ধান ঘরে তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছে শ্রীনগরের কৃষকরা

দেশব্যাপী করোনা ভাইরাস সংক্রমণ রোধে এর প্রভাব পড়েছে সর্বস্তরে। বিশেষ করে পাকা ধান জমিতে রেখে দিশেহারা হয়ে পরেছিলেন আড়িয়ল বিলের কৃষকরা। পরে স্থানীয় জানপ্রতিনিধিগণ ও উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রদক্ষেপে কৃষকদের দুর্ভোগ লাঘবে সরকারের পক্ষ থেকে কম্বাইন্ড হারবেস্টার, রিপার মেশিনসহ অন্য জেলা থেকে হাজার হাজার কৃষি শ্রমিক আনার ব্যবস্থা করা হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় গত এপ্রিল মাসের ২১ তারিখে উন্নত প্রযুক্তিসম্মর্ন কম্বাইন্ড দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে আড়িয়ল বিলের ধান কাটার উদ্বোধন করেন জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার।

এর পর এখানে কৃষকদের কথা মাথায় রেখে তাদের ফসল ঘরে তুলতে অন্য জেলার শরিয়দপুর, রাজবাড়ি, ফরিদপুর, কুরিগ্রাম, দিনাজপুর থেকে হাজার হাজার শ্রমিক আনার ব্যবস্থাও করেন উপজেলা প্রশাসন। স্বাস্থ্য বিধি নিশ্চিত করনের লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে এখানে আনা হয়।

অন্যদিকে করোনা ভাইরাস সংক্রমণ এড়াতে উপজেলা বিভিন্নস্থানে কাজে যোগ দিতে আলাদা আলাদাভাবে থাকা ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে কাজকর্মে যোগদানে সহযোগিতাও করা হচ্ছে। এবিষয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের উপজেলা প্রশাসন নির্দেশ দিয়েছেন। করোনা মোকাবেলার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষক যেন ফসল সুন্দরভাবে ঘরে তুলতে পারেন। এছাড়াও যেকোনও সমস্যা সমাধানে স্থানীয় কৃষি অফিসারগণ মাঠে কাজ করছেন সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।

এরই ধারবাহিকতায় এখন শ্রীনগরে চলছে পুরোদমে ধান কাটা ও মারাইয়ের কাজ। বিভিন্ন রাস্তাঘাট ও খোলা মাঠে কৃষান-কৃষাণিদের ধান নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন তারা। দেখা গেছে কাটা ধান আন্দ উৎসব করে শ্রমিকা বোংগা মেশিনে মাইয়ের কাজ করছেন। ঘন্টায় প্রায় ৬০-৮০ মন ধান মাইয়ের কাজ করেত সক্ষম শ্যালো ইঞ্জিন চালিত বোংগা নামক মেশিনটি। কৃষি শ্রমিক কয়েকজন কাটা ধান এনে দিচ্ছেন একজন বোংগায় দিচ্ছেন। এতে করে খরকুটো একদিক দিয়ে উড়ে গিয়ে পরছে। অন্যদিকে ধানগুলো বোংগার নিচের অংশ দিয়ে ঝুড়িতে পরছে। এমনি দৃশ্য লক্ষ্য করা গেছে শ্রীনগরে।

উপজেলায় এবছর ইরি ধানের আবাদকরা হয়েছে ১০ হাজার হেক্টর জমিতে। এরমধ্যে এক আড়িয়লবিলের শ্রীনগর অংশে ধান চাষ করা হয়েছে ৫ হাজার হেক্টর জমিতে। এবছর করোনা প্রভাবে বিলপাড়ের কৃষকরা দুশ্চিায় পরেছিলেন খান কাটার শ্রমিক সংকট নিয়ে। কারণ নিচু জমিতে সঠিক সময়ে ধান কাটতে পারলে জুয়ারের পানিতে জমির ধান তলিয়ে যাবে। নানা প্রতিকুলতা কাটিয়ে এখন আড়িয়লবিলের ধান কাটা পুরো দমে চলছে। এরই সাথে পাল্লা দিয়ে উপজেলা ১৪টি ইউনিয়নের প্রায় চকেই পাকা ধানও কাটা শুরু হয়েছে। ধান কাটা ও মারাই কাজ নিয়ে কৃষাণ-কৃষাণিদের খুব ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে।

