শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললেই জাগবে বিউটি বোর্ডিং

করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে মার্চ থেকে বোর্ডার নেওয়া বন্ধ থাকলেও কিছুদিন আগে আবার খুলেছে পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিউটি বোর্ডিং। তবে এখনও খদ্দেরের দেখা পাওয়া ভার।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো না খুললে বিউটি বর্ডিংও আগের রূপে ফিরবে না বলে মনে করেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনার দায়িত্বে থাকা সমর সাহা। বোর্ডিংয়ের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে বুধবার কথা হয় তার সঙ্গে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে সমর সাহা বলেন, “এই পরিস্থিতি থেকে কিভাবে উত্তরণ হবে বলা মুশকিল। বর্তমান পরিস্থিতি খুবই খারাপ, ধার-দেনা করে চলছি। এখন বোর্ডার একেবারেই কম। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেকেই আসছে না। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুললে হয়তবা জমজমাট হবে।

“কর্মচারি যারা ছিল, তার চার ভাগের এক ভাগ আছে, আমরা মাত্র ৬/৭জন নিয়ে কাজ করছি। ভ্যাট-ট্যাক্স কিছুটা মওকুফ করলে সুবিধা হত।”

বিউটি বোর্ডিংয়ের পরিচালক সমর সাহা

এদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ইতিহাসের সাক্ষী পুরান ঢাকার শ্রীশচন্দ্র লেনের হলুদ রঙা দোতলা বাড়িটি শুধু আবাসিক হোটেলই নয়। এক সময়ে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী, অভিনেতা, রাজনীতিবিদ, চলচ্চিত্রকারদের অবাধ বিচরণ ও আড্ডার প্রাণকেন্দ্র ছিল এই বিউটি বোর্ডিং।

গত শতকের চল্লিশের দশকে বাংলাবাজারকে ঘিরে গড়ে উঠে প্রকাশনা শিল্প। সেখানকার নিঃসন্তান জমিদার সুধীর চন্দ্র দাসের বাড়িটিতে ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগের আগে সাপ্তাহিক ‘সোনার বাংলা’ পত্রিকার অফিস। কবি শামসুর রাহমানের প্রথম কবিতা ছাপা হয়েছিল এ পত্রিকায়ই। ভারত ভাগের সময় পত্রিকা অফিসটি কলকাতায় স্থানান্তরিত হয়। এরপর ১৯৪৯ সালে দুই ভাই প্রহ্লাদ চন্দ্র সাহা ও নলিনী মোহন সাহা এই বাড়িতে গড়ে তোলেন আবাসিক ও খাবার হোটেল।
১১ কাঠা জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত বিউটি বোর্ডিংয়ের নাম নলিনী সাহার বড় মেয়ে বিউটির নামে। একাত্তরে এই বিউটি বোর্ডিং হয়ে উঠে মুক্তিযোদ্ধাদের মিলনস্থল। বঙ্গবন্ধু এখানে আসতেন। রাজাকারদের মাধ্যমে বিষয়টি জানতে পেরে ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ এখানে হামলা চালায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী। শহীদ হন প্রহ্লাদ সাহাসহ ১৭ জন।

পরবর্তীতে প্রহ্লাদ চন্দ্রের পরিবার ভারত চলে যায়। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রহ্লাদ চন্দ্রের স্ত্রী প্রতিভা সাহা দুই ছেলে সমর সাহা ও তারক সাহাকে নিয়ে দেশে ফিরে বিউটি বোর্ডিং আবার চালু করেন।

বিউটি বোর্ডিংয়ের আড্ডা আগের মতো না থাকলেও খাবার ঘরে এখনো ভোজনরসিকদের ভিড় লেগেই থাকে। ঐতিহ্য ধরে রাখতে আজও স্টিলের থালা-গ্লাসে খাবার ও পানি পরিবেশন করা হয়। সকালে নাস্তা, দুপুরে ভাত, বিকালে সুস্বাদু লুচি ও রাতেও রয়েছে খাবারের ব্যবস্থা।

