বাসায় গৃহকর্মীর প্রতি মানবিক হওয়াটা জরুরী

রাহমান মনি: প্রাচীনকাল থেকে বাড়িঘরে কাজের সুবিধার্থে গৃহকর্মী নিয়োগ দেওয়ার প্রচলন রয়েছে। আধুনিককালে গৃহকর্মীর কাজের ধরন পরিবর্তিত হলেও অনেক কিছুই আগের মতোই রয়েছে। অনেক শিক্ষিত মানুষই গৃহকর্মীর সঙ্গে অন্যায়, অমানুবিক, অবিচার-নির্যাতন করে। অথচ শান্তির ধর্ম ইসলামে এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

গৃহকর্মী নিয়ে কিছু বলতে গেলে প্রথমেই জানতে হবে গৃহকর্ম বলতে কি বুঝায় ?

জাতীয় গার্হস্থ্য নারী শ্রমিক ইউনিয়ন এর পরিচালনায় ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি, ২০১৫’ (গৃহশ্রমিকের অধিকার, দায়িত্ব ও মর্যাদার সার সংক্ষেপ) এর সংজ্ঞা অনুযায়ী “গৃহকর্ম” বলতে রান্না-বান্নাসহ সংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক কাজে সহায়তা, বাজার করা, গৃহ বা গৃহের আঙ্গিনা বা চত্বর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং গৃহের অন্যান্য যা সাধারনত; গৃহাস্থলি কাজ হিসেবে স্বীকৃত। এ ছাড়াও পোশাক-পরিচ্ছদ ধোঁয়া, গৃহে বসবাসরত শিশু, অসুস্থ, প্রবীণ কিংবা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির যত্ন ইত্যাদি কাজও গৃহকর্ম হিসেবে বিবেচিত হবে।

এখন জানা যাক ‘গৃহকর্মী’ কাকে বলে ? একই নীতিমালায় “গৃহকর্মী” বলতে এমন কোন ব্যক্তিকে বোঝাবে যিনি নিয়োগকারীর গৃহে মৌখিক বা লিখিতভাবে খন্ডকালীন, চুক্তিভিত্তিক অথবা পূর্ণকালীন নিয়োগের ভিত্তিতে গৃহকরম সপাদন করে। এ ক্ষেত্রে মেস বা ডরমিটরি গৃহ হিসেবে বিবেচিত হবে।

কিতাব কিংবা নীতিমালায় যতোই নীতিবান বাক্য থাকুক না কেন, আমাদের দেশে গৃহকর্মী নিয়োগ দেয়ার পদ্ধতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারন গৃহকর্মে নিয়োগদানে গুটি কয়েক এজেন্সি বা সংগঠন গড়ে উঠলেও আমাদের দেশে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই নিয়োগ হয় পরিচয় সুত্রে একে অন্যকে পরিচিত করে দেয়ার মাধ্যমে কিংবা গ্রামের অভাবী মানুষ গুলোকে ধোঁকা দেয়ার মাধ্যমে।

ধোঁকা দেয়া বলতে বছরান্তে কিংবা কালে ভদ্রে শহরের বসবাসকারী ধনীলোকগুলো গ্রামে গিয়ে অথবা তাদের নিজেদের লোকজনের মাধ্যমে সন্তানের জন্য ‘খেলার সাথী’ আখ্যা দিয়ে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে একই সাথে স্কুলে ভর্তি করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সন্তানসম বয়সী, অপেক্ষাকৃত ছোট কিংবা বড় একটি শিশুকে শহরে এনে গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োগ দেয়ার নামে দাস বানিয়ে রাখেন।

এভাবেই বাংলাদেশে প্রায় সমবয়সী শিশুর কাছে আরেকটি শিশুকে দেখভালসহ পরিবারের অন্যান্য কাজের দায়িত্ব দেন। বাচ্চার সঙ্গে খেলার জন্য আনা হলে তো বাচ্চাকে কোলে নেওয়ার দায়িত্ব তার হতে পারে না। কারণ, সে নিজেই শিশু। তারপরেও সারাদিন শিশুটি অনাহারে কিংবা অর্ধাহারে হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করার পরও কাজ যদি একটু এদিক-ওদিক হয়, তাহলে শারীরিক নির্যাতন সহ গৃহকত্রীর বিভিন্ন নিপীড়নের শিকার অহরহ একটি ঘটনা ।

রেজিস্ট্রেশন করা হয় না বলে এবং গৃহশ্রমিক হিসেবে কোনো পরিচয়পত্র বা নিয়োগপত্র থাকে না বলে ঠিক কতজন, কোথায় কাজ করছেন, এটাইতো জানা যায়না। আর সেই কারণেই জানা যায় না মোট কতো জন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। পত্রপত্রিকাতে যেকয়টা নিউজ হয়ে স্থান পায়, আমরা কেবল তাইই জানতে পারি। বাংলাদেশে গৃহকর্মী হিসেবে সবচেয়ে বেশি নিয়োগপ্রাপ্ত এবং নির্যাতিত হয় বয়ঃসন্ধিকালের মেয়েরা।

