আলু নিয়ে দিশেহারা কৃষক

কাজী সাব্বির আহমেদ দীপু: মূল্য কমে যাওয়ায় মুন্সীগঞ্জে ৭৪টি কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষিত সাড়ে ৩ লাখ টন আলু নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষক ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। কেজিপ্রতি উৎপাদন খরচ ১৮ টাকা হলেও আগস্ট মাসে আলুর মূল্য দাঁড়ায় ১০ থেকে ১১ টাকা কেজি। এতে বস্তাপ্রতি ৩৫০ টাকা লোকসান হচ্ছে তাদের।

গত বছরে এই সময়ে কোল্ড স্টোরেজ থেকে আলু খালাস হয়েছিল ৭০ শতাংশ। এবার খালাস হয়েছে ৬০ শতাংশ। এখনও ৪০ শতাংশ আলু কোল্ড স্টোরেজেই সংরক্ষিত আছে। এ হিসাবে জেলার ৭৪টি কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষিত আছে ২০ লাখ বস্তায় প্রায় সাড়ে তিন লাখ টন আলু। এতে এবার তাদের ৭০ কোটি টাকা লোকসান হবে।

এ অবস্থায় কৃষক ও ব্যবসায়ীদের লোকসানের পরিমাণ কমানোর লক্ষ্যে কোল্ড স্টোরেজ অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে জুলাই মাসে কৃষি ও খাদ্য মন্ত্রণালয়সহ একাধিক মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে রপ্তানিসহ দেশে আলুর বহুমুখী ব্যবহারের ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করা হয়। তবে এখন পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি বলে সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চলতি বছর জেলায় ৩৯ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে ১৫ লাখ টন আলু উৎপাদন হয়। জেলার ৭৪টি কোল্ড স্টোরেজে পাঁচ লাখ ৪০ হাজার টন আলু সংরক্ষণ করা হয়। এর মধ্যে বীজ আলুর পরিমাণ ৮৪ হাজার টন। বিক্রি হয়েছে মাত্র এক লাখ টন। ফলে বর্তমানে সংরক্ষিত আলু অবিক্রীত রয়েছে তিন লাখ ৫৬ হাজার টন।

টঙ্গিবাড়ীর কৃষক কবির হাওলাদার জানান, এবার তিনি দুই হাজার বস্তা আলু স্থানীয় একতা কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করেছেন। কোল্ড স্টোরেজ ভাড়াসহ বস্তাপ্রতি তার উৎপাদন খরচ হয়েছে ৯৫০ টাকা। বর্তমানে বস্তাপ্রতি আলুর বাজারমূল্য ৫৫০ টাকা হওয়ায় লোকসান হবে বস্তাপ্রতি ৪০০ টাকা। তাই দুই হাজার বস্তায় আট লাখ টাকা লোকসান গুনতে হবে- এ চিন্তায় রাতে ঘুম আসে না তার।

আলু ব্যবসায়ী সিদ্দিক বেপারী জানান, উৎপাদন ও কোল্ড স্টোরেজ ভাড়াসহ বস্তাপ্রতি খরচ পড়েছে সর্বনিম্ন ১৩শ টাকা। এখন প্রতিবস্তা আলুর মূল্য ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। সে হিসাবে বস্তাপ্রতি লোকসান হবে সর্বনিম্ন ৭০০ টাকা।

কৃষক দিলদার হোসেন জানান, কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণ করা ১০০ বস্তার মধ্যে ১০ বস্তা আলুতে পচন ধরায় তা ফেলে দিতে হয়েছে। এ অবস্থায় লাভ তো দূরের কথা, এখন মূলধন উঠানোর পরিস্থিতিও নেই। ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।

এলিট কোল্ড স্টোরেজের ম্যানেজার আওলাদ হোসেন জানান, জেলার ৭৪টি কোল্ড স্টোরেজ এখন সংরক্ষণ করা আলুতে পরিপূর্ণ। বর্তমানে বস্তাপ্রতি আলুর মূল্য ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা। ফলে বস্তাপ্রতি কৃষকদের ৩৫০ টাকা ও ব্যবসায়ীদের ৪৫০ টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে। তাই কোল্ড স্টোরেজেই আলু রেখে দিয়েছেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা।

কদম রসূল কোল্ড স্টোরেজ ম্যানেজার দুলাল মণ্ডল জানান, মুন্সীগঞ্জ জেলা ছাড়াও এবার দেশের অন্যান্য জেলায়ও আলু উৎপাদন হয়েছে। এর ফলে গত মৌসুমের তুলনায় এবার কোল্ড স্টোরেজগুলোতে ২৫ শতাংশ বেশি আলু সংরক্ষণে রয়েছে। এখন প্রতিটি কোল্ড স্টোরেজ আলুতে ভরা।

মুন্সীগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা আল মামুন জানান, যেসব কৃষক আলু জমি থেকে উত্তোলনের পরই বিক্রি করে দিয়েছেন তারা লাভবান হয়েছেন। যেসব কৃষক ও ব্যবসায়ী কোল্ড স্টোরেজে আলু সংরক্ষণ করেছেন, তারা বস্তাপ্রতি প্রায় ৪০০ টাকা লোকসানের কবলে পড়েছেন। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বেশি হওয়ায় এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

বাংলাদেশ কোল্ড স্টোরেজ মালিক সমিতির চেয়ারম্যান মোশারফ হোসেন পুস্তি জানান, বর্তমানে বস্তাপ্রতি আলুর মূল্য ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা। উৎপদান খরচ পড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এই হিসাবে বস্তাপ্রতি লোকসান গুনতে হবে সর্বনিম্ন ৪০০ টাকা। এখন পর্যন্ত ৬০ ভাগ আলু খালাস হয়েছে। অন্যান্য বছর এ সময়ে ৮০ ভাগ আলু খালাস হয়েছিল। তিনি আরও জানান, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের লোকসান কমানোর লক্ষ্যে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, খাদ্য মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়সহ একাধিক দপ্তরে আলু বিদেশে রপ্তানি ও আলুর বহুমুখী ব্যবহারের লক্ষ্যে উদ্যোগ নিতে আবেদন করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, কৃষক ও ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি কোল্ড স্টোরেজ মালিক পক্ষও লোকসানের কবলে পড়েছে। তাই কোল্ড স্টোরেজ মালিকরাও হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন।

সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.