মানুষ গড়ায় কেন জাপানকে আমাদের অনুস্মরণ করা উচিত

রাহমান মনি: জাপানে সাধারণত ১৬ বছর একজন শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন ধরা হয়ে থাকে। প্রাথমিক শিক্ষা ৬ বছর, জুনিয়র হাইস্কুল ৩ বছর, হাইস্কুল ৩ বছর এবং উচ্চ শিক্ষা অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় ৪ বছর। এরপর আবার উচ্চতর শিক্ষা। এরমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা ৬ বছর এবং জুনিয়র হাই স্কুল ৩ বছর আবার বাধ্যতামূলক। এমন কি প্রতিবন্ধীদের বেলায়ও বিশেষ ব্যবস্থায় এ শিক্ষা নিতেই হয়। সরকারই সকল ব্যবস্থা নিয়ে থাকে। উপরন্ত সাধারন থেকে সুবিধা একটু বেশীই।

প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু করার আগে অবশ্য শিশুদের প্রাক-বিদ্যালয় বা বিদ্যালয়-পূর্ব উপযোগী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ উপযুক্ত রক্ষণাবেক্ষনের মাধ্যমে প্রতিপালন যা ‘শিশুদের বাগান’ হিসেবে কিন্ডারগার্টেনে বাগিচায় রোপিত চারাগাছের ন্যায় ৩ বছর পরিচর্যা হিসেবে গড়ে তোলা হয়, সেখানে যাওয়াটা অলিখিত বাধ্যতামূলক বলা যেতে পারে। কর্মজীবী মায়েরা আবার ডে-কেয়ার (হোইকোয়েন)-এ রেখে তাদের কর্ম সম্পাদন করেন। এই ক্ষেত্রে সর্বনিন্ম সীমারেখা(সাধারনত ৬ মাস বয়স থেকে) না থাকলেও সর্বোচ্চ ৬ বছর বয়সের নির্ধারিত সীমা রয়েছে। কারন ৬ বছর বয়স থেকে জাপানে শিক্ষাজীবন শুরু হয়ে থাকে। বরখেলাপ করার জো নেই।

এই হোইকোয়েন কিংবা কিন্ডারগার্টেন থেকেই জাপানে একতাবদ্ধ, টিমওয়ার্ক, পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা, নিয়ম মানা দেশপ্রেম শিক্ষা দেয়া শুরু হয়। একতাবদ্ধ হয়ে চলা, ট্রাফিক সিগন্যাল মেনে হাত তুলে রাস্তা পারাপার হওয়া, নিজ প্রতিষ্ঠান নিজেদেরকেই পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, যত্রতত্র ময়লা না ফেলা, নাক ঝাড়া টিস্যুটি নিদিষ্ট স্থানে ফেলা এর সবই শিক্ষা দেয়া হয় স্কুলে যাওয়ার প্রাককালেই।

জাপানে শিক্ষাজীবন শুরু হয় আড়ম্বর আয়োজনে জাঁকজমক পূর্ণ উৎসবমুখর পরিবেশে। শুধু মাত্র শিক্ষার্থীই নয়, অভিভাবক, আত্মীয়স্বজন, স্থানীয় প্রশাসন এমন কি পাড়াপড়শি পর্যন্ত এই উৎসবের অংশীদার হয়। চারিদিক থেকে অভিনন্দনে ভাসতে থাকে শিক্ষার্থীরা।

স্কুলে প্রথম দিনটিতে অনেক আয়োজনের মাধ্যমে অভ্যর্থনা জানানো হয় শিক্ষার্থীদের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং অভিভাবকদের পক্ষ থেকে এ আয়োজন করা হয়ে থাকে। এতে করে কোমলমতি শিশুদের মনে উৎসাহ বাড়ে। শিক্ষাজীবন যে একটি আনন্দ ও উপভোগ্যময় তা তারা প্রথন দিনটিতেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়। পড়ালেখা বা স্কুলভীতি কাজ করে না।

