পদ্মা সেতুর সংরক্ষিত এলাকায় যুবক গেলেন কীভাবে

মঈনউদ্দিন আহমেদমঃ জুলহাসের বোন শাহানা জানান, তার ভাই সেতুর প্রকল্পের ভেতর কীভাবে গেছেন, তা জানেন না তিনি। খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে দেখেন হাত-পা বাঁধা অবস্থায় জুলহাসকে কেউ ফেলে রেখেছে।

পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকার ভেতরে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় তুমুল আলোচনা চলছে।

ওরকম সংরক্ষিত এলাকায় কীভাবে তিনি গেলেন, কেন তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হলো, এসব প্রশ্ন তুলেছেন নিহতের স্বজনরা। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। কিন্তু এখনও কোনো কূল-কিনারা হয়নি।

লৌহজং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলছেন, প্রকল্প এলাকার লোকজন জানিয়েছে, চুরি করতে আসায় জুলহাস হাওলাদারকে মারধর করা হয়। এতে তার মৃত্যু হয়। কিন্তু চুরির কোনো মালামাল জব্দ করা হয়নি বা প্রকল্পের লোকজন চুরি করা মালামাল দেখাতে পারেনি।

মাওয়া চৌরাস্তায় পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকার ভেতর হাত-পা বাঁধা অবস্থায় ছিল জুলহাসের মরদেহ। ছবি: নিউজবাংলা

পদ্মা সেতু নির্বাহী প্রকৌশলী মনে করেন, এ ঘটনার পেছনে একটি বড় সিন্ডিকেট কাজ করছে।

দু মাস আগে প্রকল্প এলাকা থেকে নিখোঁজ হন এক চীনা প্রকৌশলী ঝাও জিয়াং পিং। তার সন্ধানে নদীতে চালানো হয় অভিযান। কিন্তু তার হদিস মেলেনি। তিনি জীবিত না মৃত এ বিষয়ে কিছুই বলতে পারছে না সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্প এলাকায় এ ধরনের ঘটনা নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বিরাজ করছে। আতঙ্ক ছড়িয়েছে সাধারণ মানুষের মনে।

কী ঘটেছিল

পদ্মা সেতুর এফ-ফোর পিলারের নিচে শুক্রবার সকালে জুলহাসকে পেটান নিরাপত্তাকর্মীরা। খবর পেয়ে স্বজনরা যুবককে উদ্ধার করে শ্রীনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। কিন্তু তাকে আর বাঁচানো যায়নি।

লৌহজং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসেন জানান, চোর সন্দেহে ওই যুবককে রড দিয়ে পেটান প্রকল্পের কর্মীরা। এ ঘটনায় ১০ নিরাপত্তাকর্মী ও শ্রমিককে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। তাদের মধ্যে ৯ জনের পরিচয় জানিয়েছে পুলিশ।

তারা হলেন সেলিম, রাব্বি, তপু, আল-আমিন, আরিফ, আব্দুল মান্নান, ইস্রাফিল, রুবেল ও সুশান্ত।

পদ্মা সেতুর সংরক্ষিত এলাকায় যুবক গেলেন কীভাবে
নিহত জুলহাস হাওলাদার থাকতেন উপজেলার কুমারভোগ পদ্মা সেতু পুনর্বাসন কেন্দ্রে। তিনি অটোরিকশার চালক ছিলেন।

জুলহাসের বোন শাহানা জানান, তার ভাই সেতুর প্রকল্পের ভেতর কীভাবে গেছেন, তা জানেন না তিনি। খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে দেখেন হাত-পা বাঁধা অবস্থায় জুলহাসকে কেউ ফেলে রেখেছে।

তিনি বলেন, ‘সেতুর নিরাপত্তাকর্মীরা আমাদের বলেন, আমার ভাই নাকি চুরি করছে। পরে আমরা ভাইকে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে ডাক্তার বলে ভাই আমার মরে গেছে।’

বোন শাহানা আরও বলেন, ‘আমার ভাই চোর না; অটোরিকশা চালায়। আর চুরি করলেই কি পিটিয়ে হত্যা করতে হবে?’

নিহত জুলহাসের ভাই জনি বলেন, ‘আমার ভাই বাসা থেকে বের হয় ফজরের নামাজের পরপরই। পদ্মা সেতু প্রকল্প এলাকায় ফোরম্যান সালাম আমাদের ফোন করে বলে যে, জুলহাস আহত অবস্থায় পড়ে আছে। তাকে নিয়ে চিকিৎসা দেয়ার জন্য। আমরা গিয়ে দেখি, তার হাত-পা বাঁধা মুখে কাপড় গোঁজা।’

সংরক্ষিত ওই এলাকায় তার ভাই কীভাবে গেল, এই প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, যে কেউ চাইলে পদ্মাসেতু প্রকল্প এলাকায় ঢুকতে পারে না। প্রকল্প এলাকায় কর্মরত শ্রমিকদের সঙ্গেই আমার ভাই এফ-ফোর পিলারের কাছে যায়। আমাদেরকে ফরম্যান অটো বুঝিয়ে দেয়। অটোটি আমাদের বাসায় রয়েছে।’

হত্যার ঘটনায় পদ্মা সেতু প্রকল্পে নিয়োজিত ৯ নিরাপত্তাকর্মী ও শ্রমিককে আটক করেছে পুলিশ। ছবি: নিউজবাংলা

যা বলছে কর্তৃপক্ষ

পদ্মা সেতু নির্বাহী প্রকৌশলী দেওয়ান আব্দুল কাদের নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যুবককে পেটানোর ঘটনা ঘটেছে এফ-ফোর ও এফ-ফাইভ পিলারের মাঝামাঝি এলাকায়। চুরি করতে জুলহাস কীভাবে সেখানে ঢুকল, এটা আমরা জানার চেষ্টা করছি। তবে এফ-ফোর পিলারের নিচের কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা নেই, উপরে সিসিটিভি ক্যামেরা আছে। এ ছাড়া অন্যান্য সিসিটিভি ক্যামেরা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

‘তবে আমাদের ধারণা, এখানে একটি বড় সিন্ডিকেট কাজ করছে। স্থানীয় লোকজন হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। তদন্ত শেষে বোঝা যাবে। আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি, জুলহাস হাওলাদারের সঙ্গে আরও ১০-১২ জন ছিল। তারা পালিয়ে গেলও তিনি ধরা পড়েন।’

লৌহজং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, ‘নিহতের বড় ভাই আকবর হাওলাদার বাদী হয়ে মামলা করছেন। পদ্মা সেতু প্রকল্পের লোকজন বলছে, চুরি করতে এসেছিল তাই জুলহাসকে মারধর করা হয়েছে। কিন্তু চুরির কোনো মালামাল জব্দ করা হয়নি বা প্রকল্পের লোকজন আমাদের চুরি করা মালামাল দিতে পারেনি।’

নিউজবাংলা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.