বিল এলাকার কয়েকজন কৃষক জানায়, তাদের এখন ধান কাটতে কোনও সমস্যা হচ্ছেনা। ধান কাটার জন্য অন্য জেলার কৃষি শ্রমিক তারা পেছেন। তারা সরকারের ঘোষিত আইন ও স্বাস্থ্য বিধি মেনে জমিতে কাজ করছেন। কৃষি শ্রমিকদের আলাদা আলাদা ভাবে থাকার ব্যবস্থা করছেন। শ্যামসিদ্ধি এলাকার কৃষক মালেক মোড়ল বলেন, আমাকে সরকার একটি কম্ববাইন্ড হারবেস্টার দিয়েছেন। যার মূল্য ২০ লাখ টাকা। এরমধ্যে নিজের ১০ লাখ টাকা। এতে করে খুব সহজেই ধান কাটতে পারছি। এছাড়াও অন্য কৃষকের ধানও কেটে দিচ্ছি। শুকনো জমিতে ধান দ্রুত কাটা যায়। ঘন্টায় প্রায় এক একর জমির ধান কাটতে পারে একই সাধে ধান মারাই ও ঝারের কাজও করতে সক্ষম মেশিনটি। প্রতি একর জমির ধান কাটতে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে ধার্য করা হয়েছে ৬ হাজার টাকা।

আড়িয়ল বিলে কয়েকজ কৃষি শ্রমিকের সাথে কথা হলে তারা জানান, এবছর একটু ব্যতিক্রম। করোনার প্রভাবে কাজে আসতে পারছিলাম না। পরে দুই দিক থেকে প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতায় এখানে আসতে পারি। কাজ করছি কোনও সমস্যা হচ্ছেনা। স্থানীয় কৃষকরা তাদের থাকা খাওয়াসহ সব ধরনের খরচ দিবেন। এছাড়াও দৈনিক শ্রমিক প্রতি ১ মন করে ধান দিবেন। এভাবেই তাদের সাথে চুক্তি করা হয়েছে বলেন তারা।

এছাড়াও উপজেলার পূর্ব এলাকার চিত্র একটু ভিন্ন মাহাবুব, হারুন, নিজাম শেখসহ কয়েকজন কৃষক বলেন, করোনার প্রভাবে স্থানীয় নি¤œ আয়ের কর্মহীন মানুষ গুলো এখন বেকার সময় কাটাচ্ছেন। তাদের অনেকেই ৬-১০ জনের একটি গ্রুপ করে এলাকায় ধান কেটে বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবে নিচ্ছেন। স্থানীয় শ্রমিকগুলো মূলত শতাংশ হিসেবে (৭ সতাংশ ১ গন্ডা) জমির ধান কাটা ও মারাই পর্যন্ত কাজ করেন। ১ গন্ডা ধান কাটতে বর্তমান পরিস্থিতিতে ৬০০-৮০০ টাকা করে নিচ্ছেন তারা। ১ জন শ্রমিক দৈনিক ১ গন্ডা জমির ধান কাটতে পারেন।

এছাড়াও দেখা গেছে, উপজেলার পাটাভোগ, আটপাড়া, কুকুটিয়া, রাঢ়ীখাল, তন্তরসহ বিভিন্ন চকে এখন বাসমতি ও ইরি-২৮ জাতের ধান কাটা হচ্ছে। এখানে সবচেয়ে বেশী চাষ করা হয় ইরি-২৯ জাতের ধান। এই ধানগুলো একটু দেরিতে পাকে। ১০-১৫ দিনের মধ্যে সব ধান পেকে যাবে।

আগামী ১ মাসের মধ্যে এখানকার কৃষকদের ধান কাটা শেষ হয়ে যাবে এমনটাই মনে করছেন স্থানীয় কৃষি অফিস। কৃষি অফিসার মো. জাহাঙ্গীর আলম জানান, কৃষকদের ধান কাটায় সার্বিকভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে। এবছর ধানের ফলন ভাল। কোনও প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে কৃষকদের কোনও সমস্যা হবেনা। আমাদের কৃষি অফিসারগণ এবিষয়ে কাজ করছেন।

শ্রীনগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোসাম্মৎ রহিমা আক্তার এ বিষয়ে জানান, করোনা মোকাবেলার পাশাপাশি ডিসি স্যারের নির্দেশ মোতাবেক এখানকার কৃষকদের দুর্ভোগ লাঘবে সব ধরনের প্রদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে কৃষকদের উন্নত প্রযুক্তির কম্বাইন্ড হারভেস্টার, বেশ কয়েকটি রিপার মেশিন দেওয়া হয়েছে। মেশিনগুলো আড়িয়লবিলের কৃষকরা সহজেই জমির ধান কাটটে পারছেন। অন্য জেলা থেকে উপজেলায় প্রায় ৬ হাজার কৃষি শ্রমিক আনা হয়েছে। তাদের স্বাস্থ্য বিধি নিশ্চিত করণে আলাদা আলাদা ভাবে থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবেও অনেক শ্রমিক কাজ করছেন। আশা করছি কৃষকের ফসল ঘরে তুলতে কোনও সমস্যা হবেনা। এছাড়াও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তর এ বিষয়ে মাঠে কাজ করছেন। কৃষকদের যেকোনও সমস্যা সমাধানে উপজেলা প্রশাসন নজর রাখছে।

নিউজজি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.