মুন্সীগঞ্জে করোনা সংক্রমণের চার মাস

রিয়াদ হোসাইন: মুন্সীগঞ্জে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার খবর প্রকাশের চার মাস হয়েছে আজ। এই চার মাসে শনাক্ত ও মৃতের সংখ্যা কিছুটা কমলেও সংক্রমণের হার এখনও ঊর্ধ্বমুখী আছে। এদিকে ঈদকে কেন্দ্র করে বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত এবং মানুষের মাঝে সচেতনতা আগের চাইতে কমে যাওয়ার কারণে সামনে দিনগুলোয় রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মুন্সীগঞ্জ জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতি ১০০ জনের নমুনা পরীক্ষায় গড়ে ২১ জনের বেশি মানুষের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হচ্ছে। গত চার মাসে ১৩ হাজার ১৫৪ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হলে, করোনাভাইরাসে সংক্রমিত ব্যক্তি পাওয়া গেছে ২ হাজার ৮৮১ জন। এরমধ্যে মৃত রয়েছে ৬৩ জন।

মুন্সীগঞ্জ জেলায় গত ৩ এপ্রিল থেকে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) ল্যাবে নমুনা পাঠানো শুরু হয় । এরপর গত ১১ এপ্রিল জেলায় প্রথম করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি শনাক্ত হয়। জেলা থেকে প্রথমে আইইডিসিআর ল্যাবে নমুনা পাঠানো হলেও বর্তমানে ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব প্রিভেন্টিভ অ্যান্ড সোশ্যাল মেডিসিনের (নিপসম) ল্যাবে এই জেলার নমুনা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, গত এপ্রিল মাসে ৫৪২ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হলে, সেখানে ৭৯ জনের দেহে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে । সে হিসেবে এপ্রিল মাসে নমুনা পরীক্ষায় ’পজিটিভের’ হার ছিলো ১০ দশমিক ৫৭ শতাংশ । এছাড়া গত মে মাসে জেলায় করোনাভাইরাসে সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পেতে শুরু করে। ওই মাসে ৩ হাজার ৩৯৫ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এতে করোনাভাইরাস শনাক্ত হয় ৬৩০ জনের দেহে। মে মাসের হিসাব অনুযায়ী সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পেয়ে ১৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ হারে দাঁড়িয়েছে । যা এপ্রিল মাসে তুলনায় প্রায় ৮ শতাংশ বেশি।

অন্যদিকে, এপ্রিল ও মে মাসকে জেলায় নমুনা পরীক্ষা ও পজিটিভের সংখ্যার দিক দিয়ে ছাড়িয়ে গিয়েছে জুন মাস । জুন মাসে নমুনা পরীক্ষা করা হয় ৬ হাজার ৮ জনের, সেখানে করোনা পজিটিভ হয় ১ হাজার ৩৯৭ জন। জুন মাসের তথ্য মোতাবেক ২৩ দশমিক ২৫ শতাংশ নমুনাই করোনা ’পজিটিভ’ হিসেবে শনাক্ত হয়েছে। তবে, জুলাই মাসে করোনা পরীক্ষা ও সংক্রমণের সংখ্যা অনেকটাই কমে আসে । জুলাই মাসে ২ হাজার ৭০৭ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হলে ’পজিটিভ’ শনাক্ত হয় ৬৪৩ জন। সে হিসেবে জুলাই মাসে করোনা পজিটিভের হার ২৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এছাড়া চলতি আগস্ট মাসে করোনা ’পজিটিভ’ হয়েছেন ১৩২ জন ব্যক্তি ও নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে মাত্র ৫০২ জনের। সে হিসেবে চলতি মাসে করোনা পজিটিভের হার ২৬ দশমিক ২৯ শতাংশ।

জেলায় সচেতন নাগরিকদের সাথে কথা বলে জানাযায় ,এই জেলার প্রায় ১৬ লাখ মানুষের জীবন এখন মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বিশাল জনগোষ্ঠীর বিপরীতে করোনা মোকাবেলায় এই জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের প্রস্তুতি খুব নগণ্য ও দায়সারা গোছের। মানুষের মধ্যে সচেতনতার অভাব ও করোনা শনাক্তকরণ ল্যাবসহ চিকিৎসার সঠিক ব্যবস্থাপনা না থাকায় প্রতিদিন করোনা আক্রান্তদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই অতিদ্রুত এই জেলায় করোনা শনাক্তকরণ ল্যাব স্থাপনের দাবী জানান তারা।

এ বিষয়ে মুন্সীগঞ্জ সিভিল সার্জন আবুল কালাম আজাদ বলেন, জুন মাসে জেলায় পিক চলছিলো। তবে জুনের শেষ সপ্তাহ থেকে এ পর্যন্ত পরিস্থিতি স্থিতিশীল রয়েছে। আশাকরি এখন সংক্রমণের সংখ্যা কমতে থাকবে। এদিকে, অন্যান্য জেলার তুলনায় মুন্সীগঞ্জে মৃত্যুর হার বেশি। তবে কারণ হিসেবে সিভিল সার্জন বলেন, অন্যান্য জেলার তুলনায় আমরা মৃত ব্যক্তিদের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেছি। তাই এ জেলায় মৃত্যুর সংখ্যা বেশি হওয়াটা স্বাভাবিক।

এছাড়া সংক্রমণের হার বৃদ্ধি সম্পর্কে তিনি বলেন, এ মুহূর্তে যারা নমুনা পরীক্ষা করতে আসছেন তাদের অধিকাংশেরই লক্ষণ রয়েছে। তাই সংক্রমণের হার একটু বেশি হবে এটি স্বাভাবিক । তবে, আক্রান্ত ও মৃতদের সংখ্যা দিন দিন কমছে। তিনি আরো বলেন, করোনার সাথে মানুষের মধ্যে উদাসীনতাও বেড়েছে। মানুষ বেপরোয়াভাবে বাহিরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। বাজর-মার্কেট গুলোতে জটলা লেগেই আছে। যেখানে মাস্ক পড়া বাধ্যতামূলক হওয়ার কথা, সেখানে মাস্ক ছাড়াই বাহিরে বেড়াচ্ছেন তারা। স্বাস্থ্যবিধির মেনে না চললে অবস্থা খারাপের দিকে যাবে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে, বাড়িতে অবস্থান করতে হবে। ব্যাক্তি সচেতনতা বাড়াতে হবে।

বিষয়টিতে জেলা প্রশাসক মো. মনিরুজ্জামান তালুকদার বলেন, স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করার জন্য নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন আরো বলেন, যারাই স্বাস্থ্যবিধি অমান্য করবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

দৈনিক অধিকার

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.