৪ শিশুকে লঞ্চ থেকে ফেলে দেয়ার অভিযোগ ‘বানানো’

মঈনউদ্দিন আহমেদ: মিথ্যা অভিযোগ করার কারণ হিসেবে শিশুরা জানায়, লঞ্চে প্রায়ই যাত্রীর ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দেয় অপরাধী চক্র। পুলিশ যাতে তাদেরকে এ ধরনের কোনো চক্রের সদস্য না ভাবে সে জন্যই শাকিব মিথ্যা কথা বলতে প্ররোচিত করেছিল।

ভাড়া না থাকায় লঞ্চ থেকে মেঘনা নদীতে চার শিশুকে ফেলা দেয়ার একটি অভিযোগ পুলিশের বরাতে সম্প্রতি প্রকাশিত হয় সংবাদ মাধ্যমে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট লঞ্চ কর্মীদের বিরুদ্ধে রোববার হত্যাচেষ্টা মামলাও করেছে পুলিশ।

তবে ওই শিশুরা এখন বলছে, পুলিশের কাছে মিথ্যা বলেছিল তারা। তাদেরই এক সঙ্গী পুলিশের কাছে মিথ্যা বলতে বাকিদের প্ররোচিত করেছিল।

গজারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রইস উদ্দিন শনিবার সাংবাদিকদের জানান, সেদিন বেলা ১১টার দিকে স্পিডবোটে মেঘনা নদী পার হওয়ার সময় দুই শিশুর চিৎকার শুনে তাদের উদ্ধার করে মুন্সিগঞ্জ লঞ্চঘাটে নিয়ে যায় পুলিশ।

শিশুরা পুলিশকে জানায়, তারা লঞ্চে পানি বিক্রি করে। এমভি ইমাম হাসান-৫ লঞ্চে তারা ঢাকা থেকে চাঁদপুর যাচ্ছিল। ভাড়া না থাকায় কর্তৃপক্ষ তাদের লঞ্চ থেকে ফেলে দেয়।

এর এক দিন পর মুন্সিগঞ্জের মুক্তারপুর নৌপুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ লুৎফর রহমান সাংবাদিকদের জানান, শনিবার দুটি নয়, চারটি শিশুকে লঞ্চ থেকে ফেলে দেয়া হয়েছিল। দুই শিশুর বাড়ি নোয়াখালীতে এবং বাকিদের গাইবান্ধা ও কুমিল্লায়।

ওই দিনই মুন্সিগঞ্জ সদর থানায় এমভি ইমাম হাসান-৫ লঞ্চের সব স্টাফকে আসামি করে মামলা করেন লুৎফর রহমান।

তবে চার শিশুর মধ্যে তিন জন এখন বলছে, নদীতে ফেলে দেয়ার অভিযোগটি মিথ্যা। নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় উদ্ধার করা শিশু মেহেদুল এবং সাঁতরে তীরে ওঠা দুই শিশু সিয়াম ও তরিকুলের দাবি, তারা ইচ্ছা করেই লঞ্চ থেকে নদীতে ঝাঁপ দিয়েছিল। এ ধরনের ঘটনা এর আগেও তারা ঘটিয়েছে।

নদীতে ঝাঁপ দেয়ার পর সিয়াম ও তরিকুল সাঁতার কেটে তীরে ওঠে। তবে ভাসমান অবস্থায় মেহেদুল ও শাকিব নামের দুই শিশুকে উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় বিষয়টি লুকাতে পুলিশের কাছে মিথ্যা অভিযোগ করে শাকিব।

মিথ্যা বলার কারণ কী- এমন প্রশ্নের জবাবে মেহেদুল, সিয়াম ও তরিকুল জানায়, লঞ্চে প্রায়ই যাত্রীর ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দেয় অপরাধী চক্র। পুলিশ যাতে তাদেরকে এ ধরনের কোনো চক্রের সদস্য না ভাবে সে জন্যই শাকিব মিথ্যা কথা বলতে প্ররোচিত করেছিল।

মেহেদুল, সিয়াম ও তরিকুল সোমবার রাতে একটি ভিডিও অকপটে বিষয়টি স্বীকার করে। তবে আরেক শিশু শাকিব কোথায় আছে তা জানা যায়নি।

গজারিয়া থানা পুলিশের মাধ্যমে উদ্ধার হওয়া মেহেদুল জানায়, নদীতে ভাসমান অবস্থায় পুলিশকে দেখতে পায় শাকিব। এরপর সে লঞ্চ থেকে ফেলে দেয়ার ‘গল্প’ শিখিয়ে দেয়। পুলিশ তাদের উদ্ধার করলে শাকিব নিজেই পুলিশের কাছে এই মিথ্য অভিযোগটি করে।

অন্য দুই শিশু জানায়, সদরঘাট থেকে তারা লঞ্চে উঠেছিল। সেখান থেকে মুন্সিগঞ্জ ঘাটের কাছে পৌঁছে মাঝ নদীতে যাত্রী উঠা-নামায় নিয়োজিত ট্রলারে করে তীরে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। তবে মুন্সিগঞ্জে ট্রলার চালকেরা তাদের নামতে দেন। এরপর পরে চাঁদপুরের অভিমুখে চলতে থাকা লঞ্চ থেকে সঙ্গীদের নদীতে লাফ দিতে বলে শাকিব। এক পর্যায়ে সে তরিকুলকে ধাক্কা দিয়ে নদীতে ফেলে দেয়। এরপর একে একে সবাই নদীতে ঝাঁপ দেয়।

পরে সিয়াম ও তরিকুল সাঁতরে তীরে উঠতে পারলেও ভাসতে থাকে মেহেদুল ও শাকিব। তাদের উদ্ধার করে পুলিশ।

ভিডিওতে শিশুরা জানায়, লঞ্চের স্টাফ ও পুলিশ কেউ তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করেনি। এমভি ইমাম হাসান-৫ লঞ্চের মাস্টার দেলোয়ার হোসেনসহ অন্য কর্মীরাও লঞ্চ থেকে শিশুদের ফেলে দেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

এ বিষয়ে নৌ-পুলিশ সুপার মিনা মাহমুদা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গজারিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দুটি শিশুকে উদ্ধার করেন নদী থেকে। এই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। পরে আমাদের মুক্তারপুর নৌ পুলিশের আইসি বাদী হয়ে একটি মামলা করেন।’

তিনি বলেন, ‘উদ্ধার করা দুই শিশু বলেছিল, তাদের লঞ্চ থেকে ফেলে দেয়া হয়েছে। এজন্য আমাদের মামলা করতে হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। যদি লঞ্চ কর্তৃপক্ষ তাদের ফেলে না দেয় এবং শিশুরা যদি নিজেরাই ঝাঁপ দিয়ে থাকে তাহলে তদন্ত রিপোর্টের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

নিউজ বাংলা২৪

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.