শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনা হউক

রাহমান মনি: শিক্ষার্থী ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একে অন্যের পরিপূরক হলেও শিক্ষার্থীর প্রয়োজনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (স্কুল, কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা পায়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনে শিক্ষার্থীর জন্ম হয় না।

“যে নিয়মিত লেখাপড়া করে এবং শেখার প্রতি আগ্রহী ও যত্নশীল থাকে তাকে শিক্ষার্থী বলা হয়”। একজন শিক্ষার্থী, তা যেকোন বয়সেই হতে পারা যায়।

জনগণের উদ্দ্যেশ্যে নিয়োজিত কোন শিক্ষা প্রদান ও শিক্ষণ কেন্দ্র, সংস্থা বা কর্পোরেশন বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু শিক্ষা গ্রহনের যে কোন প্রতিষ্ঠানকেই শিক্ষার্থীদের স্কুল কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয় বলা যাবে না। যদিও শিক্ষা গ্রহনের ক্ষেত্র বা ব্যপকতা বিশাল।

স্কুল একটি শিশুকে শুধু লেখাপড়াই শেখায় না, বরং তাকে একতাবদ্ধ, শৃঙ্খল ও সামাজিক হতেও শেখায়। সেখানে হৈ-হল্লা, ছুটোছুটি করে তাদের শারীরিক মানুষিক বিকাশও ঘটে।

কিন্তু করোনার কারন দেখিয়ে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ রাখার কারণে শিশুরা বাড়ি থেকে বের হওয়ার বা অন্যদের সঙ্গে মেশার সুযোগ একদমই পাচ্ছে না। একাকীত্ব থেকে দিন দিন অসামাজিক হয়ে উঠছে। বিশেষ করে কোমলমতি ও বয়ঃসন্ধিকালের শিক্ষার্থীরা।

২০২০ সালের ৮ মার্চ মাসে বাংলাদেশে প্রথম করোনা সনাক্ত করা হয়। ১৭ মার্চ ২০২০ দেশে প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা আসে। সরকার বেশ কয়েক দফায় স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় খোলার বিষয়ে বিবেচনা করলেও দেশে মহামারি পরিস্থিতির কারণে সেটা আর সম্ভব হয়নি। বরং দফায় দফায় বন্ধ থাকার মেয়াদ বেড়েছে।

স্কুল বন্ধ থাকার কারণে চার দেয়ালের মাঝে বন্দি হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীরা বিশেষ করে নগর ও শহরাঞ্চলের শিশুরা। গ্রামাঞ্চলে শিক্ষার্থীরা কিছুটা হৈ-হল্লা করতে পারলেও স্থান (খেলার মাঠ) স্বল্পতার কারনে শহরের শিশুরা তা পারছে না।

ফলে দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় শিশুদের শারীরিক ও মানুষিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। বন্দি এ সময়ে শিশুরা মোবাইল ও ইন্টারনেটে আসক্ত হয়ে পড়েছে। মোবাইল বা টিভি নিয়ে হয় তারা ঘরের এককোণে পড়ে থাকছে। আর সেগুলো না পেলে ঘরের ভেতর এতটাই দুরন্তপনা করছে যে, তাদের শান্ত রাখতে অভিভাবকরা বাধ্য হয়ে হাতে ডিভাইস তুলে দিচ্ছেন। বিভিন্ন পার্ক এবং বিনোদন কেন্দ্রগুলো মহামারিতে বন্ধ থাকায় অভিভাবকরা শিশুদের সেখানেও নিয়ে যেতে পারছেন না।

একটি শিশু প্রকৃতিগতভাবে নিদিষ্ট প্রক্রিয়া শেষে শিক্ষাঙ্গনে পদার্পণ করবে এটা তার জন্মসূত্রে রাষ্ট্রীয় মৌলিক অধিকার। তার স্বপ্ন। এই স্বপ্ন পূরণে সে নানা স্বপ্নও দেখা শুরু করে, মনের মধ্যে নানান রঙিন স্বপ্ন আঁকে। সরকারই সে অধিকার পূরণে সার্বিক ব্যবস্থা নিবে। এটাই রাষ্ট্র ধর্মের নিয়ম। এইশিশুদের অভিভাবকদের করের অর্থেই রাষ্ট্র চলে।

একজন মা একটি শিশুর প্রথম এবং আজীবন শিক্ষক। তা সত্বেও একটি শিশু শিক্ষার্থী কিন্তু তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকের কথাই বেশী শুনে এবং বিশ্বাসও করে। ভুল শুদ্ধ শিশুরা বুঝে না, খুঁজেও না। তারা জানে স্যার/ম্যাডাম যা বলছে তাই সঠিক, শিশুদের কাছে আইডল তারা।

কল-কারখানা, বাজার-হাট, বিপণিবিতান, যানবাহন সবই যদি খোলা থাকতে পারে তবে কেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হচ্ছে না ? শিক্ষাকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। আজ পুরো শিক্ষাখাত একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি জানান যে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ার কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর চলমান ছুটি ১২ই জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সব কিছুই যেখানে স্বাভাবিকভাবে চলছে সেখানে কেবলমাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে করোনা মোকাবেলা কতোটা যুক্তিযুক্ত এবং প্রাসঙ্গিক ?

