নির্মাণ দুর্নীতিতে গরিবের স্বপ্নভঙ্গের আশঙ্কা

মুন্সীগঞ্জে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ২০০ ঘর
৩২ মিলি টিনে ৩৬ মিলির নকল ছাপ * ১০ মিলি রডের খাঁচা ছাড়াই ঢালাই করা হচ্ছে লিংটেল
মাহবুব আলম লাবলু: বিনা মূল্যে জায়গাসহ পাকা ঘরের মালিক-এমন স্বপ্ন দেখতে কার না ভালো লাগে। তবে স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝে ফারাক অনেক। কিন্তু কে জানত দরিদ্র মানুষের সাধ আর সাধ্যের সেতুবন্ধ গড়ে দিবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের এই স্বপ্নপূরণের উদ্যোগ নেন বঙ্গবন্ধুকন্যা।

রঙিন টিনে মোড়ানো পাকা ঘরের স্বপ্ন বাস্তবায়নের এই উদ্যোগ প্রশংসাও পায়। কিন্তু দুর্নীতিবাজ কিছু মানুষের লোভের আগুনে পুড়ে অঙ্গার হওয়ার আশঙ্কায় মুন্সীগঞ্জের দরিদ্র মানুষের সোনালি স্বপ্ন। তাদের জীবনে নেমে আসতে পারে অমানিশার অন্ধকার। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসাবে তারা যে ঘর পাবেন, তা দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। এতে যে কোনো বৈরী আবহাওয়ায় তা ধসে পড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তাদের অভিযোগ-ভূমিহীন ও গৃহহীনদের পুনর্বাসন প্রকল্পের আওতায় মুন্সীগঞ্জে তৈরি করা হচ্ছে ২০০ ঘর। নকশাবহির্ভূতভাবে প্রাক্কলনের চেয়ে কম ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করায় এগুলো পরিণত হচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ আবাসস্থলে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসাবে যে ঘর দেওয়া হবে, গরিবের সেই ঘর নির্মাণে চুরি নয়, যেন ডাকাতি হচ্ছে। আর এই অসাধু তৎপরতায় স্থানীয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট জড়িত। তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ইউএনও হামিদুর রহমান।

সরেজমিন দেখা যায়, মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলার আধারা ইউনিয়নের কালিরচর (ভাসানচর) এলাকায় রাস্তার পাশেই সবুজে ঘেরা আশ্রয়ণ প্রকল্প-২। এর আওতায় ২০০ ঘর নির্মাণের কাজ চলছে। উপজেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এই কাজের তদারকি করছেন চিতলিয়া ভূমি অফিসের সহকারী নায়েব মো. শরীফ মিয়া। প্রকল্পের প্রায় ৫০ শতাংশ কাজ এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। বাকি ৫০ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পথে। এমন অবস্থায় নির্মাণকাজে অনিয়ম ও দুর্নীতির বেশকিছু তথ্য আসে যুগান্তরের হাতে। এই তথ্য ধরে অনুসন্ধানকালে বেরিয়ে আসে দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র।

প্রকল্পের নকশায় দেখা গেছে, প্রতিটি ঘরের নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ৩৬ হাজার ১৩৫ টাকা ৪৫ পয়সা। এর মধ্যে ভ্যাট-ট্যাক্স মিলিয়ে ঠিকাদারের লাভ ধরা আছে ৪৬ হাজার ৪৬ টাকা ৪১ পয়সা। এরপরও অধিক লাভের আশায় ঘর নির্মাণের প্রতিটি ধাপে নয়ছয়ের মাধ্যমে লুটপাট করা হচ্ছে। প্রাক্কলন অনুযায়ী ঘরের চালে ৩৬ মিলিমিটার বা ৩৬০ গেজ রঙিন ঢেউটিন ব্যবহারের কথা থাকলেও ব্যবহার করা হচ্ছে ৩২ মিলিমিটার বা ৩২০ গেজ। যুগান্তরের উদ্যোগে টিনের থিকনেস গেজ মেশিনে পরীক্ষা করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে।

তবে সাধারণভাবে দেখলে বোঝার উপায় নেই যে চালে ৩২ মিলিমিটার টিন ব্যবহার করা হচ্ছে। কারণ টিনের গায়ে ৩৬ মিলিমিটারের সিল রয়েছে। কিন্তু কীভাবে এটা সম্ভব? এই প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে কেচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে এসেছে। পরস্পর যোগসাজশে চট্টগ্রামের কেওয়াই স্টিল মিল থেকেই ৩২ মিলিমিটার টিনের গায়ে ৩৬ মিলিমিটার সিল দিয়ে আনার ব্যবস্থা করেছেন প্রকল্পের তত্ত্বাবধানকারী কর্মকর্তা ও মুন্সীগঞ্জ সদর উপজেলা ইউএনও হামিদুর রহমান।

