ছাইয়ে সংসার

‘ছাই লাগব ভাই, ছাই? ছাই লাগব আপা, ছাই? তিন পট ১০ টাকা, ছাই নেন ছাই, ১৫ পট ৫০ টাকা, দুই পট ফ্রি, ছাই, ছাই। ছাই লাগব আপা ছাই? তিন পট ১০ টাকা’- মাথায় বস্তা নিয়ে রাজধানীর পূর্ব জুরাইন আদর্শ স্কুলের গলিতে উচ্চস্বরে এভাবে ক্রেতাদের জানান দিচ্ছিলেন ছাই বিক্রেতা নারী।

বয়স তার ৫০ এর কাছাকাছি। বিক্রেতার এমন হাঁকে সাড়া দিতে পেছন থেকেই ডেকে থামালেন এক ক্রেতা। বস্তা নামিয়ে গলির মুখে বসে- ‘কয় পট দেব’? ছয় পট চাইলেন ওই ক্রেতা। কিন্তু তিনি পটের পর পর দিয়েই যাচ্ছেন। ১৫ পট দিয়ে বললেন, সঙ্গে আরও দুই পট দিলেন। বললেন দুই পট বেশি দিয়েছি, নিয়ে যান। সব সময় তো পাবেন না। বেশি করে নিয়ে রাখেন। অনেক দিন চলে যাবে। ক্রেতাও না করলেন না। ৫০ টাকা দিয়ে নিয়ে নিলেন।

জানতে চাইলে জীবন নামের ওই ক্রেতা বলেন, মাঝে মাছ কিনে বাসায় আনার পর ছাইয়ের জন্য খুব বিপদে পড়ি। বাসায় ছাই ছিল না। মাছ কাটতে খুব অসুবিধা হয়েছে। পরে বিভিন্ন স্থানে খুঁজেছি। মাঝে বাসার সামনের দোকানদার ভাই বললেন, মাঝে মাঝে ছাই নিয়ে আসে। আসলে তাকে রাখতে বলেছিলাম। কিন্তু তারপর আর না আসায় তিনিও রাখতে পারেননি।

এরই মধ্যে আরেক নারী ক্রেতা এলেন নিতে। তিনিও ৫০ টাকার নিলেন। তাকে মেপে দিতে দিতে আরো তিন চারজন নারী ক্রেতা চলে এলেন। এর মধ্যে এক নারী জানান, মাছ কাটতে গেলে পিছলে যায়। কিন্তু ছাই দিয়ে ধরলে আর পিছলায় না। এছাড়া আরও অন্য কাজেও ছাই লাগে।

ছাই বিক্রি সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চাইলে এবং ছবি তুলতে দেখে এই নারী বিক্রেতা একটু বিব্রত হন। ফেসবুকে ছবি বা তার ভিডিও না দেওয়ার অনুরোধ জানান। তিনি ছাইয়ের ব্যবসা করেন- আত্মীয়স্বজন জানলে, তার সম্মান থাকবে না। গরিব হলেও তারও সম্মান আছে।

এই বিক্রেতা জানান, ১০ থেকে ১২ বছর ধরে তিনি এই ব্যবসা করে আসছেন। ছাই বিক্রি করে তার সংসার চলে। সংসারে সদস্য ৫ জন। স্বামী উপার্জন করেন না। ছেলেটা একটা মিলে রাতে কাজ করে। তিনি বলেন- ছেলেটা যদি দিনে কোথাও কাজ পেত খুব ভালো হতো।

তিনি জানান, তিনি যে ছাই বিক্রি করেন এই ছাই আসে মুন্সীগঞ্জের বিভিন্ন চাল কল থেকে। এগুলো তুষের ছাই। মুন্সীগঞ্জ ছাড়া অন্যান্য জায়গার চাল কল থেকে রাজধানীতে ছাই আসে। তিনি ছাই পাইকারি কিনেন ডেমরার এক পাইকারি ব্যবসায়ীর কাছ থেকে। তিনিই মূলত মিল থেকে ছাই কিনে ঢাকায় এনে খুচরা বিক্রি করেন।

প্রতিদিন ভোরে ৬টার দিকে বাসা থেকে বের হন। ডেমরা থেকে কিনে নাশতা করে তারপর বিক্রি করতে বেরিয়ে পড়েন। শুধু তিনি নন; তার মতো আরও অন্তত ৪০ থেকে ৫০ জন নারী শহরের গলিতে হেঁটে হেঁটে ছাই বিক্রি করেন। তিনি বলেন, এভাবে হেঁটে হেঁটে বিক্রি করা খুবই কষ্টকর। সপ্তাহে ৫ দিন বিক্রি করতে বের হন। দিনে ৪০০ টাকার মতো আয় হয়।

করোনা আসার আগে ছাইয়ের দাম একটু কম ছিল। তখন ৪ পট বিক্রি করতেন ১০ টাকায়। এখন পাইকারি অনেক বেশি টাকা দিয়ে কিনতে হয়। সেজন্য এখন ৩ পট ১০ টাকায় বিক্রি করেন। করোনার কারণে এখন বিক্রিও কম হয়। সবদিন বিক্রিও খুব একটা হয় না। মাথায় বস্তা নিয়ে সারা শহরে হাঁটতে হাঁটতে পিঠ লেগে আসে। পা সামনে এগোতে চায় না। বয়স হয়েছে, আর কতদিন পারবেন তা নিয়ে রয়েছেন অনিশ্চয়তায়। তার বক্তব্য, ছাই বিক্রি করে জীবন কোনো রকম চালিয়ে নিচ্ছেন। কিন্তু এভাবে জীবন চালানো কষ্টকর …

খোলা কাগজ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.