করোনা সংক্রমণের তৃতীয় ও চতুর্থ ঢেউ নিয়ে ড. তপন পালের পূর্বাভাস

রাহমান মনি: বিশ্বে করোনা মহামারী চলছে। দেশে চলছে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউ। গ্রাম-গঞ্জ-শহর থেকে ভেসে আসছে শত শত করোনা রোগী শনাক্তের দুঃসংবাদ। হাসপাতালগুলোতে করোনা রোগীতে ভরপুর। কোথাও ওষুধের দোকানের সামনে বিরাট লাইন। পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে প্রিয়জন হারানোদের বুকফাটা কান্নার ছবি। কেউ জানে না কখন এই ঢেউ পিকে যাবে, কখন শেষ হবে, কখন আবার নতুন ঢেউ আসবে। এগুলোর জন্য দরকার একটু গবেষণা, একটু পূর্বাভাস।

বাংলাদেশের করোনা ভাইরাস সংক্রমণের পূর্বাভাসের সাথে জড়িয়ে আছে একটি নাম। তিনি হলেন ড. তপন পাল। তিনি গাণিতিক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে বিভিন্ন ধরণের পূর্বাভাস দিয়েছেন যার অধিকাংশ সঠিক কিংবা কাছাকাছি ছিল। গত বছর প্রথম ঢেউয়ের সময় মার্চ মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ নিয়ে অনেকটা সঠিক পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যার মূল্যায়ন নিয়ে মানবজমিন পত্রিকায় ২০২০/৯/১৬ তারিখে একটা রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি এই সময়ে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া রোগীর সংখ্যার রেঞ্জ নিয়ে সঠিক পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। তার দেওয়া পূর্বাভাসের প্রথম ঢেউয়ের পিক ও করোনা রোগী শনাক্তের সংখ্যাও প্রকৃত সংখ্যার কাছাকাছি ছিল। এছাড়া গত বছর এপ্রিল-মে মাসে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে দেওয়া প্রতিদিনের শনাক্তের সংখ্যার পূর্বাভাস অধিকাংশ দিন প্রকৃত সংখ্যার কাছাকাছি ছিল। তিনি জাপানে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে সঠিক পূর্বাভাস দিয়েছিলেন এবং দ্বিতীয় ঢেউয়ের সময় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগ করে দেওয়া প্রতিদিনের শনাক্তের সংখ্যার পূর্বাভাস অধিকাংশ দিন প্রকৃত সংখ্যার কাছাকাছি ছিল।

এ বছর এপ্রিল-মে মাসে যখন করোনা ভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ে ভারতের পরিস্থিতি টালমাটাল তখন তিনি মে ১৯ তারিখে ফেইসবুকে তার ব্যক্তিগত পেজে ও দেশ-বিদেশ ওয়েব পোর্টালে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউ শুরু ও এর ভয়াবহতা সম্পর্কে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। তিনি লিখেছিলেন যে বাংলাদেশে এক-দুই মাসের ভিতরে তৃতীয় ঢেউ আসবে। তৃতীয় ঢেউয়ে প্রচুর অল্প বয়সীরা আক্রান্ত হবে। আমরা দেখেছি যে জুন মাসের ২০ তারিখের দিক থেকে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস সংক্রমণের তৃতীয় ঢেউ আছড়ে পড়েছে। সুতরাং তৃতীয় ঢেউ শুরু নিয়ে তার পূর্বাভাস সঠিক ছিল। ড. তপন পালের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাংলাদেশে করোনার তৃতীয় পিক আগামী জুলাই ১৪ থেকে ২৮ তারিখের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা আছে। আর পিকে পৌঁছানোর দেড়-দুই মাসের ভিতরে, মানে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম কিংবা দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে স্বাভাবিক অবস্থায় আসার সম্ভাবনা আছে। আর চতুর্থ ঢেউয়ের পিক নভেম্বর মাসে হওয়ার সম্ভাবনা আছে। তিনি বলেন যে, ১০০% সঠিক পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন তবে তার এই পূর্বাভাস প্রকৃত ঘটনার কাছাকাছি থাকবে বলে তিনি আশাবাদী। তিনি আমাদের জানান যে, বাংলাদেশ, ভারত ও জাপানের তথ্য ব্যবহার করে এই পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছে। ড. তপন পালের মতে বাংলাদেশে তৃতীয় পিক কমার সাথে সাথে ব্যাপকহারে করোনা ভাইরাসের টিকা দেওয়া উচিত। প্রয়োজনে উপজেলা পর্যায়ে বিশাল টিকাকরণ ক্যাম্প স্থাপন করে গণহারে টিকা দেওয়া যেতে পারে।

কিন্তু কে এই তপন পাল? তিনি জাপান প্রবাসীদের মাঝে এক পরিচিত নাম। জাপান প্রবাসীরা তাকে চেনেন একজন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে কিন্তু অনেকেই জানেন না যে তিনি আসলে একজন গবেষক, একজন বিজ্ঞানী। ড. তপন পাল ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী লাভ করেন। তিনি ১৯৯৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ২০০১ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে প্রভাষক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০০১ সালে জাপান সরকারের মোনবুকাগাকুশো স্কলারশিপ নিয়ে উচ্চ শিক্ষার্থে জাপানে আসেন। জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০০৪ সালে মাস্টার্স ডিগ্রী ও ২০০৭ সালে পিএইচডি ডিগ্রী লাভ করেন। ২০০৭ সালে জাপানের একটি বড় কোম্পানীতে গবেষক হিসেবে যোগদান করেন এবং বর্তমানে একই কোম্পানীতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিং বিষয়ে জ্যেষ্ঠ গবেষক বিজ্ঞানী হিসেবে কর্মরত। ড. তপন পাল Lulu.com কর্তৃক প্রকাশিত Handbook of Healthcare and Medical Condition-related Terms in Bangla, English and Japanese (ISBN-13: 978-0359459476) বইয়ের রচয়িতা ও CRC Press কর্তৃক প্রকাশিত Applied Genetic Programming and Machine Learning (ISBN-13: 978-1439803691) বইয়ের সহ-রচয়িতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.