রাতে আছড়ে পড়া ঢেউয়ের গর্জনে ঘুম নেই মানুষের

কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু: বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই খরস্রোতা পদ্মার ভাঙনের কবলে পড়েছে মুন্সীগঞ্জের বিস্তীর্ণ জনপদ। পানি বৃদ্ধিতে পদ্মা নদী উত্তাল হয়ে ওঠায় স্র্রোতের সঙ্গে বাতাসের তীব্রতায় পদ্মার বড় বড় ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরবর্তী গ্রামগুলোতে। বর্তমানে টঙ্গিবাড়ী উপজেলার ৬টি গ্রাম, লৌহজংয়ের ৮টি গ্রাম ও সদর উপজেলার ৩টি গ্রাম নিয়ে ১৭টি গ্রামে এখন পদ্মার ভাঙনে তাণ্ডব চলছে। ইতোমধ্যে ভাঙন তাণ্ডবে ৩টি উপজেলার নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোর একাধিক ঘরবাড়ি, স্থাপনা ও বিস্তীর্ণ কৃষি জমি খরস্রোতা পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে। একই সঙ্গে পদ্মার ভাঙনের কবলে হুমকির মুখে বাড়িঘর, রাস্তাঘাট, স্কুল, মসজিদ-মন্দিরসহ নানা প্রতিষ্ঠান। এই পরিস্থিতিতে পদ্মার তীরের ভাঙনকবলিত এলাকার মানুষ আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। প্রতিদিনই নদীতে বিলীন হচ্ছে বিস্তীর্ণ জনপদ। আর ভাঙনের কবলে পড়ে একদিকে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে একাধিক পরিবার, অন্যদিকে ভাঙন আতঙ্ক কেড়ে নিয়েছে মানুষের চোখের ঘুমও। কখন বসতভিটা গিলে ফেলে রাক্ষুসে পদ্মা- এই ভয়ে রাত জেগেই পদ্মার রুদ্রমূর্তি প্রত্যক্ষ করা ও আছড়ে পড়া বড় বড় ঢেউয়ের গর্জন শুনে জীবন-যাপন করছে জেলার ৩টি উপজেলার অসংখ্য পরিবার।

জানা গেছে, পদ্মার ভাঙনের মুখে থাকা বাড়িঘর ও গাছপালাসহ সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে শেষ সম্বল। লৌহজং উপজেলার কনকসার ঝাউটিয়ার জেলেপাড়ায় এখন বিরাজ করছে ভাঙন আতঙ্ক। দুটি মন্দির আর একাধিক পরিবারের বাড়িঘর নিয়ে গ্রামবাসী রয়েছে বড় দুশ্চিন্তায়। এসব স্থাপনা ভেঙে সরিয়ে নেওয়ার জায়গাও নেই। তাই নদীঘেঁষা গ্রামের পরিবারগুলো এক রকম নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে পদ্মার তীরেই। ভাঙনকবলিত পরিবারের সদস্যরা জানান, বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই পদ্মা নদীতে স্রোতের তীব্রতা বৃদ্ধিতে ভাঙনের কবলে পড়েছে নদীতীরবর্তী গ্রামগুলো।

টঙ্গিবাড়ী উপজেলার দিঘিরপাড়, কামারখাড়া, হাসাইল-বানারী ও পাঁচগাঁও ইউনিয়নে ভাঙন শুরু হওয়ায় অসংখ্য বসতবাড়ি ও বিস্তীর্ণ কৃষি জমি পদ্মার ভাঙনের কবলে পড়েছে। নদীতীরবর্তী গ্রামবাসী জানায়, ভাঙন ঠেকাতে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ করা না হলে পদ্মার ভাঙনের তাণ্ডব আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করবে। এমনিতেই করোনা আতঙ্ক, এর মধ্যে ভাঙন শুরু হওয়ায় পদ্মাপাড়ের খেটে খাওয়া মানুষের দিন কাটছে দুশ্চিন্তায়। এ ছাড়া পদ্মার তীব্র স্রোতের সাঁইসাঁই শব্দ ও তীরে আছড়ে পড়া বড় বড় ঢেউয়ের গর্জন শুনে আতঙ্কিত পদ্মাপাড়ের মানুষ। রাতের নিরিবিলি পরিবেশে উত্তাল পদ্মায় বড় বড় ঢেউয়ের গর্জনের শব্দ কখনও কখনও ভয়ংকর হয়ে আকস্মিক ভাঙন তাণ্ডব শুরু হয়ে যায়। তাই নদীতীরবর্তী গ্রামের শত শত মানুষ নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছে।