বিউটি বোর্ডিংয়ের পরিচালক সমর সাহাবিউটি বোর্ডিংয়ের পরিচালক সমর সাহাবিউটি বোর্ডিংয়ে ছোট-বড় মিলিয়ে কক্ষ রয়েছে ২২টি। একমাত্র বড় রুমের ভাড়া এক হাজার ২০০ টাকা আর সিঙ্গেল রুমের ভাড়া ২০০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে। স্বল্প খরচে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও এখানকার বেশির ভাগ কক্ষই খালি থাকে।

জন্মলগ্ন থেকেই এখানে আড্ডা দিতেন প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাংবাদিক, চিত্রপরিচালক, নৃত্যশিল্পী, গায়ক, অভিনেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। নতুন প্রজন্মের কাছে খুব পরিচিত না হলেও বোদ্ধামহল ও সুধীজনদের কাছে এর কদর একটুও কমেনি। যার কারণে একটু ফুরসৎ মিললে এখনও অনেকেই এখানে ছুটে আসেন।

মূলত চল্লিশের দশকেই খ্যাতি লাভ করে বিউটি বোর্ডিং। স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কবি শামসুর রাহমান, সৈয়দ শামসুল হকসহ অনেক বিখ্যাত মানুষ এখানে আসতেন। এসেছিলেন পল্লীকবি জসীম উদ্দীন আর নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুও। প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার আবদুল জব্বার খান এখানে বসেই লিখেছিলেন বাংলার প্রথম সবাক ছবি ‘মুখ ও মুখোশ’-এর পাণ্ডুলিপি। এরপর ‘কাঁচের দেয়াল’ চলচ্চিত্রের পাণ্ডুলিপিও এখান থেকে তৈরি হয়। ১৯৫৭ সালে কবি ফজল শাহাবুদ্দিন এখান থেকেই প্রকাশ করেন সাহিত্য পত্রিকা ‘কবিকণ্ঠ’, ১৯৫৯ সালে আহমদ ছফার সাহিত্য পত্রিকা ‘স্বদেশ’-এর উত্থানও এই বিউটি বোর্ডিং থেকেই। জাদুকর জুয়েল আইচের সূচনাও এখানেই। আর সুরকার সমর দাস বহু গানের সুর তৈরি করেছেন এখানে বসে। এই বিউটি বোর্ডিং নিয়েই শামসুর রাহমান লিখেছেন ‘মনে পড়ে একদা যেতাম প্রত্যহ দুবেলা বাংলাবাজারের শীর্ণ গলির ভেতরে সেই বিউটি বোর্ডিং-এ পরস্পর মুখ দেখার আশায় আমরা কজন’। ১৯৫৭ সাল থেকে ৬২ সাল পর্যন্ত এখানে বসেই লেখালেখি করতেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক।

প্রতিষ্ঠানটিকে টিকিয়ে রাখতে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সদস্য হিসেবে সরকারের সহযোগিতা আশা করেন সমর সাহা। তাছাড়া এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানেও ওপর ভূমিদস্যুদের চোখ পড়েছে জানিয়ে এ বিষয়েও সরকারের সুদৃষ্টি চেয়েছেন তিনি।
সমর সাহা বলেন, “স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমাদের এখানে ১৭ জন শহীদ হয়েছে, আমরা শহীদ পরিবারে সন্তান। এই করোনাভাইরাসের পরিস্থিতিতে কেউ কোনো দান, অনুদান আমাদের দেয়নি। বিউটি বোর্ডিংকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের সাহায্য দরকার। সরকার যেন আমাদের দিকে একটু সুদৃষ্টি দেয় সেটা আপনাদের মাধ্যমে জানাতে চাই।

“কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি বিউটি বোর্ডিং নিয়ে খেলা করছে। এটা নিয়ে মামলা চলছে, এখানে যেন কারও কুদৃষ্টি না পড়ে সেদিকে যেন সরকার দৃষ্টি রাখে। বিউটি বোর্ডিংয়ের ঐতিহ্য যেন হারিয়ে না যায়, কেউ যেন কোনো ক্ষতি করতে না পারে।”

বিডিনিউজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.