স্কুলের প্রথমদিনটিতেই প্রতিটি শিক্ষার্থী পীঠে বহন করার একটি ব্যাগ নিয়ে যায়। যে ব্যাগটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৬টি বছর অনায়াসেই কাটিয়ে দিতে পারে। জাপানী ভাষায় যাকে ‘রানডোসেল’ বলা হয়ে থাকে। সাধারনত দাদা-দাদি, নানা-নানি এই ব্যাগটি উপহার হিসেবে দিয়ে থাকেন। প্রথম দিনেই শিক্ষার্থীরা স্কুল থেকে তাদের পাঠ্যবই নিয়ে বাড়ী ফিরে।

জাপানে ক্লাশে কোন রুল নাম্বার ডাকা হয়না জাপানী বর্ণাক্ষরের ক্রম অনুযায়ী। আমাদের ভাষায় বললে ‘অ’ দিয়ে শুরু করে ‘ক্ষ’ দিয়ে শেষ হয়। কে ফাস্ট বয়/গার্ল আর কে নয় নাম ডাকার মধ্য দিয়ে তা বুঝার উপায় থাকে না। ফলে সবাই সবাইকে সমান ভাবতে পারে, কেহ হীনমন্যতায় ভুগে না।

যদিও জাপানে প্রাথমিক কিংবা জুনিয়র হাই স্কুলে ফেল বা অকৃতকার্য হওয়ার কোন সম্ভাবনা থাকেনা এবং ঝরেও যায় না। তারপরও মেধা যাচাইয়ের ব্যাপার তো একটা থাকেই। আর সেটা হচ্ছে, ক্লাসে নিয়মিত উপস্থিতি, দৈনন্দিন আচরণ শিক্ষায় মনোযোগ প্রভৃতির উপর নির্ভর করে ক্লাশ টিচার মুল্যায়ন করে একটা নাম্বার দিয়ে থাকেন। আর সেই নাম্বারের উপর ভিত্তি করে শিক্ষার্থীরা পরবর্তী উচ্চ শিক্ষার জন্য যোগ্যতা অনুযায়ী ভর্তি হ’বার আবেদন করে এবং সুযোগও পেয়ে যায়।

জাপানে শিশুদের জন্য ক্রীড়া প্রতিযোগিতা মানে ঈদ/পূজা উৎসবের চেয়ে বেশী আনন্দের। এখানেও অভিভাবক, আত্মীয়স্বজন, স্থানীয় প্রশাসন এমন কি পাড়াপড়শি পর্যন্ত এই উৎসবের অংশীদার হয়। ক্রীড়া দিবসকে কেন্দ্র করে দলগত কসরত, উপভোগ্য করার জন্য নতুন নতুন বিভিন্ন আইডিয়া, সাজসজ্জা, পরিচালনা, ধারাভাষ্য সব কিছুই শিক্ষার্থীরা নিজেরা করে থাকে। শিক্ষক কেবল সহায়ক হিসেবে কাজ করে থাকেন।

ক্রীড়াদিবস কে সামনে রেখে শিক্ষার্থীদের সংখ্যার উপর এবং পারফর্মস এর উপর ভিত্তি করে প্রথমেই প্রতিটি ক্লাশের শিক্ষার্থীদের একাধিক ভাগে ভাগ করা হয়। আর এই ভাগ করা হয় রঙের নাম অনুসারে এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই লাল এবং সাদা এই ২ টি দলে। এর অন্যতম কারন হলো বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা যে টুপীটি ব্যবহার করে তার একপিঠ লাল এবং অপর পিঠ সাদা। ঠিক যেনো মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। এছাড়াও জাপানের জাতীয় পতাকার রঙ সাদার মাঝে লাল। ২টি দলে ভাগ করা হলে মাথার উপরের টুপিটি কেবল রঙ বদলায়। আর শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশী হলে নীল, হলুদ কিংবা অন্য কোন রঙের নামে।

এছাড়াও প্রতিটি শিক্ষার্থীকেই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে হয়। তারপর মাসব্যাপী চলে অনুশীলন। তবে এই অনুশীলন ক্লাস ফাঁকি দিয়ে নয়। ক্লাস এরই একটি অংশ। সেইভাবেই ক্লাশরুটিন বিন্যাস করা হয়ে থাকে। প্রতিযোগিতা ছাড়াও ক্লাশভিত্তিক শরীরচর্চা প্রদর্শন করতে হয়।

