৭০ কিলোমিটার সাইকেল চালিয়ে ক্রিকেট প্রশিক্ষণে ইয়ামিন

নাসির উদ্দিন উজ্জ্বল: মুন্সীগঞ্জ সিরাজদিখানে উপজেলার বাসাইল ইউনিয়নের পাথরঘটা গ্রামের ছেলে ইয়ামিন চৌধুরী। সরকারি হিসেব মতে এই এলাকাতে জনসংখ্যা আছে মোট তিন হাজারের একটু কম। এই মানুষগুলোর মধ্যে ইয়ামিন চৌধুরী তিলে তিলে পুড়ে পুড়ে কবে যে রত্ন হয়ে গেছে অত্র এলাকার অনেকেই তা জানেন না। ইয়ামিন চৌধুরীর নেশা এখন ক্রিকেট। ইয়ামিন চৌধুরী চর্চায় সব বয়সী মানুষের আনাগোনা।

ডানহাতি ব্যাটসম্যান ও উইকেট কিপার। নিজ উপজেলা ও গ্রাম ভিত্তিক টেপ টেনিস বলে টুর্নামেন্ট খেলে মুগ্ধতা ছড়ান। সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে স্বপ্ন বুনেন ক্রিকেটার হওয়ার। আর শুরু করে দেন কঠোর পরিশ্রম। কিন্তু ক্রিকেট যে রাজকীয় খেলা। ক্রিকেট উপকরণ ও প্রশিক্ষণ এ সব কিছুর জন্য চাই একটি সঠিক গাইড লাইন। যা তার নেই।

কেননা, বাবা ছাড়া মায়ের হাতে গডে উঠা দরিদ্র পারিবারে মেঝ সন্তান ইয়ামিন। মা বেসরকারি একটি হাসপাতালে আয়া হিসাবে কাজ করেন। এই আয়ে কোনরকম সংসার চলে।

ইয়ামিন এসএসসি সম্পন্ন করে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হতেই ক্রিকেটে পরিবারের নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু দমে যাননি ইয়ামিন। এলাকার পাভেল নামের এক বড় ভাইয়ের উৎসাহে ভর্তি হন ধানমন্ডির আবাহনী মাঠের মো. সোহেলের ’৭১ নামক ক্রিকেট একাডেমিতে। বিপত্তি যাতায়াতের।

পড়াশুনার পাশাপাশি শুরু করেন টিউশনি। সে উপার্জন কিনেন একটি বাই-সাইকেল। আর প্রতিদিন সাইকেল চালিয়ে ৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে আবাহনীর মাঠে প্রাকটিস করছে ইয়ামিন। ’৭১ একাডেমির হয়ে আবাহনীর মাঠে একাডেমিক ভিত্তিক বঙ্গবন্ধু গোল্ড কাপ টুর্নামেন্ট খেলে গত আসরে করেছেন দুর্দান্ত পারফরমেন্স। করেন অর্ধশত রান।

ইয়ামিন চৌধুরী জানান, জাতীয় দলের ক্রিকেটার মুশফিকুর রহিম তার আইডল। তাকে অনুসরণ করেই যাত্রা করেন। সুযোগ পেলে দেখা করতে চান মুশিফিকের সঙ্গে। নিতে চান টিপস আর ভবিষ্যতে জাতীয় দলকে দিতে চান নিজের সেরা ক্যারিয়ার।

তিনি আরও বলেন, আমি দরিদ্র ঘরের সন্তান হয়ে জন্ম নিয়েছি। একাডেমির ওস্তাদ করিমসহ আমার বন্ধুরা আমাকে খুব দেখভাল করেন। আমার কষ্টে ব্যথিত হন সবাই। সত্যি বলতে আমি প্রাকটিস এ আসলে আমি খুব ক্লান্ত থাকি। লাঞ্চ টাইম ব্রেক টাইম সবাই টিফিন করলেও আমি করি না।

কারণ জানতে চাইলে বলেন, সেই সামর্থ্য আমার নেই বলতেই চোখ দিয়ে পানি ঝরতে থাকে। ওস্তাদ করিম আমাকে ক্রিকেটের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।

ইয়ামিনকে সহযোগিতা করা ও উৎসাহ দেওয়ার কাজ করতেন জহির খান। বলেন, ইয়ামিন চৌধুরী সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়, ভালো ক্রিকেট খেলে। তার প্রতিভা আমাদের কাজে লাগানো প্রয়োজন। আমাদের এলাকাতে কতিপয় লোক ছাড়া তেমন কোন সহযোগিতা সে এখনো পায়নি। সিরাজদিখানে ক্রিকেট খেলা শিখার তেমন কোন মাধ্যম নাই। এছাড়া মুন্সীগঞ্জেও তেমন সুযোগ সুবিধা নেই। বিধায়, ইয়ামিন চৌধুরী প্রতিদিন সাইকেল চালিয়ে ৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে যান আবাহনীর মাঠে।

তিনি বলেন, আমরা এলাকাবাসী বা এলাকার মানুষ হিসেবে স্থানীয় উপজেলা জেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসকের সহযোগিতা কামনা করেন। মুন্সীগঞ্জের এই প্রতিভা একদিন জাতীয় ক্রিকেট দলে স্থান পাবে, এমন আশা এলাকাবাসীর।

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক ও মুন্সীগঞ্জের কৃতি সন্তান গাজী আশরাফ হোসেন লিপু জানান, ভালো ক্রিকেটার তৈরি করতে তৃণমূলে মানসম্মত প্রশিক্ষক প্রয়োজন। তাহলে ইয়ামিনদের এত কষ্ট করতে হবে না।

স্থানীয় ক্রিকেটাররা জানান, এই জেলার কোন ক্রিকেট কোচ আপাতত নেই। নারায়ণগঞ্জ থেকে মাঝে মাঝে অনিয়মিত একজন আসেন, তিনিই বিসিবির কোচ। কিন্তু মুন্সীগঞ্জের বাসিন্দা এমন কোচ নিয়োগ দেওয়া গেলে সার্বক্ষণিক ক্রিকেটারদের খোঁজখবর করা এবং প্রশিক্ষণসহ ম্যাচ খেলানো সবই হতো।

ইয়ামিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে রওনা দেন ঢাকায়। সপ্তাহে পাঁচ দিন এই প্রশিক্ষণে যান তিনি। এছাড়া ঢাকার বোরহানউদ্দিন কলেজে হিসাব বিজ্ঞান বিভাগে স্নাতক(সম্মান) শ্রেণির প্রথম বর্ষের ছাত্র।

গত আড়াই বছর ধরে ঢাকায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছেন বলে জানান তিনি। তবে মাঝে করোনার কারণে বেশকিছু দিন বন্ধ ছিল। ভোরে তার ঢাকায় যেতে দেড় ঘণ্টা সময় লাগলেও প্রশিক্ষণ শেষে বাড়ি ফেরার সময় রাস্তায় ভিড় থাকায় সময় লাগে আড়াই ঘণ্টা। তার বাড়ি থেকে ধানমন্ডি যাওয়া-আসার দূরত্ব প্রায় ৭০ কিলোমিটার।

তার স্বপ্ন মুশফিকুর রহিমের মত ক্রিকেটার হয়ে জাতীয় ক্রিকেটে বড় অবদান রাখবেন। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন ইয়ামিন।

সময় টিভি

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.