তিন ফসলি জমি কেটে মাটি নিয়ে যাচ্ছে অবৈধ ইটভাটায়

মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখান উপজেলায় আইন ও প্রশাসনের কোনো তোয়াক্কা না করে তিন ফসলি জমির মাটি কেটে অবৈধ ইটভাটায় নিয়ে যাচ্ছে প্রভাবশালী একটি মহল। এতে ওই এলাকার কৃষি জমিগুলোতে ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। জমিতে ফসল উৎপাদন করতে না পেরে অসহায় হয়ে পড়েছেন কৃষকরা।

অন্যদিকে, এসব প্রভাবশালী ও তাদের ছত্রছায়ায় সিরাজদিখানের লতব্দী ইউনিয়নের উত্তরপাশে ধলেশ্বরী নদীর পাড় ঘেঁষে ১২ থেকে ১৫টি অবৈধ ইটভাটা গড়ে উঠেছে। এসব ইটভাটায় স্থানীয় গাছপালা, কাঠ-লাকড়ি অথবা পরিবেশ দূষণকারী পুরোনো টায়ার পুড়িয়ে ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে ইটভাটার ধোঁয়ায় পরিবেশ এমনভাবে নষ্ট হয়েছে আশপাশের বিশাল এলাকার ফসলি জমিগুলোতে কোনো ফসলই হচ্ছে না। পাশাপাশি স্থানীয় বাসিন্দারা শ্বাসকষ্ট, হাঁচি, কাশি, চর্মসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় এসব প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ভুক্তভোগী ও কৃষকদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন না কেউ। অসহায় হয়ে সবাই এখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে তাকিয়ে আছেন। কেননা প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেছেন, কোনো ফসলি জমি নষ্ট করা যাবে না। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে হলে ফসলি জমির বিকল্প নেই।

১ এপ্রিল রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের ফটকের সামনে অবৈধভাবে ফসলি জমির মাটি কাটা ও বালু উত্তোলন এবং পরিবেশের মারাত্মক বিপর্যয় প্রতিরোধে মানববন্ধনও হয়। সেখানে এ বিষয়ে দিনব্যাপী ফটোসাংবাদিক ফোজিত শেখ বাবুর আলোকচিত্র প্রদর্শনী ‘কৃষক বাঁচাও’ প্রদর্শিত হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সরকারের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও প্রভাবশালীরা তিন ফসলি জমির মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে প্রশাসন নামকাওয়াস্তে অভিযান চালালেও পুরোপুরি আন্তরিকতা দেখা যায়নি। অভিযোগ রয়েছে, যারা এ অবৈধ ব্যবসা করছেন, তারা প্রতিদিন টাকা দেন। অর্থের বিনিময়ে প্রশাসনের কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করেন। কোনো অভিযানের সিদ্ধান্ত নিলে এসব কর্মকর্তারা আগেই ভূমিখেকোদের জানিয়ে দেন। ফলে আগে থেকেই তারা সাবধান হয়ে যান।

সিরাজদিখানের বাসাইল, লতব্দী ও বালুরচরে এ পর্যন্ত প্রায় ৩০০ বিঘা ফসলি জমির মাটি কেটে খণ্ড খণ্ড খালের মতো করা হয়েছে। বর্তমানে আরও ১০০ থেকে ১৫০ বিঘা জমির মাটি কাটার পরিকল্পনা চলছে।

প্রভাবশালীরা ফসলি জমির ১৫ থেকে ২০ ফুট গভীর করে মাটি কেটে নিয়ে ইটভাটায় সরবরাহ করছে। ফলে বিক্রমপুরের আলু বলে খ্যাত জেলার যে লক্ষ্যমাত্রা তা অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। সরিষা, ডাল, ধানসহ কোনো শস্যই চাষ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফসলি জমি থেকে উত্তোলনকৃত মাটি ইটভাটায় নেওয়ার জন্য মাহিন্দ্রা গাড়ি (বড় চাকার এক ধরনের গাড়ি যা সাধারণ অমসৃণ রাস্তায় ব্যবহার করা হয়) ব্যবহার করা হচ্ছে। এ গাড়ির চাকার আঘাতে স্থানীয় সরকার বিভাগের অর্থে ও ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) তত্ত্বাবধানে যে গ্রামীণ সড়ক রয়েছে তা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। যে সড়কের মেয়াদ ১০ বছর ধরা হয়েছিল, তা এক বছরেই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। রাস্তায় মাঝখানে ও পাশে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। রাতজুড়ে রাস্তা দিয়ে ভেকু ও গাড়ি চলে। ফলে রাতে শান্তিমতো ঘুমানোরও সুযোগ নেই।

এসব বিষয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, পরিবেশ অধিদপ্তরে লিখিতভাবে অভিযোগ করাসহ স্থানীয়ভাবে সংবাদ সম্মেলন ও মানববন্ধন করা হয়েছে। কোনো প্রতিকারই মেলেনি। বরং প্রতিবাদকারীদের প্রকাশ্যে মারধর করে প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে ভূমিদস্যুরা। স্থানীয় প্রশাসন কোনো এক কারণে নীরব ভূমিকা পালন করছে।

এ ব্যাপারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে প্রধানমন্ত্রীর আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

যুগান্তর

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.