহন কিইন্যা নেন।’ বাবা নাকি বলেছিলেন, ‘হুঁ, সেটাও বাসায় একখান আছে।’ ড্রাইভার হাঁ করে তাঁর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। বাবা বাসায় এসে (পায়ে সামান্য চোট নিয়ে) হাসতে হাসতে আমাদের বললেন।

আমি তাঁর হাতে বেশ কয়েকটা বাসায় আসা বড়বড় পার্টির নেমন্তন্ন কার্ড ধরিয়ে দিলাম। তিনি কার্ড দেখে হাসলেন। বললেন, ‘এসবে আমি যাব না। তুই রেখে দে।’ আমি মনে মনে বলতাম, ‘কী অদ্ভুত!’ এ রকমই ছিলেন বাবা। নিজের স্টাডিরুমে প্রচুর ধূমপান করতেন এবং মাঝেমধ্যে ভরাট গলায় নিজের কবিতা আবৃত্তি করতেন। সুযোগ পেলেই গাড়ি নিয়ে চলে যেতেন রাড়িখাল গ্রামে। কোথাও যাওয়া মানেই যেন তাঁর কাছে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাড়িখাল আর বইমেলা। ২৮ এপ্রিল আসার কিছুদিন আগে থেকে বলতাম, ‘সামনে তো তোমার জন্মদিন। কোনো আয়োজন করবে ভাবছ?’ তিনি হাসতেন। মুখ দেখে বুঝতাম এসবে আগ্রহ নেই, তবে ‘চ্যানেল আই’ তাঁর ৫০ বছরের জন্মদিনে একটি ডকুমেন্টারি তৈরি করে, যা নিয়ে তাঁর মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ দেখেছিলাম। সেই ডকুমেন্টারি তৈরিতেও তাঁর মধ্যে দেখেছিলাম নতুনত্ব। তিনি ড্রইংরুমে বসে বসে তাঁর ৫০ বছরের যাপিত জীবনকথা বলতে চাননি। রাড়িখাল গ্রামের সবুজ ধানখেতে বসে কবিতা আবৃত্তি করেছিলেন। আমরা তার পাশেই ঘুরছিলাম। উফ, কী যে সুন্দর সময় কাটিয়েছিলাম! তাঁকে আমার সবার থেকে আলাদা মনে হয়।

মাঝেমধ্যে মনে হয়, তিনি যেন ছিলেন নিঃসঙ্গ একটি দ্বীপ। তাঁর ৫০ বছরপূর্তি উপলক্ষে ‘বহুমাত্রিক জ্যোর্তিময়’ যে বইটি বের হয়েছিল, সে বইয়ের উৎসর্গপত্রে তিনি লিখেছেন, ‘উদ্ভিদ পতঙ্গ পাখি নক্ষত্র জলধারা কুয়াশা জ্যোৎস্না রোদ অন্ধকার গ্রন্থ নারী পুরুষ যাদের ভালবাসা পেয়ে বেঁচে আছি ৫০ বছর।’

যে মানুষটি জীবনজুড়ে সুখ পেতে চেয়েছে চারপাশের অতি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জিনিস থেকে, সে মানুষটি আজ নেই, মেয়ে হিসেবে মেনে নিতে পারি না যেন। তখন তাঁর লেখা বইগুলো হাত দিয়ে ছুঁই। জন্মদিনে সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে নিয়ে লেখা তাঁর ফ্যানদের অনুভূতি পড়ে বুঝতে পারি, কী রকম একজন সাহসী-মেধাবী মানুষ ছিলেন আমার বাবা। চোখ থেকে ঝরে পড়ে আনন্দ-অশ্রু। শুভ জন্মদিন, বাবা।

প্রথম আলো

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.