বিশ্বের অন্যান্য দেশের কথা সবটা জানা না থাকলেও জাপানে থাকার সুবাদে জাপানের কথা মোটামুটি জানা।

জাপানে করোনার তৃতীয় ঢেউ প্রায় শেষের পথে। বেশী আক্রান্ত শহর গুলোতে চলছে জরুরী অবস্থা। অনেক কিছুই বন্ধ করে দেয়া হয়েছে জরুরী অবস্থা চলাকালীন সময়ের জন্য। আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়েছে। দফায় দফায় জরুরী অবস্থার মেয়াদ এবং পরিধি বাড়ানো হলেও কিন্তু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়নি। বিনোদন কেন্দ্র গুলো বন্ধ রাখা হলেও শিক্ষার্থীদের বার্ষিক ক্রীড়ার আসর গুলো নিয়মিতভাবেই পালিত হচ্ছে। তবে সব কিছুই নিয়মতান্ত্রিকভাবে এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনেই।

বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে নাকি অনলাইনে শিশুদের ক্লাস নেয়া হচ্ছে। হাস্যকর-ই বটে। যে দেশের অধিকাংশ মানুষ ইন্টারনেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত। সেদেশে শিশুদের অনলাইনে ক্লাস !

বলা হয়, ইন্টারনেট সুবিধা থেকে বঞ্চিত হলেও মোবাইল ফোনের সুবিধা রয়েছে। মোবাইল ফোনের মাধ্যমে অনলাইন ক্লাস করবে তাতে অসুবিধা কোথায় ? এতে করে শহরে কিছু শিক্ষার্থী অনলাইনে ক্লাস করার সুযোগ পাচ্ছে কিন্তু গ্রামগঞ্জের শিক্ষার্থীরা কোনো ক্লাস করার সুযোগ না পেয়ে ঝরে পড়ছে। এতে করে শিক্ষাখাতে বৈষম্য বাড়ছে।

এছাড়া অনলাইনে ক্লাসের নামে শিশু-কিশোররা সহজেই প্রযুক্তির ব্যবহারের সুযোগ পেয়ে গেছে। এতে করে বিভিন্ন গেইম, ফেসবুক এসবে তাদের আসক্তি বাড়ছে। মেধার সঠিক ব্যবহার হচ্ছে না।

তর্কের খাতিরে ধরে নিয়ে অনলাইন ক্লাস দুধের স্বাদ না হয় ঘোলে মিটানো গেল। বাকীগুলো ?

স্কুল তো একটি শিশুকে শুধু লেখাপড়াই শেখায় না, বরং তাকে একতাবদ্ধ, শৃঙ্খল ও সামাজিক হতেও শেখায়। স্কুলে হৈ-হল্লা, ছুটোছুটি করে তাদের শারীরিক মানুষিক বিকাশও ঘটে।

অত্যন্ত স্বাস্থ্য সচেতন এবং জনগনের প্রতি দায়বদ্ধ জাপান সরকার কিন্তু করোনাকালীন সময়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা রেখেছে। শিশুদের ছুটোছুটি শিক্ষা প্রাঙ্গন কোলাহর মুখরিত করে রাখে। দেখে বুঝার উপায় নেই যে এই জাপানও করোনার ছোবলে পড়ে স্থবির হয়ে আছে। নিয়ন্ত্রনে আনার জন্য সরকারকে জরুরী অবস্থা জারী করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।

অযোগ্য লোককে যোগ্য পদে বসালে যে তার পরিনাম কি হয় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়-এ বসানো দুইজন মন্ত্রীর তথাকথিত সফলতা (?) উদাহরন হয়ে থাকবে। কে জানে, হয়তোবা ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উদাহরন হিসেবে এদের নাম।

সর্বজন শ্রদ্ধেয় বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের এমিরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী স্যারের মতে- দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা মাদক এবং প্রযুক্তির নেতিবাচক দিকে আসক্ত হয়ে পড়ছে। যা আমাদের জন্য ভয়ঙ্কর ব্যাপার। একটা জেনারেশন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে না দিলে তারা এভাবে ঘরে বসে বসে শারীরিক ও মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যাবে। এখন যে ভয়ানক মাদকের কথা শোনা যাচ্ছে তাতে আসক্ত হয়ে একজন ছাত্র নিজেই নিজের জীবন শেষ করে ফেলেছে। এটা তো অবিশ্বাস্য। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে রেখে মাদক ও প্রযুক্তির নেশাকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। শিক্ষাখাতকে কোনো গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মনে করেন, সরকারকে শিক্ষাখাতকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার বিষয়ে বিবেচনা করতে হবে।

একটি শিশু বাসায় বসে অটো প্রমোশন নিয়ে তার শিক্ষা জীবন পার করতে চায়না। এটা তার জন্য মঙ্গলজনকও নয়।

শিক্ষকদেরও যেন এ ব্যাপারে কোন মাথা ব্যথা নেই। কারন, তাদের তো কোন অসুবিধা নেই। বসে বসে বেতন নিচ্ছেন। কোন নৈতিকতা থেকে তারা বসে বসে বেতন নিচ্ছেন তারাই ভালো জানেন।

তবে একথা ঠিক, স্কুল বন্ধ থাকার কারনে যদি তাদের বেতন বন্ধ থাকতো তাহলে স্কুল খুলে দেয়ার জন্য নিজেরা আন্দোলন তো করতেনই, এমন কি কোমলমতি শিশুদেরও আন্দোলনে নামিয়ে দিতেন। এতে করে শিশুদের ক্ষতি হলেও তাদের কিছুই যেতো আসতো না। স্বার্থ আদায় বলে কথা।

স্কুল খোলার ব্যপারে অভিভাবকদের পক্ষ থেকেও তেমন কোন উচ্চবাচ্য চোখে পড়ছেনা। জেনারেশন গ্যাপ হয়ে যাচ্ছে অথচ কারোর কোন উচ্চবাচ্য নেই ।

সকলের উচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যেন খুলে দেয়া হয় সেই লক্ষ্যে চাপ সৃষ্টি করা। অবিলম্বে যেনো সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক চাঞ্চল্যতা ফিরিয়ে আনে।।

rahmanmoni@gmail.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.