মুন্সিগঞ্জে গত একমাসের করোনা পরিস্থিতি

রিয়াদ হোসাইন: মুন্সিগঞ্জে গত ১১ এপ্রিল প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় । সে হিসেবে জেলায় করোনা রোগী শনাক্তের আজ ৩০ তম দিন। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যমতে, এ পর্যন্ত করোনা রোগী শনাক্ত হয়েছে ২৪৫ জন। এরমধ্যে মারা গেছেন ১১ জন। শনাক্তের প্রথম সপ্তাহে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩৭ জন। দ্বিতীয় সপ্তাহে শনাক্তের সংখ্যা বেড়ে ৬৮ জনে। যা তৃতীয় সপ্তাহে বেড়ে ১১৭ জন হয়। তবে, গত ৮দিনে এক লাফে ১২৮ জন করোনায় আক্রান্ত হয়ে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আড়াইশর কোঠায়। এরমধ্যে মৃত একজনসহ স্বাস্থ্য বিভাগের ৪৭ জন ও পুলিশ প্রশাসনের ৯ কর্মকর্তার শরীরে করোনা শনাক্ত হয়েছে। আশঙ্কাজনক ভাবে রোগী বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। এতে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে স্বাস্থ্য বিভাগসহ জেলার নাগরিক সমন্বয় পরিষদ।

মুন্সিগঞ্জ সিভিল সার্জন অফিস সূত্র জানাযায়, রবিবার নতুন দুইজনসহ জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা ২৪৫ জনে দাঁড়িয়েছে। আজ ১৪৬ জনসহ জেলার মোট ১৫৭০ জনের নমুনা ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ইতিমধ্যে ১১৬০ জনের নমুনার ফল পাওয়া গেছে। তবে, গত ৭ , ৮, ৯ ও ১০ মে পাঠানো ৪১০ জনের নমুনা পরীক্ষার ফল এখনো পাওয়া যায়নি। এ পর্যন্ত সদর উপজেলায় ৯৭ জন, টঙ্গিবাড়ী উপজেলায় ১৪, সিরাজদিখান উপজেলায় ৫০, শ্রীনগর উপজেলায় ৩৭ জন, লৌহজং উপজেলায় ২৬ জন এবং গজারিয়া উপজেলায় ২১ জন করোনায় আক্রান্ত রোগী পাওয়া গেছে।

এরমধ্যে সদরে একজন স্বাস্থকর্মীসহ ছয়জন, টঙ্গিবাড়ীতে দুজন ও শ্রীনগর উপজেলায় একজন করোনা শনাক্ত হওয়ার আগেই মারা যান। তবে লৌহজং উপজেলায় দুইজন করোনা নিয়ে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তবে, এখন পর্যন্ত সিরাজদিখান উপজেলায় একই পরিবারের তিনজনসহ ছয়জন, টঙ্গিবাড়ী উপজেলায় চারজন, শ্রীনগর উপজেলায় একজন এবং সদর উপজেলায় তিনজনসহ জেলায় মোট ১৪ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন।

মুন্সিগঞ্জ নাগরিক সমন্বয় পরিষদের আহবায়ক এডভোকেট সুজন হায়দার বলেন, করোনা পরিস্থিতি আমাদের জেলায় মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এই জেলার প্রায় ১৬ লক্ষ মানুষের জীবন এখন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশাল জনগোষ্ঠীর বিপরীতে করোনা মোকাবেলায় এই জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রস্তুতি খুব নগণ্য ও দায়সারা গোছের। মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব ও করোনা সনাক্তকরণ ল্যাবসহ চিকিৎসার সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় প্রতিদিন করোনা আক্রান্তদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এদিকে, যারা নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছেন, তাদের অধিকাংশের মধ্যে কোনো লক্ষণ নেই। করোনার নমুনার ফলাফল সময় মত পাওয়া যাচ্ছেনা। লক্ষণ লুকিয়ে অনেকে চিকিৎসা নিয়ে লোকালয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। এসব কারণে জেলায় করোনা দ্রুতই ছড়িয়ে পড়ছেন বলে মনে করছেন চিকিৎসকরা।