জাপানে শিক্ষাঙ্গনের ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ব্যক্তিগত অংশগ্রহণ এবং পুরস্কার প্রাপ্তি কোনটাই সম্ভব নয়। এখানে সব কিছুতেই দলগত[ラ1] ভাবে অংশগ্রহন এবং দলকে পুরস্কৃত করা হয়। এতে প্রথমত সবার অংশগ্রহন নিশ্চিত হয়, দ্বিতীয়ত আর্থিক ব্যয় হ্রাস করা সম্ভব সহ দলকে তথা দেশকে ভালোবাসা শিখানো হয়। ব্যক্তি লাভের আশায় একজন আরেকজনকে ল্যাং মেরে ফার্স্ট হবার প্রবনতা থাকে না। দলকে এগিয়ে নেয়ার শপথ থাকে।

জাপানে ক্রীড়া দিবসের আরেকটি বিশেষত্ব হলো ক্রীড়া অনুষ্ঠান কেবলমাত্র শিক্ষার্থীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনা। শিক্ষক এবং কর্মচারীদেরও কিছু না কিছু প্রদর্শন করতে হয়। অভিভাবক এবং এলাকাবাসীদের সমন্বয়ে একটি আয়োজন থাকে। আয়োজন থাকে আগামীতে যারা বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে আগ্রহী এবং বিগত দিনের শিক্ষার্থীদের জন্যও।

প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ১ম, ২য়,এবং ৩য় স্থান অধিকারীদের নাম্বার দেয়ার মাধ্যমে মুল্যায়িত করে সব শেষে যোগফলের মাধ্যমে দলগত চ্যাম্পিয়ন নির্ধারণ করায় শেষ পর্যন্ত টানটান উত্তেজনা বিরাজ করে। সবাই অধীর আগ্রহ নিয়ে সবাই অপেক্ষা করতে থাকে। তা অভিভাবকদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। দিনশেষে চ্যাম্পিয়নদের হাতে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি তুলে দেয়া হয় এবং প্রতি বছর তার পুনঃরাবৃতি ঘটে। তাতে করে বড় অংকের একটা অর্থ হ্রাস সম্ভব হয়।

আমাদের দেশে স্কুল গুলোতে বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় বাছাই (হিট) পর্বের নামে সিংহভাগ শিক্ষার্থীকে মুল পর্ব থেকে দূরে রাখা হয় তাতে করে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

আবার প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ১ম, ২য়,এবং ৩য় স্থান অধিকারীদের পুরষ্কারের মাধ্যমে ব্যক্তিগতভাবে লাভবান করায় অসদুপায়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার প্রবণতার সম্ভাবনা থাকে। স্কুল বাজেটের বড় একটা অর্থ খরচও হয়।

একটি শিশু বাসায় তার অভিভাবকের কথা যতোটা বিশ্বাস করে, মানে, তার চেয়েও বেশী বিশ্বাস করে স্কুল শিক্ষকের কথা, অবিশ্বাস্যভাবে মানেও।

মানুষ কারিগর শিক্ষকগণও প্রতিটি শিক্ষার্থীকে মাতৃ/পিতৃ স্নেহ দিয়ে গড়ে তুলেন। শ্রেনীশিক্ষক একজন শিক্ষার্থীর শুধু ক্লাস এবং স্কুলজীবন নিয়েই সীমাবদ্ধ থাকেননান। তার দৈনন্দিন জীবনযাপন নিয়ে প্রতিদিন একটি নোটের মাধ্যমে অভিভাবক এবং শ্রেনীশিক্ষকের সাথে তথ্য বিনিময় এবং বছরে একাধিকবার শিক্ষার্থীর বাসায় এবং অভিভাবকদের শিক্ষাঙ্গনে ডেকে শিক্ষার্থীর উপস্থিতিতে এবং অনুপস্থিতিতে কথোপকথনের মাধ্যমে তার সম্পর্কে ধারনা নিয়ে সেই মোতাবেক তাকে পরিচালিত করা হয়।

