সাংবাদিকদের ওপর দায় চাপানোর যুক্তি কী

রাহমান মনি: সম্প্রতি দেশব্যাপী তোলপাড় ঢাকার অভিজাত এলাকার গুলশানে ঘটে যাওয়া একটি অনাকাক্সিক্ষত অনভিপ্রেত একটি ঘটনাকে নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। এই বিশ্লেষণে অনেকটাই এগিয়ে আছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। বিশেষ করে ফেসবুক। ফেসবুক ব্যবহারকারী বিশেষজ্ঞগণ মূল প্রতিপাদ্য অর্থাৎ আত্মহত্যা বা হত্যাকা- যা-ই হোক না কেন এই বিষয়ে মূল ঘটনা উদঘাটনে যতটা না সোচ্চার বা আন্দোলন করছে তার চেয়েও সমালোচনা করছে সাংবাদিকদের। এই বুঝি পেয়েছি এবার সুযোগ, হাতছাড়া করা যাবে না। অনেকটাই ব্যক্তি আক্রোশ চরিতার্থ করার মতো।

তাদের এই আক্রমণ পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর।

ফেসবুক ব্যবহারকারী বিশেষজ্ঞদের কাছে সবিনয়ে জানতে চাই, সামাজিক মাধ্যমে গুলশানের অভিজাত ফ্ল্যাট থেকে কলেজছাত্রী মোসারাত জাহান মুনিয়ার লাশ উদ্ধার, রাতে থানায় মামলা, জিডির কপি বা এই জাতীয় তথ্যগুলো আপনারা কোথা থেকে সংগ্রহ করেছেন? গুলশান থানা পাঠিয়েছে? নাকি মুনিয়ার বোন তানিয়া দিয়েছেন? নাকি, বসুন্ধরা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সায়েম সোবহান আনভীর নিজে কিংবা মোসারাত জাহান মুনিয়া মর্গ থেকে নিজেই সরবরাহ করেছিলেন? নিশ্চয়ই কোনো না কোনো সংবাদকর্মীই সংগ্রহ করেছেন এবং প্রচার করেছেন। যদি তাই হয়ে থাকে তবে কেন ব্যর্থতার দায় পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর বর্তাবে?

বাংলাদেশে যেকোনো ঘটনা ঘটলেই দুইটি বিভাগের ওপর ব্যর্থতার দায় চাপানো খুবই সহজ এবং চাপানোও যায়। তার একটি হলো পুলিশ বিভাগ এবং অপরটি হলো সাংবাদিক সমাজ। আর এই দুই ক্ষেত্রই ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক সময়ই জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তাদের কাজ করতে হয়।

আর, এই দুইটি ক্ষেত্র চূড়ান্ত বিচারের প্রাথমিক কাজগুলো করে থাকে। সাংবাদিকরা ক্লু বা অন্যায়, অনৈতিক কাজের তথ্য উপাত্ত দিয়ে খোঁজ দিয়ে থাকে, পুলিশ সে কাজের তদন্ত করে প্রতিবেদনের ওপর বিচার কাজের অনেকটাই সম্পন্ন করা হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রভাবশালীরা এই দুই ক্ষেত্রেই অর্থ, শক্তি কিংবা ভয়ভীতি দেখিয়ে তাদের নিজেদের অনুকূলে কাজ করিয়ে থাকেন। তাই, বদনামটাও কম নয়। কিন্তু তাই বলে কি সবাই বা পুরো বিভাগ দায়ী থাকবে?

একজন সংবাদকর্মী হিসেবে মনে করি আমার মতো কোনো এক সংবাদকর্মী ভাই-ই জিডির কপি প্রকাশ করে তার প্রাথমিক কাজটি সম্পন্ন করেছেন। চলমান পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশ তার কাজগুলো করে যাচ্ছে। পরবর্তী সময়ে বিচার বিভাগ তথ্য-উপাত্ত, পুলিশের প্রতিবেদন এবং সাক্ষী ও আইনজ্ঞদের যুক্তিতর্কের ভিত্তিতে রায় প্রকাশ করবেন।

এখানে প্রশ্ন উঠতে পারে, সবগুলো মিডিয়ায় কেন ফলাও করে আনভীর নামটি প্রচার করা হলো না? আরে ভাই, সব মিডিয়াতে একসঙ্গে প্রচার পেলেই কি বিচারকার্য সম্পন্নে কোনো সুবিধা আদায় করা যাবে?

বসুন্ধরা গ্রুপ পরিচালিত মিডিয়াতে ঘটনাটি প্রচার পায়নি। এর দায় সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকগণ এড়াতে পারেন না একথা ঠিক। তবে এটাও তো মেনে নিতে হবে, কর্মক্ষেত্রে তাদের স্বাধীনতা কতটুকু! আপনি হলে কী করতেন? পারতেন, মালিকের বিপক্ষে যায় এমন কোনো তথ্য প্রকাশ করতে? চাকরির মায়া কি আপনার নেই?
মালিকের বিপক্ষে লিখলে কি তার চাকরি থাকবে? আর, ঝুঁকি নিয়ে চাকরি হারালে সমাজ তথা সমালোচকরা কি তার দায়িত্ব নেবেন? পারবেন তার কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র সৃষ্টি করে দিতে? জানি পারবেন না। তবে কেন তাদের চৌদ্দগোষ্ঠী উদ্ধার করছেন?

আমি মুনিয়া কিংবা আনভীরের পক্ষে বা বিপক্ষে কিছু বলতেও চাই না, কোনো রায়ও দিতে চাই না। শুধু বলতে চাই, কিছু সংখ্যক সাংবাদিকের দায় পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর চাপিয়ে দিয়ে ব্যক্তি আক্রোশ ঝেড়ে হীন স্বার্থ উদ্ধার করবেন তা তো হতে পারে না।

অন্যের সমালোচনা করবেন, করেন আপত্তি নেই। সে অধিকার আপনার রয়েছে। একইভাবে সে সমালোচনা কতটুকু যুক্তিযুক্ত এবং একক কিংবা কিছু সংখ্যক লোকের দায় ঢালাওভাবে পুরো সমাজ বা জাতির ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় কিনা সে বিষয়েও তো বিবেচনায় থাকতে হবে। তাই নয় কি?

একজন সংবাদকর্মী হিসেবে আমিও এই অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার সুষ্ঠু বিচার চাই। মুনিয়া কিংবা আনভীর পক্ষ কিংবা বিপক্ষ হয়ে নয়। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে।

পক্ষে কিংবা বিপক্ষে অনেক কথাই বলা যায়। এই বিতর্কের শেষ নেই।

রাহমান মনি : জাপান প্রবাসী সাংবাদিক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.