সিরাজদিখান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ড. বদিউজ্জামান বলেন, তার হাসপাতালে এখন পর্যন্ত চারজন চিকিৎসক, ৯ জন নার্সসহ স্বাস্থ্য বিভাগের ১৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন। তিনি বলেন, নতুনদের কারো মধ্যেই করোনার লক্ষণ নেই। এর আগে যারা আক্রান্ত হয়েছেন তাদের অনেকের মধ্যেও লক্ষণ ছিলনা। যাদের সামান্য লক্ষণ আছে তারা সেটা গোপন করে চিকিৎসা নিচ্ছে। এতে করে চিকিৎসক, সাধারণ মানুষরা নতুন করে আক্রান্ত হচ্ছে।

সিভিল সার্জন আবুল কালাম বলেন, করোনা আক্রান্ত রোগী এ জেলায় খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এটা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। সদর উপজেলার মানুষ একটু সচেতন। এ উপজেলার মানুষ স্বেচ্ছায় নমুনা দিচ্ছেন। এখান থেকে থেকে বেশি বেশি নমুনা পাঠানো হচ্ছে। তাই আক্রান্তের সংখ্যাও বাড়ছে। অন্য উপজেলা গুলো থেকে আরো বেশি নমুনা পাঠানো হলে সেখানেও আরো অনেক রোগী বাড়তে পারে।

তিনি আরো বলেন, যাদের সনাক্ত হওয়ার বিষয়টি আমাদের তালিকায় ছিল আমারা তাদের বাড়িতে, হাসপাতালে যথাযথ কোয়ারেন্টিনে রেখে চিকিৎসা দিচ্ছি। জেলা থেকে পাঠানো নমুনার ফলাফল আসতে ৪-৫ দিন লেগে যায়। ফলে আক্রান্ত রোগীরা নিজেরাই জানতে পারেনা তারা পজিটিভ। এতে তারা পরিবার ও আশপাশের মানুষকে আক্রান্ত করেছে। এছাড়াও জেলার সব উপজেলাতেই নতুন রোগীরা লক্ষণ ছাড়াই আক্রান্ত হচ্ছেন। উপসর্গ লুকিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া এসব কারণে মুন্সিগঞ্জে অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে।

এছাড়াও দিন দিন এ রোগের আরও নতুন নতুন উপসর্গ দেখা যাচ্ছে। কারও মধ্যে সামান্য পরিমাণে উপসর্গ দেখা দিলে অথবা সন্দেহ হলে চিকিৎসকের পরামর্শসহ করোনা পরীক্ষা করাতে হবে। নমুনা দেওয়ার পাশাপাশি আইসোলেশনে থাকতে হবে। রোগীর স্বজনদেরও সচেতন হতে বলেন সিভিল সার্জন।

সিভিল সার্জন মনে করেন করোনার পরীক্ষা বেশি করা গেলে এবং নিয়মিত ফলাফল পেলে রোগীদের সম্পর্কে বেশি ধারণা পাওয়া যাবে। সে ক্ষেত্রে মানুষ সাবধানে থাকতে পারে।

এ জন্য সিভিল সার্জন, মুন্সিগঞ্জ নাগরিক সমন্বয় পরিষদসহ জেলার বিশিষ্ট জনেরা সরকারি অথবা বেসরকারিভাবে জরুরী ভিত্তিতে করোনা সনাক্তকরণ ল্যাব স্থাপনের দাবি জানান।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার নতুন ভবনে করোনা চিকিৎসার জন্য ৫০ শয্যা প্রস্তুত রয়েছে। সেখানে করোনার সব ধরনের চিকিৎসা দেওয়া গেলেও আইসিইউর জন্য রোগীকে ঢাকায় পাঠানো লাগবে। এছাড়া অন্য পাঁচটি উপজেলায় হাসপাতালে একটি আলাদা ওয়ার্ডে আইসোলেশনের জন্য ৬ টি করে শয্যা আছে। একমাত্র লৌহজং উপজেলায় ইউনাইটেড হাসপাতালের উদ্যোগে ১২ শয্যার একটি করোনা ইউনিট চালু করা হয়েছে। যেখানে মাত্র দুটি আইসিইউ আছে।