তার বাড়ি চট্টগ্রামের বাঁশখালী। সেই সুবাদে চট্টগ্রামের কেওয়াই স্টিল মিল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগসাজসে ভয়াবহ এই দুর্নীতি করা হচ্ছে। মিলের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার সঙ্গে ক্রেতা সেজে এই প্রতিবেদক কথা বলেও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার এই জালিয়াতির বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন।

প্রকল্পস্থলে ঘরের টিনমিস্ত্রি মো. সুমন যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাগো যে টিন দিচ্ছে, তা লাগাই দিচ্ছি। টিনে ৩৬ মিলি সিল থাকলিও আদতে মনে অচ্ছে ২৬ মিলি। সিলের ভেতরে গ্যানজাম আছে। আমরা টিন হাতে ধরলিই বুঝতে পারি কোনডা কয় মিলি।’

যুগান্তরের উদ্যোগে গেজ মিটারে পরীক্ষার পর প্রাক্কলনের চেয়ে নিম্নমানের টিন ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। এরপর বুয়েট টেস্টের জন্য নির্ধারিত পরিমাণ নমুনা চাইলে বেঁকে বসেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদুর রহমান। এ ব্যাপারে তিনি যুগান্তরকে কোনো সহযোগিতা করেননি। উলটো এ প্রতিবেদক সম্পর্কে আপত্তিকর অভিযোগ তুলে তার মানহানি করার অপচেষ্টা করেন। কথা বলার একপর্যায়ে তিনি টিন নিম্নমানের প্রমাণিত হলে কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করবেন বলে জানান।

তবে সোমবার বিকালে প্রকল্পস্থলে সরেজমিন সাক্ষাৎ হয় ইউএনওর নিয়োগপ্রাপ্ত প্রতিনিধি রোমানের সঙ্গে। তার (রোমান) মোবাইল ফোনে কল করে ইউএনও হামিদুর রহমান এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে চান। রোমান তার ফোন সেটে ইউএনওর সঙ্গে কথা বলিয়ে দেন। ফোনে ইউএনও এই প্রতিবেদককে বলেন, প্রকল্পের কাজে কোনো অনিয়ম থাকলে সেগুলো ঠিক করবেন।

একই সঙ্গে দাবি করেন, তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রকল্পে যে অনিয়ম ছিল, সেগুলো দূর করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিঘরে প্রাক্কলনের চেয়েও প্রায় ১৫-২০ হাজার টাকা বেশি খরচ করছেন বলেও দাবি করেন তিনি। প্রতিবেদকের সঙ্গে দেখা না হওয়া পর্যন্ত তিনি অফিসে অপেক্ষা করবেন বলে জানান।

কিন্তু সরেজমিন কাজ শেষে টিনের নমুনা সংগ্রহে সহযোগিতা চাওয়ার প্রস্তাব দিলে ইউএনও ক্ষুব্ধ হন। এ ব্যাপারে প্রকল্প কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। এরপর প্রকল্প কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর আলম খানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সোমবার সন্ধ্যায় তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হয়। কিন্তু তিনি কল রিসিভ করেননি।

অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র নিয়ে প্রকল্প সম্পর্কে ওয়াকিবহাল একজন প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি যুগান্তরকে বলেন, ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য তৈরি করা এই প্রকল্পটি খুবই স্পর্শকাতর। কারণ প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় গরিবের মুখে হাসি ফোটাতে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অথচ প্রকল্প বাস্তবায়নে উপজেলা প্রশাসন নজিরবিহীন নয়ছয় করছেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ও প্রকৌশলীদের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ঠিকাদার কিংবা লেবার ঠিকাদাররা যোগসাজশে লুটপাট করছেন।

তিনি আরও বলেন, এই ঘর নির্মাণের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হচ্ছে কোনো মজবুত ভিত্তি নেই। প্রাক্কলনে দেড় ফুট পরিমাণ ইটের ১০ ইঞ্চি গাঁথুনি দেওয়ার কথা থাকলেও বেশির ভাগ ঘরেই তা দেওয়া হচ্ছে না। কোনো ঘরে এক ফুট আবার কোনো কোনো ঘরে মাটির লেভেলেই দুটি করে ইট বিছিয়ে তার উপর থেকেই ৩ ইঞ্চি গাঁথুনি দিয়ে দেওয়াল তোলা হয়েছে। এতে অল্পমাত্রার ভূমিকম্প কিংবা টানা বৃষ্টিতেও এই ঘর ধসে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। আরেকটি বিপজ্জনক দিক হচ্ছে-দেওয়াল ধরে রাখার জন্য লিংটেল অপরিহার্য। অথচ ঘরের জানালার ওপর যে ছোট লিংটেল দেওয়া হয়েছে, তা-ও রডের খাঁচা ছাড়াই ঢালাই দেওয়া হয়েছে।

