শুনে শুনে গান রপ্ত করেন অন্ধ শ্যামল

মুন্সীগঞ্জ পৌরসভার মোল্লারচর গ্রামের শ্যামল বাউল হোসেন জন্ম থেকে অন্ধ। একতারা, দোতারা কিংবা বাওয়া হাতে পেলেই কণ্ঠে সুর তুলেন তিনি। মুন্সীগঞ্জের সবাই তাকে শ্যামল বাউল হিসেবে এক নামে চেনে।

গ্রামেগঞ্জে ঘুরে ঘুরে লালনের বন্দনা করলেও সব ধরনের গানই শোনা যায় তার কণ্ঠে। কারো কাছে গান শেখেননি শ্যামল বাউল, শুধু শুনে শুনেই গান রপ্ত করেছেন এ শিল্পী। তার সুরেলা কণ্ঠের বাউল সংগীতের শুনে ভক্ত হয়ে উঠবেন যে কেউ। শুধু গানই নয়, গজলও গেয়ে থাকেন এ শ্যামল বাউল।

রোববার (৮ আগস্ট) বিকেলে নিজের জীবনের গল্প নিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন বাউল শ্যামল হোসেন।

গানের জগতে কীভাবে এলেন জানতে চাইলে শ্যামল হোসেন বলেন, ‘আমার জীবনে গান গাওয়া শুরু ওস্তাদ ছাড়া। ওস্তাদ ছাড়াই গান শিখেছি। গান আমার মধ্যে কীভাবে আসছে তা আমি নিজেও জানি না। কারণ আমাকে কেউ পরিশ্রম করে গান শেখায়নি। সবার দোয়ায় আমি গাইতে পারি। হঠাৎ করেই গান ধরেছি। ছোটবেলা থেকে গানের সঙ্গে ছন্দ মিলাতাম। একটা গান একবার দুইবার শুনলেই মুখস্ত করতে পারি। পরে আস্তে আস্তে গানের যন্ত্রের সঙ্গে পরিচয় হয়। এখন একতারা, দোতারা ও বাওয়া বাজাতে পারি।’

বাউল শ্যামল হোসেন বলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই চোখে দেখতে পাই না। অনুভূতি নিয়ে চলি। যেমন আমার কাছের মানুষ যারা আছেন, তাদের হাত ধরলেই আমি বলে দিতে পারি এটা অমুক-এটা তমুক। আবার অনেকে সামনে দাঁড়ালেও বলতে পারি কে এটা। এভাবে আমার চলাফেরা। যারা চোখে দেখে তাদের এ অনুভূতি বোঝানো সম্ভব না।’

বাউল শ্যামল হোসেন আরও বলেন, ‘আমি গান ছাড়া মানুষের বাড়িতে মিলাদ মাহফিলে অংশগ্রহণ করি। গজল গেয়ে থাকি। কেউ আমাকে ঠকায় না। উপযুক্ত পারশ্রমিক দেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘করোনা আসার পর থেকে এখন কোনো গানের প্রোগ্রাম ও মিলাদ মাহফিল হয় না। এতে অনেক আর্থিক সমস্যা হচ্ছে। কারো কাছে চেয়েও খেতে পারি না। জেলা সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও জেলা প্রশাসন থেকে কিছু আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছে। ওটা দিয়ে কয়েকদিন চলেছি। কয়েকজন জনপ্রতিনিধি আমাদের খাদ্যসামগ্রী দিয়ে সহযোগিতা করেছে। কোনোমতে জীবন চলছে। গান আর মিলাদ মাহফিল ছাড়া আমার সংসার চালানোর আর উপায় নেই। চোখে দেখতে পাই না, অন্য কোনো কাজও করতে পারি না।’

বাউল শ্যামল হোসেন বলেন, ‘আমি চোখেই দেখতে পাই না। তবে যেসব রাস্তায় এক-দুইবার চলাচল করেছি, সেসব রাস্তা কিছুটা মুখস্ত আমার। যদি রাস্তা পারপার করতে হয়, তাহলে অন্য কারো সহযোগিতা নিতে হয়। আমি যেখানেই যাই, একাই চলাচল করি। কারো বোঝা হয়ে থাকতে চাই না।’

শ্যামলের পরিবারে স্ত্রী-ছেলে-মেয়েসহ ছয়জন সদস্য রয়েছে। ছেলেমেয়েরা অনেক ছোট। নিজের জমি কিংবা ঘর নেই। বাবারও কোনো জমি ছিলো না। মানুষের বাড়িতে থাকেন। গান গেয়ে যে উপার্জন হয়, তা দিয়ে কোনোরকম সংসার চলে তার।

বাউল শ্যামল হোসেন বলেন, ‘আগে গানের সঙ্গে আমি একতারা ও দোতারা বাজাতে পারতাম। তারের যন্ত্রে আমার কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। এখন আমার বাদ্যযন্ত্র হচ্ছে বাওয়া। আমার কোনো নির্দিষ্ট গানের দলও নেই। যখন প্রোগাম হয়, তখন আমি ছুটে ছুটে দল তৈরি করি। আবার অনেক প্রোগ্রামে আগে থেকেই দল তৈরি থাকে, আমি শুধু একা বাওয়া নিয়ে গান গাইতে চলে যাই।’

রাইজিংবিডি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.