অন্যদিকে, গত ১১ এপ্রিল প্রথম স্বাস্থ্য বিভাগের দুজনসহ ১০ জনের করোনা সনাক্ত হয়। এরপর থেকে মুন্সিগঞ্জ জেলাকে লকডাউন ঘোষণা করেন জেলা প্রশাসক। প্রথম দিকে প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে জেলা কিছুটা সুরক্ষিত থাকলেও। এখন লকডাউনের সে চিত্র দেখা যায়না।

প্রথম আলোর মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি ফয়সাল হোসেন বলেন, কিছুদিন আগেও জেলার বিভিন্ন স্থানে পুলিশ চৌকি ছিল। বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে পুলিশের তৎপরতা দেখার মত ছিল।গত এক সপ্তাহ ধরে মুক্তারপুর সেতুর চেকপোস্ট ছাড়া কোথাও পুলিশ নেই। কাগজে কলমে লকডাউন থাকলেও বাস্তবে নেই। এতে করে মানুষ অবাদে চলা ফেরা করছে ঢাকা- নারায়ণগঞ্জে সহজে যাতায়াত করছে। শিমুলিয়া ঘাট দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যাওয়া আসা করছে। এতে করে করোনার ঝুঁকি আরো বেড়ে গেছে।

দৈনিক অধিকারের মুন্সিগঞ্জ প্রতিনিধি রিয়াদ হোসাইন বলেন, লকডাউন উপেক্ষা করে জেলা ও উপজেলা শহর ও গ্রামগঞ্জের হাটবাজার গুলোতে মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে। প্রথম দিকে প্রশাসনের তৎপরতা চোখে পড়ার মতো থাকলেও দিন দিন সেই তৎপরতা অধিকাংশে কমে গেছে। তাই সাধারণ মানুষের চলাচল স্বাভাবিক হয়ে পড়েছে। এতে করে মুন্সিগঞ্জ জেলায় ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে জেলা পুলিশ সুপার মো. আব্দুল মোমেন বলেন, বর্তমানে যে পরিস্থিতি রয়েছে সেখানে ব্যক্তিগত উদ্যোগে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। এছাড়া সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে ও সংক্রমণ রোধে সরকারের যে নির্দেশনা রয়েছে তা অমান্য করলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মুন্সিগঞ্জ জেলা প্রশাসক মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিদিন মানুষ ঘরে রাখার জন্য মাইকিং করা হচ্ছে। পুলিশ প্রশাসনও তাদের চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবে প্রথম দিকে আক্রান্ত কম ছিল। মানুষের মধ্যও করোনা ভীতি ছিল। এখন সংখ্যা বাড়ছে, অথচ মানুষ তাদের বিভিন্ন প্রয়োজনে প্রশাসনের নির্দেশ উপেক্ষা করে বেড়িয়ে আসছে। জেলার অনেক পুলিশ আক্রান্ত হয়েছে। দোকানপাট, মার্কেটও সীমিত আকারে খুলছে তাই কয়েকটি জায়গায় চেকপোস্ট শিথিল করা হয়েছে।

এখনো আন্তঃ জেলা যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সীমিত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। মানুষ নিজেরা সচেতন না হলে আর্মি,পুলিশ ও প্রশাসন কিছুই করতে পারবেনা।

করোনা পরীক্ষার ল্যাবের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, রোগীর সংখ্যা যেহেতু বাড়ছে, একটি ল্যাব হলে নিঃসন্দেহে ভাল হবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জানানো হবে।

দৈনিক অধিকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.