করোনায় মৃৎশিল্পীদের পথে বসার উপক্রম

শেখ মোহাম্মদ রতন: বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও প্রাণঘাতি মহামারি করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) সংক্রমণ কমিউনিটি পর্যায়ে ভয়ানক রূপ ধারণ করেছে। ফলে প্রায় দেড় মাস ধরে দেশের প্রায় সব ধরণের ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। বন্ধ রয়েছে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলার মৃৎশিল্প পল্লিও।

এখানেও মরণব্যাধি করোনার ভয়াবহতা দেখা দিয়েছে। আর এ করোনা সংক্রমণের কারণে নববর্ষ ও চৈত্র সংক্রান্তি মেলা হয়নি। এছাড়া এখানে প্রতিবছর বৈশাখ মাসব্যাপী বাঙালির উৎসব হয়ে থাকে। কিন্তু প্রাণঘাতি এ ভাইরাস সব তছনছ করে দিয়েছে। এবার বাঙালি সেই উৎসব হয়নি। ফলে স্থানীয় মৃৎ শিল্পীদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, মৃৎশিল্পীরা বেঁচে থাকেন বাংলা নববর্ষকে ঘিরে। পয়লা বৈশাখের দিন থেকে শুরু করে পুরো বৈশাখজুড়েই দেশের বিভিন্ন স্থানের মত মুন্সীগঞ্জ সিরাজদিখান উপজেলায়ও সমারোহের সঙ্গে বৈশাখী মেলা হয়ে থাকে। কিন্তু করোনার জেরে বিপর্যস্ত গোটা জনজীবন।

এ করোনাভাইরাসের কারণে এক এক করে বাড়ানো হচ্ছে লকডাউনের সময়সীমা। মহামারী থেকে বাঁচতে বাড়ানো হতে পারে আবারও সরকারি বেসরকারি ছুটির মেয়াদও। ফলে নববর্ষের মাসে মাথায় হাত পড়েছে সিরাজদিখানের মৃৎশিল্পীদের।

লকডাউনের মধ্যেই অতিক্রম হয়ে গেছে বৈশাখী উৎসব, উপজেলার কোথাও মেলা হয়নি। আগে থেকে বায়না দিয়ে রাখা ব্যবসায়ীরাও শেষ মুহূর্তে অর্ডার বাতিল করে। প্রতিবারের থেকে এবারের চেহারাটা যেন পুরো উল্টো। নববর্ষেও এবার বিক্রি নেই মাটির তৈরি জিনিসপত্রের।

জানা যায়, করোনাভাইরাসের (কোভিড-১৯) কারণে সিরাজদিখান উপজেলাসহ পুরো মুন্সীগঞ্জ জেলা বর্তমানে লকডাউনে রয়েছে। জনসাধারণের চলাচল নেই। চলছে না কোনো পরিবহনও। বন্ধ রয়েছে বাজার-হাট।

যেখানে পহেলা বৈশাখ ঘিরে বাঙালির উদ্দীপনার শেষ থাকে না। যে পয়লা বৈশাখ ঘিরেই এখনো টিকে রয়েছে পালপাড়াগুলো, সেই পালপাড়ার মৃৎশিল্পীদের পরিবারে এবার পয়লা বৈশাখ এসেছে বিষাদের কালোছায়া। লকডাউনের কারনে চরম সমস্যার মধ্যে পড়েছে মৃৎশিল্পীরা। এর আগেও লকডাউনের কারণে বাতিল হয়েছে বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান। এবার বাতিল হল নববর্ষের অনষ্ঠান।

প্রতিবছর এ দিনে মাটির পুতুল, ঘোড়া, গনেশের মূর্তি, পান্তা ইলিশের মাটির থালার চাহিদা থাকে তুঙ্গে। সব ব্যবসায়ী এই নববর্ষের দিনটিতে ব্যবসার হাল ফেরাতে সিদ্ধিদাতার আরাধনায় মেতে ওঠে। এবার সেই মৃৎশিল্পের ব্যবসাটার চিত্রটাই যেন ভিন্ন। হাজার হাজার মাটির তৈরি তৈজসপত্র রয়েছে মৃৎশিল্পীদের কারখানায়। মাটির থালাও রয়েছে প্রচুর। ফলে উপজেলার মৃৎশিল্পীদের রুজি রোজগার প্রায় বন্ধের পথে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উপজেলার রশুনিয়া ইউনিয়নের বড় আখড়া পালপাড়া গ্রাম, চোরমর্দ্দন, বাসাইল, রাঙ্গামালিয়া, শেখরনগর, আবিরপাড়া ও দানিয়াপাড়া পালপাড়া গ্রামে পাঁচশতাধিক পরিবার রয়েছে যারা এই মৃৎশিল্পকে ধরে রেখেছেন। দানিয়াপাড়া বড় আখড়াও বাসাইলের কয়েকটি পরিবারের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, দুই মাস আগে থেকেই পয়লা বৈশাখের প্রস্তুতি চলছিল পালপাড়ায়।

তৈজসপত্র, খেলনা তৈরি করতে শুরু করেন তারা। করোনায় হঠাৎ সবকিছু পাল্টে গেছে। জীবনযাত্রা স্থবির এখন। এই অবস্থায় জীবন নিয়েই মানুষ আতঙ্কে রয়েছে বাসন-কোসন কিনবে কে? তাছাড়া বৈশাখী মেলাও কোথাও হয়নি এবার। ফলে আর্থিকভাবে বড় ধরনের ক্ষতিতে পড়েছেন তারা।

তারা জানান, মাটি কিনে এনে তৈজসপত্র বানাতে হয়। মাটি কিনে রেখেছিলেন কিছু কিছু তৈজসপত্র ও খেলনা বানানো হলেও তা বিক্রি আর হবে না এবার। অনেকের তৈজসপত্র পোড়ানোর চুলাও জ্বলেনি। ফলে কয়েক লাখ টাকার ক্ষতি হয়ে গেলো।

শেয়ার বিজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.