যদিও বাংলাদেশের বেশির ভাগ গৃহকর্মীর জন্য কোনো ধরনের কর্মঘণ্টা নির্ধারিত নেই। পরিবারের সকলের ঘুম থেকে ওঠার আগে এই গৃহকর্মীদের উঠতে হয় এবং তারা ঘুমাতে যান সবাই ঘুমানোর পর। আন্তর্জাতিক শ্রম আইন অনুযায়ী আট ঘণ্টা কাজ করার নিয়মের বালাই নেই গৃহকর্মীদের জন্য। নেই কোনো ন্যূনতম বেতনকাঠামো। যদিও সম্প্রতি বেতনের নামে বাংলাদেশে গৃহকর্মীদের কিছুটা পারিশ্রমিক উভয় পক্ষের মৌখিক সম্মতিতে নির্ধারণ করা হলেও সেই অর্থ গৃহকর্মীদের কোন কাজেই আসে না। চলে যায় অভিভাবক নামের মুরব্বীদের হাতে। আর সেই অর্থ মুরব্বীদের সংসারের অভাব অনটনের ঘানি টানতেই ব্যয় হয়ে যায়।

একজন গৃহকর্মী বিশেষ করে মেয়ে গৃহকর্মী সময় এবং চাহিদামতো বাড়ীর সবার জন্য খাবার প্রস্তুত করলেও সবার সঙ্গে এবং একই খাবার তার ভাগ্যে জোটে না। জোটে সবার খাওয়া শেষে এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই উচ্ছিষ্ট। ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। তবে শতকরা হিসেবে খুবই নগণ্য বলা যায়।

সবাই যখন খাবার টেবিলে বসে আহার পর্ব সারতে থাকেন গৃহকর্মী ব্যস্ত থাকেন সবার চাহিদা মেটাতে, এটা সেটা’র যোগান দিতে। চেয়ার খালি থাকলেও স্থান হয়না তার সবার সাথে বসে খাওয়ার। অথচ এই গৃহকর্মীটি পরিবারেরই একজন এবং রান্না-বান্নাসহ ঘরের কাজে তার অবদান অনেকের চেয়েও বেশী

একজন গৃহকর্মী বাড়ীর আলিশানসম বিভিন্ন রুম এবং বিছানা পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্বে থাকলেও তিনি থাকেন বাড়ীর সবচেয়ে অবহেলা এবং অযত্নে থাকা একটি বিছানায়। তাতে একটি হোগলা, তেল চিটচিটে একটি বালিশ এবং কাঁথা। এর বেশী কিছুই নয়। অনেক সময় তাও জোটেনা। রান্না ঘর, বারান্দা, ড্রইং রুমে কিংবা ডাইনিং রুমের মেঝেতে থাকতে হয় তাকে।

নিজ সন্তানের চেয়েও ছোট কিং বা বড় অথবা সমবয়সী একজন গৃহকর্মী তার সন্তানের সব কাজই করে দেয়ার পরও গালমন্দ তার নিত্য দিনের সাথী। খেলার সাথী হয়ে থাকা তো দূরের কথা তুই তোকারি সম্বোধন সহ উপরি হিসেবে ছোট্ট দেহে দু’চার ঘা।

সম্প্রতি গৃহকর্মীদের ওপর, বিশেষ করে শিশু গৃহকর্মীদের ওপর অত্যাচার অনেক বেড়েছে। অত্যাচারের সীমা পরিসীমা নেই। মাঝে মাঝে ইহধামও ত্যাগ করতে হয়। ত্যাগ করানো হয়।

রেজিস্ট্রেশন করা হয় না বলে এবং গৃহশ্রমিক হিসেবে কোনো পরিচয়পত্র বা নিয়োগপত্র থাকে না বলে ঠিক কতোজন, কোথায় কাজ করছেন, এটাইতো জানা যায়না আমাদের সমাজে। আর সেই কারণেই জানা যায় না কতোজন নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। বাংলাদেশে গৃহকর্মী হিসেবে সবচেয়ে বেশি নিয়োগপ্রাপ্ত এবং নির্যাতিত হয় বয়ঃসন্ধিকালের মেয়েরা।

তাই, কোনোরকম অধিকার ছাড়া গৃহশ্রমিকের এই জীবনটাকে দাসত্বের অন্ধকার জীবন বলা যায়। অনেক গৃহকর্মী মার খেয়ে পালাতে গিয়ে বিভিন্ন দুর্ঘটনার কবলে পড়ে, পাচারকারী বা খারাপ মানুষের খপ্পরে পড়ে ছেলেরা ভিক্ষাবৃত্তি এবং মেয়েরা যৌন ব্যবসায় চলে যেতে বাধ্য হয়।

আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে পালিয়ে যাওয়া এসব গৃহকর্মীর বিরুদ্ধে বেয়াদবি, আসবাবপত্র চুরি, অসদ আচরণ ইত্যাদি সহ থানায় নানারকম অভিযোগ দায়ের সহ কিছু কিছু ক্ষেত্রে সন্ধান চেয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তিও দেখা যায় ।