স্থানীয়রা জানায়, বর্ষার শুরুতে এবারও পদ্মার ভাঙন দেখা দিয়েছে লৌহজংয়ের ৮টি গ্রামে। এর মধ্যে ১১৯ বছরের প্রাচীন ব্রাহ্মণগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে এখন পদ্মা প্রবাহিত। তাই বিদ্যালয়টির নির্মাণাধীন চারতলা ভবন, শহীদ মিনার, প্রশাসনিক ভবন সবই ভাঙনের মুখে পড়েছে। যে কোনো সময় এসব স্থাপনা পদ্মায় বিলীন হয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হওয়ায় বর্তমানে সেগুলো রক্ষায় ফেলা হচ্ছে বালুভর্তি বস্তা।

লৌহজং উপজেলার ব্রাহ্মণগাঁও উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হোসেন খসরু বলেন, প্রায় ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ হচ্ছে ভাঙন প্রতিরোধে। আশা করি, প্রাচীন বিদ্যালয়টি রক্ষা করতে পারব। ব্রাহ্মণগাঁও গ্রামের মধ্যবয়সী নারী আলেয়া বেগম জানান, রাক্ষুসে পদ্মা এখন পৈতৃক ভিটাবাড়ির পাশে চলে এসেছে। যেভাবে ভাঙছে এতে বাড়িঘর সব ভেঙে যাবে। বাড়িঘর পদ্মায় বিলীন হয়ে গেছে, স্কুল পড়ূয়া ছেলেমেয়েদের নিয়ে কোথায় থাকব, তা ভেবে পাচ্ছি না।

অন্যদিকে, গত বছরও খড়িয়া গ্রামে পদ্মার ভাঙনে অর্ধশতাধিক বাড়িঘর এবং লৌহজং-তেউটিয়া ইউনিয়নের পাইকারা আশ্রয়ণ প্রকল্পের অর্ধেক অংশ পদ্মায় বিলীন হয়ে যায়। এবারও ভাঙন দেখা দেওয়ায় গ্রামগুলো পদ্মায় বিলীন হয়ে গেলে লৌহজং উপজেলার মানচিত্রই পরিবর্তন হয়ে ছোট পরিসরের উপজেলায় রূপ নেবে।

লৌহজং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হুমায়ুন কবির বলেন, পদ্মার ভাঙন রোধে লৌহজংয়ের খড়িয়া থেকে টঙ্গিবাড়ীর দিঘিরপাড় পর্যন্ত একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ীর পদ্মার তীরে স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ হলে ভাঙন ঠেকানো যাবে। লৌহজংয়ের ৮টি গ্রাম, টঙ্গিবাড়ীর ৬টি গ্রাম ও মুন্সীগঞ্জ সদরের ৩টি গ্রামে এখন পদ্মার ভাঙনের মুখে পড়েছে। ইতোমধ্যে লৌহজংয়ের পদ্মা রিসোর্টসহ আশপাশের অনেক স্থাপনা বিলীন হয়ে গেছে। তাই জনপদ রক্ষায় এখন বালুভর্তি বস্তা ফেলা হচ্ছে। এ ছাড়া পদ্মার ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা তৈরিসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

টঙ্গিবাড়ী উপজেলা চেয়ারম্যান জগলুল হালদার ভুতু জানান, টঙ্গিবাড়ীর দিঘিরপাড় বাজারের দোকানঘরসহ বিস্তীর্ণ এলাকা পদ্মায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে। গত বছরও দিঘিরপাড় বাজারসহ আশপাশ এলাকায় ভাঙন দেখা দেয়। ভাঙন প্রতিরোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড ৩০০ ফুট এলাকায় ১৬ হাজার ৪০০ জিও ব্যাগভর্তি বালুর বস্তা ফেলে স্রোতের গতিপথ পরিবর্তনের চেষ্টা চালিয়েছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছে, ৩টি উপজেলার কোথাও কোথাও পদ্মার ঘূর্ণায়মান স্রোত থাকায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলেও ভাঙন রোধ করা যাচ্ছে না। স্রোতের তীব্রতায় বালুভর্তি জিও ব্যাগ উধাও হয়ে যাচ্ছে। লৌহজং ও টঙ্গিবাড়ী উপজেলার একধিক পয়েন্টে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী টিএম রাশিদুল কবীর জানান, জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে ৪৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে লৌহজংয়ের খড়িয়া, দক্ষিণ হলদিয়া হয়ে টঙ্গিবাড়ীর দিঘিরপাড় পর্যন্ত ৮ দশমিক ৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের একটি স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ প্রকল্প একনেকের বৈঠকে অনুমোদনের অপেক্ষায়।

সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.