সরেজমিন পরিদর্শনকালে স্থানীয় এক যুবক এ প্রতিবেদকের সামনেই ঢালাই করে রাখা একটি লিংটেল ইটের আঘাতে ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ করে দুটি রড বের করে দেখান। ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার টাকা, মালামাল সবই দিয়েছে। কিন্তু কিছু দুর্নীতিবাজ ঠিকমতো কাজ না করে লুটপাট করছে।

স্থানীয় বাসিন্দা লিয়াকত আলী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর মন গরিবের জন্য কান্দে। কিন্তু দুর্নীতিবাজদের মন পাথরের মতো শক্ত। তাই তারা এমন খারাপ কাজ করতি পারতেছে।’ প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, পূর্বপাশের শেষ সারির ৩ নম্বর ঘরের কাজ শেষ না হতেই বৃষ্টির পানির চাপে বারান্দার পিলার ও দেওয়ালের একাংশ ধসে পড়েছে। ভেঙে গেছে ৫ ও ৬ নম্বর ঘরের বারান্দাও।

সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, চালের ফ্রেমে অসারি মেহগনির নিম্নমানের কাঠ ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রাক্কলনে যে কাঠ লাগানোর কথা আছে সেই মানের প্রতি কেভি কাঠের বাজারমূল্য ৭০০-৮০০ টাকা। আর লাগানো হচ্ছে প্রতি কেভি ৪০০-৫০০ টাকা দামের কাঠ। এছাড়াও প্রাক্কলনে দরজা ও জানালার স্টিলের যে পরিমাণ থিকনেসের কথা বলা আছে, তা দেওয়া হচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের এই প্রকল্পে এমন লুটপাট মেনে নিতে পারছেন না নির্মাণকর্মীরাও।

লেবার সরদার সালাউদ্দিন বলেন, নকশা অনুযায়ী মাটির নিচে এক ফুট ১০ ইঞ্চি গাঁথুনি, বিট লেভেল থেকে ১ ফুট ৬ ইঞ্চি গাঁথুনি, ৩ ইঞ্চি সোলিং ও ৩ ইঞ্চি ঢালাই মিলিয়ে ৩ ফুট থাকার কথা। কিন্তু কতটুকু দেওয়া হয়েছে দেখতে চাইলে তিনি মাটি খুঁড়ে ফিতা মেপে দেখান সব মিলিয়ে ১০ ইঞ্চির গাঁথুনি দেওয়া হয়েছে ১ ফুটের কিছু বেশি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নির্দেশেই তারা এ কাজ করেছেন বলে জানান। শুরুতে মানসম্পন্ন বালু না পাওয়া যাওয়ায় ভিটি বালু দিয়ে কাজ করার কথাও স্বীকার করেন সালাউদ্দিন। তবে এখনো কোনো ঘরেই মেঝে ঢালাই করা হয়নি। ৩ ইঞ্চি মেঝে ঢালাইয়ের ক্ষেত্রেও বড় চুরির পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

রাজমিস্ত্রি আব্দুর রহিম ও সেলিম শিকদার, নিম্নমানের নির্মাণকাজ করার কথা স্বীকার করে জানান, তাদের কিছু করার নেই। তাদের যেভাবে কাজ করতে বলছেন, সেভাবেই করে দিচ্ছেন। কাদের নির্দেশে তারা এমন কাজ করছেন-এই প্রশ্নের জবাবে তারা নীবর থাকেন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চিতলিয়া ভূমি অফিসের সহকারী নায়েব মো. শরীফ মিয়াকে পুরো প্রকল্পের কাজ তদারকির দায়িত্ব দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। শরীফ মিয়া নিয়োগ দিয়েছেন তার আত্মীয় রোমানকে। তারা দুজনে মিলেই নির্মাণ শ্রমিকদের পরিচালনা ও কাজের দিকনির্দেশনা দেন। নিজের অফিসের দায়িত্ব পালন না করে এই প্রকল্পে শরীফের কাজ করার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ।

নিম্নমানের নির্মাণকাজের ব্যাপারে জানতে লেবার ঠিকাদার আজাদ মুন্সীর সঙ্গে কথা বলতে সোমবার রাতে তার মোবাইল ফোনে কল করা হয়। এ প্রতিবেদকের পরিচয় পেয়েই তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।

যুগান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.