অপরূপ আড়িয়ল

কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু: শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। নিচে মাঝি, বেদে ও জেলের মাছ ধরার নৌকা। দূরে বিলের মাঝে ওড়াউড়ি করছে শঙ্খচিল, কানিবক, মাছরাঙা, ডাহুক, পাতিহাঁস, নাম না জানা আরও কত পাখি। এলাকার শিশু-কিশোরের দল শাপলা, শালুক ও ডেপ তোলার নেশায় ডিঙি নৌকা নিয়ে নেমে পড়েছে বিলের মাঝে।

মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর, সিরাজদিখান, ঢাকার দোহার, নবাবগঞ্জে অবস্থিত বিশাল এ জলাশয়টি বিখ্যাত আড়িয়ল বিল হিসেবে। দেশের মধ্যাঞ্চলের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন বিল। এর প্রতিবেশ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে হাজার বছর ধরে। ধারণা করা হয়, অতি প্রাচীনকালে এ স্থানে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের সঙ্গমস্থল ছিল; পরে উভয় নদীর প্রবাহ পরিবর্তনের ফলে এই স্থান শুস্ক হয়ে বিলে পরিণত হয়। ঢাকা ও মুন্সীগঞ্জ জেলা এবং পদ্মা নদীর মাঝখানে একটি ছিটমহলসম জলাভূমি এ আড়িয়ল বিল।

মুন্সীগঞ্জ ও ঢাকা জেলার তিনটি উপজেলায় বিস্তৃত রয়েছে দেশের প্রাচীন জলাভূমি আড়িয়ল বিল। তবে উত্তর-পূর্বাংশে সিরাজদিখান উপজেলার কেয়াইন, শেখরনগর, চিত্রকোট ও রাজানগর ইউনিয়নের কিছুটা অংশে বিস্তৃত। এ বিলটি মূলত পূর্ব-পশ্চিমে বিস্তৃত। পশ্চিমে একেবারে শেষ প্রান্তে গিয়ে পশ্চিম-উত্তর অনেকটা বেঁকে গেছে। ২৬ মাইল দৈর্ঘ্য এবং ১০ মাইল প্রস্থের এ জলাভূমির আয়তন ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬০০ একর। শ্রীনগর, নবাবগঞ্জ ও দোহার উপজেলার ১৬টি ইউনিয়নের প্রায় ৭০টি গ্রাম নিয়ে গড়ে উঠেছে আড়িয়ল সভ্যতা ও এর জীবনধারা।

এ বিলকে ঘিরে চার থানার ১০ লাখ লোকের জীবন-জীবিকা চলে। শত শত বছর ধরে বিলে বসবাস করছে এ অঞ্চলের অধিবাসী।

আড়িয়ল বিলের প্রাচীন নাম ছিল চূড়াইন বিল। তবে আড়িয়ল বিল নামেই সর্বত্র পরিচিত, কীভাবে বিলের নাম আড়িয়ল হলো তা এখন আর স্পষ্ট নয়; তবে ইতিহাস পাঠ এবং লোকমুখে শুনে জানা যায়, আড়িয়াল খাঁ নদী ব্রহ্মপুত্রের একটি শাখা নদী হিসেবে বিক্রমপুরের ভেতর দিয়ে উত্তর-দক্ষিণমুখী প্রবাহিত ছিল। আর পদ্মার একটি শাখা পূর্ব-পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে আড়িয়াল খাঁ নদীর সঙ্গে এসে মিলিত হয়, দুটি নদীর স্রোতে যেখানে এসে মিলিত হয় সেখানে তীব্র আড়াআড়ি হতে প্রচণ্ড ঘূর্ণায়মানের সৃষ্টি হয়; এ ঘূর্ণায়মান থেকে প্রচণ্ড কূপের সৃষ্টি হয়, তা থেকেই কালে কালে জায়গাটি শুস্ক হয়ে বিলে পরিণত হয়, আর এ বিলের নাম হয় আড়িয়ল বিল। বর্তমান মাদারীপুরের কাছে আড়িয়াল খাঁ নদীর একটি অংশ দেখা যায়। অন্য যে কথা শোনা যায় তা হলো, আড়িয়ল অর্থ জলজভূমির আধার, যে স্থানটিকে প্রচুর মৎস্য সম্পদের অভয়ারণ্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। আড়িয়ল বিলে প্রচুর মৎস্য ও জলজ উদ্ভিদের অভয়ারণ্য বিধায় স্থানীয়দের কাছে জায়গাটি ‘আড়িয়াল’ হিসেবে চিহ্নিত, আড়িয়াল>আড়িয়ল শব্দের উদ্ভব হয়েছে, আর আড়িয়ল ও বিলের সমন্বয়ে বিলের নাম হয় আড়িয়ল বিল।

বর্ষা এলে আড়িয়ল বিল পানিতে কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। বাংলা সাহিত্য-সংস্কৃতির লীলাভূমি বিক্রমপুর। আর বিক্রমপুরের বর্ষা না দেখলে শিল্প, সাহিত্য আর সংস্কৃতির প্রেমিক হিসেবে নিজের পরিচয়টাই অসম্পূর্ণ থেকে যায়। বর্ষা শেষে শরতে সে রূপ আরও বেশি করে ফুটে ওঠে। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, বিলের আগের সেই সৌন্দর্য আর নেই। প্রতিনিয়ত স্বকীয়তা হারাচ্ছে আড়িয়ল বিল। তবুও এই সময় তার কিছুটা ছাপ এখনও পাওয়া যায়।

সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.