বজ্রযোগিনী গ্রাম

[ষষ্ঠ শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে বজ্রযোগিনী গ্রামের উল্লেখ আছে]
মুন্সীগঞ্জ জেলার সদর উপজেলায় বজ্রযোগিনী গ্রামটি অবস্থিত। অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের (৯৮০-১০৫৩) স্মৃতিবিজড়িত বজ্রযোগিনী গ্রাম। গ্রামটির নামকরণ নিয়ে কিছুটা মতান্তর রয়েছে। ইতিহাস থেকে জানা যায়, সম্রাট শেরশাহের যুদ্ধের সময় পরাজিত এক হিন্দু রাজা ‘বরজ’ নামের এক মেয়েসহ এই গ্রামে বসবাস করতে আসেন। তাঁর মেয়ে পরবর্তী সময়ে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েন এবং বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন।

এক পর্যায়ে এই মেয়ে বরজ সন্ন্যাসিনী বা যোগিনী হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। কথিত আছে, এই সন্ন্যাসিনী তাঁর অনুসারীদের নিয়ে সপ্তাহে এক দিন সাত মাইল দূরে মুন্সীগঞ্জের ঘাটে এসে স্নান করতেন। একসময় এই ঘাট পরিচিতি পায় ‘যোগিনী ঘাট’ হিসেবে। ‘বরজ’ নামটি কালক্রমে পরিবর্তিত হয়ে ‘বজ্র’ হয় এবং সেই অনুসারে গ্রামটির নাম হয় ‘বজ্রযোগিনী’। বজ্রযোগিনীতে দেখতে পাওয়া যাবে প্রাচীন জমিদারবাড়ি, শান-বাঁধানো ভগ্নপ্রায় পুকুরঘাট এবং কালের আঘাতে জরাজীর্ণ ঘরবাড়ি। এই গ্রামেরই বাতাসে একদিন শ্বাস নিতেন অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান। এখানকার পথেঘাটে ধুলো মেখে বড় হয়েছেন তিনি। অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান ছিলেন বৌদ্ধ পণ্ডিত, ধর্মগুরু ও দার্শনিক। দশম-একাদশ শতকের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বাঙালি পণ্ডিত দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান ৯৮০ সালে এই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা কল্যাণশ্রী ও মাতা প্রভাবতী দেবী। তাঁর বাল্যনাম ছিল চন্দ্রগর্ভ। মায়ের নিকট এবং স্থানীয় বজ্রাসন বিহারে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে তিনি বিখ্যাত বৌদ্ধগুরু জেতারির নিকট বৌদ্ধ ধর্ম ও শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন।

বৌদ্ধশাস্ত্র, চিকিৎসাবিদ্যা ও কারিগরিবিদ্যা বিষয়ে তিব্বতি ভাষায় অনেক গ্রন্থ রচনা করেন বলে তিব্বতিরা তাঁকে ‘অতীশ’ উপাধিতে ভূষিত করে। অতীশ দীপঙ্কর অনেক সংস্কৃত ও পালি বই তিব্বতি ভাষায় অনুবাদ করেন। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন নালন্দা ও বিক্রমশীল বিশ্ববিদ্যালয়ে অতীশ দীপঙ্কর পাঠদান করেন। ৭৩ বছর বয়সে তিব্বতের লাসানগরের কাছে লেথান পল্লীতে ১০৫৩ সালে মারা যান এই পণ্ডিত। বজ্রযোগিনী গ্রামে তাঁর বাসস্থানকে স্থানীয় অধিবাসীরা বলে থাকেন ‘পণ্ডিতের ভিটা’। ভিটার ঠিক মাঝখানে চমৎকার চীনা স্থাপত্যরীতিতে নির্মিত সৌধ। সৌধের ঠিক নিচে অতীশ দীপঙ্করের ১০২২তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়েছে।

রিদওয়ান আক্রাম
কালের কন্ঠ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.