দখলকৃত রজতরেখার আনন্দ উচ্ছ্বাস

রিয়াদ হোসাইন: বর্ষাকাল এলেই সাধারণ নদ-নদীর মতো মুন্সীগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী রজতরেখা নদীও ফিরে পায় তার হারানো যৌবন। বর্ষা মৌসুম এলে দখলকৃত রজতরেখা নদীর আনন্দ উচ্ছ্বাসের আর সীমা থাকে না। নদীর প্রতিটি কোণায় কোণায় পরিষ্কার পানিতে থইথই করে আর পানিও ব্যবহারের উপযুক্ত হয়ে উঠে।

বর্ষাকালে রজতরেখা নদীর সারা বছরের চিরচেনা রূপ পাল্টে যায়। রজতরেখার পরিষ্কার পানি ছাড়া যেন এর আশপাশের মানুষের জীবন চলেই না। নিম্ন আয়ের মানুষেরা রজতরেখার জলেই দৈনন্দিন গোসলসহ আরো সবকাজ সেরে নেন বছরের এই সময়টা। এবারের বর্ষায় রজতরেখা নদীর রূপ দেখে স্থানীয়দের স্মৃতিতে আবারো ভাসছে খরস্রোতে সেই রজতরেখা হারিয়ে যাওয়া যৌবনের নানা দিক। যে রজতরেখা এক সময় নদী তীরবর্তী মানুষের জীবিকার অন্যতম উৎস ছিল, কালের পরিক্রমায় সেই রজতরেখা ভরাট হয়ে পরিণত হয়েছে মরা খালে। রজতরেখা আবারো তার নাব্যতা ফিরে পাওয়া ভূমি সন্ত্রাসীদের মুখ কালো হলেও হাসি ফুটেছে নিম্ন আয়ের মানুষের মুখে। এ বছর নদী পাড়ের মানুষ নানা প্রজাতির যে মাছ পেয়েছে, গত ৫ বছরেও তা পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এ দিকে ঐতিহ্যবাহী রজতরেখা নদীটিকে ঘিরে অনেক কবি ও লেখক তার লেখায় মুগ্ধতা ছড়িয়েছেন। তবে খাতা-কলমে রজতরেখা জ্যোতি ছড়ালেও বাস্তবে দখল ও দূষণের কারণে প্রায় বিলুপ্তির পথে রজতরেখা নদী। বর্ষা মৌসুম ছাড়া এ নদীতে পানির দেখা মিলে না। পদ্মা নদী থেকে উৎপত্তি হয়ে মুন্সীগঞ্জ সদর ও টঙ্গীবাড়ী উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষে এঁকে বেঁকে ১২ থেকে ১৪ কিলোমিটার অতিক্রম করে ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে মিশেছে। রজতরেখা নদীর উৎপত্তি স্থান থেকে শুরু করে সর্বত্রই চলছে দখলবাজদের আগ্রাসী থাবা। নদীর দুই পাড় দখল করেই ক্ষান্ত হয়নি দখলবাজরা, নদীর উপর তারা ঘরবাড়ি, দোকানপাট বানিয়ে করছে রমরমা ব্যবসা। ক্রমাগত বেদখলে ৪’শ ৮০ ফুট প্রস্থের নদীটি বর্তমানে ৩০ থেকে ৪০ ফুট এসে দাঁড়িয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় নদীটি বিলুপ্ত হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করছে স্থানীয়রা।

সরেজমিনে অনুসন্ধানকালে স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, স্থানীয় পর্যায়ের ভূমি অফিসের অসৎ কর্মচারীদের যোগসাজশে প্রভাবশালী দখলবাজরা নদীর জায়গার ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে নিয়েছে, তৈরি করেছে জাল দলিল। এসব ভুয়া জাল কাগজপত্র সম্বল করেই নানা রকম মামলা ঠুকে দীর্ঘসূত্রতা সৃষ্টি, সেই সাথে পুলিশ-প্রশাসনকে ম্যানেজ করে দখল করে নিচ্ছে নদীর সীমানা। তাই মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না স্থানীয়রা।

এ বিষয়ে পরিবেশবাদী শেখ রাসেল ফখরুদ্দীন জানান, রজতরেখা নদী দখলে খুব একটা বাধার মুখে না পড়ায় দখলদারদের নজর এখন নদী ও খালের জমির ওপর। বর্তমানে প্রভাবশালীরা আর লুকিয়ে নয়, প্রকাশ্যেই এ বেআইনি কাজ করে চলেছে।

তিনি অভিযোগ করে বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ঢিলে ভাবের কারণেই দখলদারদের সাহস বাড়ছে। ফলে দিন দিন সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে খাল ও নদীর মতো জলাশয়ের জমি, বাড়ছে দূষণ।

ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায়, ধবধবে সাদা উত্তাল জলরাশির জন্যই নদীটির নামকরণ রজতরেখা করা হয়েছে। তবে কালের বিবর্তনে সে ধবধবে উত্তাল জলরাশি হারিয়ে নাব্যতা সংকটে নদীটি শুকিয়ে এখন মৃতপ্রায়। বর্ষা মৌসুমে নদীতে সামান্য জল থাকলেও বাকি সারা বছর নদীটি শুকিয়ে নিছক এক নালায় পরিণত হয়।

স্থানীয় বিপুল খাঁন বলেন, নদীটি খনন করলে তার নাব্যতা পূর্বের মতো ফিরে পাবে। কিছুদিন আগে শুনেছিলাম নদীটি খনন করা হবে। এছাড়া নদীর দুই পাশের অবৈধ দখলকৃত জমি উদ্ধার করা হবে। পরে করোনা চলে আসার পর এ সম্পর্কে আর কোনো অগ্রগতি দেখিনি।

আরেক স্থানীয় সোহাগ বেপারি বলেন, রজতরেখা নদীটি মুন্সীগঞ্জের ঐতিহ্য বহন করে। কিন্তু দখলবাজরা দিন দিন নদীর গলা টিপে ধরছে। এতে করে রজতরেখা নদী প্রায় বিলুপ্তির পথে। করোনার আগে শুনেছিলাম দখলবাজদের চিঠি দেওয়া হয়েছিল। এখন আর দখলমুক্ত করার কোনো লক্ষণই দেখছি না।

এ ব্যাপারে নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, রজতরেখা খালটি উদ্ধারে কাজ শুরু করা হয়েছিল। এ ব্যাপারে দখলকারীদের চিঠিও পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু কোনো এক অদৃশ্য শক্তি এই খালটি উদ্ধারে কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দিয়েছে।

রজতরেখা নদীর উদ্ধারের ব্যাপারে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, খাল ও নদী কারও ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। এগুলো সরকারি সম্পদ, যে কোনো মূল্যে তা উদ্ধার করা হবে। খাল-নদী পুনরুদ্ধারে আমাদের দুইটি পরিকল্পনা রয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথমে দখলমুক্ত করা হবে। পরবর্তীকালে নদী ও খালের স্বাভাবিক নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে খননকার্য পরিচালনা করা হবে।

দৈনিক অধিকার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.