যদিও প্রায়শই গৃহকর্মী নির্যাতনের সংবাদ পত্রিকা মারফত জানা যায়, বাস্তবে কিন্তু এর চেয়েও বেশি গৃহকর্মী নির্যাতিত হচ্ছে প্রতিদিন। অধিকাংশ নির্যাতনের ঘটনার কোনো মামলা ও বিচার হয় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মামলা হলেও, যেহেতু গৃহকর্তারা পয়সাওয়ালা ও ক্ষমতাশালী, তাই চাপ দিয়ে কিংবা আর্থিক লেনদেন এর মাধ্যমে কিংবা সালিস করে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করা হয়।

এসব থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আমাদেরকে আরো মানবিক হতে হবে। গৃহকর্মীকে সংসারের একজন সদস্য হিসেবে গ্রহন করলে এমনটি হওয়ার কথা নয়। প্রয়োজনে মানুষকে মানবিক হতে বাধ্য করতে হবে। কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে বা কাজ পছন্দ না হলে তাকে বিদায় দিয়ে দেয়া উচিত। গৃহকর্মীদের প্রতি ভালো ব্যবহার করা, ঠিকমতো খাওয়া, কাপড়, চিকিৎসা, বিশ্রাম এবং সর্বোপরি তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তাদেরকে যৌন হয়রানির হাত থেকে রক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সুন্দর আচরণের বিকল্প নেই। যাদের আচরণ সুন্দর ও মাধুর্যপূর্ণ, তাদের অন্যরা পছন্দ করে। সর্বাবস্থায় তাদের পাশে থাকে। কিন্তু যাদের আচরণ অসুন্দর; মানুষ তাদের বুকভরে ঘৃণা করে। যদিও সাময়িক কোনো স্বার্থ কিংবা বিশেষ কারণে অসন্তোষ গোপন রাখে।

তাই ২০০০ সালের মার্চ মাসে প্রতিষ্ঠা পাওয়া গৃহশ্রমের স্বীকৃতি ও গৃহশ্রমিকের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যান প্রতিষ্ঠার দাবীতে দীর্ঘ ১৫ বছর লড়াইয়ের ফল ‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি, ২০১৫’। https://idwfed.org/en/affiliates/asia-pacific/national-domestic-women-workers-union/ndwwu-education-booklet.pdf বাস্তবায়ন করা।

যদিও এটি কোন আইন নয়, তথাপি নীতিমালায় গৃহকর্মীদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার, তাঁদের বেতন-ভাতা ঠিকমতো পরিশোধ, নির্যাতন না করা, শারীরিক ও মানসিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ভরণপোষণ, ছুটি ও প্রণোদনাসহ আরও সুবিধাদির কথা স্পষ্ট করে বলা আছে। আরও বলা হয়েছে, অসুস্থ সময়ে গৃহকর্মীদের কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে এবং তাঁর চিকিৎসার সব দায়িত্ব থাকবে নিয়োগদাতার।

তাই সংশ্লিষ্টদের কাছে বিশেষ অনুরোধ, শিঘ্রই গৃহকর্মী সুরক্ষা এ কল্যাণনীতিটি আইন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হোক। হয়তো তাতেও থামবে না নিপীড়ন; তবু কিছুটা আস্থার জায়গাও তৈরি হবে।

আইনটি প্রতিষ্ঠা পেলে একটু খাবারের আশায় সন্তানসম গৃহকর্মীর হাড়-মাংস খুলে যাবে না, চামড়ায় ছেঁকা খাওয়া দগদগে ক্ষত নিয়ে মুখ বুঝে সহ্য করে বেচে থাকতে হবে না।

শুরুটা করেছিলাম শান্তির ধর্মে গৃহকর্মীর উপর অমানুবিক আচরন না করার কথা দিয়ে। বাস্তবতার বিচারে গৃহকর্মীরা নির্ভুল থাকে না। কখনো না কখনো ভুল হয়েই থাকে। কাজের ক্ষেত্রে তাদের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। এতৎসত্ত্বেও রাসুল (সা.) তাদের ভুলত্রুটিগুলোর দিকে নজর দিতেন না। বরং তাদের দুর্বলতাগুলো ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতেন। গৃহকর্মী কোনো কারণে ভুল করলে ইসলাম শুধরে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। রাসুল (সা.) এর দৃষ্টান্ত ও উপমা রেখে গেছেন। গৃহকর্মীর প্রতি প্রিয় নবী (সা.)-এর ক্ষমা ও সহনশীলতা সম্পর্কে সাহাবি আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, ‘আমি দশ বছর ধরে রাসুল (সা.)-এর খেদমত করেছি। আল্লাহর কসম! তিনি কোনো দিন আমাকে বকা দেননি। কোনো দিন উফ্ বলেননি। কখনো বলেননি, এ কাজটি কেন করেছো ? এ কাজটি কেন করোনি ?’ (বুখারি, হাদিস : ৬৪৩০)

rahmanmoni@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.