আমাদের দেশে একজন শিক্ষার্থীর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে একজন শ্রেনী শিক্ষক কতোটুকু জানেন তা রীতিমতো গবেষণার একটি বিষয়। অথচ জানাটা জরুরী।

শিক্ষার্থী-শিক্ষক সুসম্পর্ক শিক্ষকভীতি, স্কুল ভীতি অনেকাংশেই হ্রাস পায়। এই সহজ কথাটি আমাদের দেশের শিক্ষকরা বুঝতে চান না। তারা সবসময় শিক্ষার্থীদের ভীতি হয়েই থাকতে ভালবাসেন। একগাদা হোমওয়ার্ক দিয়ে নিজ দায়িত্ব সম্পন্ন করতে চান। বাকী কাজ গুলো টিউশনির মাধ্যমে।

আর জাপানে ক্লাশের পড়া ক্লাশেই আদায় করে নেয়া হয়। আর বাসার জন্য যে হোমওয়ার্ক দেয়া হয় তা আবার কড়ায় গণ্ডায় আদায়ও করে নেয়া হয়। তবে লম্বা ছুটি যেমন বসন্ত, গ্রীষ্ম বা শীতকালীন ছুটিতে হোমওয়ার্ক বাধ্যতামূলক ভাবেই দেয়া হয়। আর এই সব হোমওয়ার্ক শিক্ষার্থীরা বেশ আগ্রহ নিয়েই করে থাকে। এইব্যাপারে সহায়ক ভুমিকা পালন করে বিভিন্ন পাবলিক গ্রন্থাগার। কারন পাবলিক লাইব্রেরীতে শিক্ষার্থীদের সহায়ক সব ধরনের পুস্তকই বর্তমান রয়েছে। এছাড়াও শিক্ষকরা বন্ধের মধ্যেও শিক্ষার্থীদের খোঁজখবর রাখেন নিয়মিত। প্রয়োজনে শিক্ষার্থীদের বাসায় গিয়ে তাদের তদারকি করে থাকেন।

আর এইসব কারনেই জাপান দুই দুইটি বিশ্ব যুদ্ধে জড়িয়ে হেরে যাওয়ার পরও মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্বের মানচিত্রে। করোনার এই মহামারিতে বিশ্ব অর্থনীতি ভঙ্গুর, যার ধাক্কা লেগেছে জাপানেও। এতদসত্বেও জাপান বিশ্ব ক্রীড়ার সবচেয়ে বড় আসর অলিম্পিক আয়োজনকারী লড়াকু এক জাতি।

শিক্ষা, শৃঙ্খলা, প্রযুক্তি, নিত্য নতুন আবিষ্কারের দেশ জাপান। বাংলাদেশের অবকাঠামো গঠনে জাপানের ভূমিকা এবং অংশগ্রহণ সর্বজনবিদিত।

টেকসই একটি ইমারত প্রতিষ্ঠা করতে যেমন মজবুত ভিত্তি চাই। তেমনি একজন সুশিক্ষিত জাতি গড়তেও তার শুরুটারও মজবুত একটা ভিত্তি চাই। মানুষ তো আর ইমারত নয় তাই তার ভিত্তিটা পারিবারিক এবং পূজনীয় শিক্ষকরা গড়ে দেন। আর জাপানে সেই কাজটিই মানুষ গড়ার কারিগর শিক্ষকগন করে দেন। তাইতো হার-জিতের পরও জাপানী দর্শকরা গ্যালারী পরিস্কার করে তবেই স্থান পরিত্যাগ করেন। প্রাথমিক শিক্ষার ভিত্তিটা মজবুত নয় তো কি!

তাই, মানুষ গড়ায়ও জাপানকে আমাদের অনুস্মরণ করা উচিত। তাতে করে জাতি শৃঙ্খলা, দেশপ্রেম যেমন শিখবে তেমনি অর্থ অপচয়ও রোধ হবে।।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.