হিমাগারে জায়গা না পেয়ে গোলায় আলু রেখে কৃষকের মাথায় হাত

মুন্সিগঞ্জের অনেক কৃষক এবার হিমাগারে আলু রাখার জায়গা না পেয়ে স্থানীয়ভাবে গোলায় সংরক্ষণ করেছিলেন। অনেকে আবার পর্যাপ্ত গোলার অভাবে উঁচু জমির পাশে পরিত্যক্ত ভিটাতেও আলু সংরক্ষণ করেছিলেন। তাদের সেই আলুতে পচন ধরেছে। কৃষকরা বলছেন, অর্ধেকেরও বেশি আলু পচে গেছে। যেগুলো আছে সেগুলো বিক্রি করতে হচ্ছে অর্ধেক দামে।

অথচ, এ বছর আলু তোলার মৌসুমে দাম কম থাকায় বাড়িতে ও জমিতে আলু সংরক্ষণ করেছিলেন অনেক কৃষক। কিন্তু আলু উত্তোলনের দীর্ঘদিন অতিবাহিত হলেও কাক্ষিত দাম না বাড়ায় বাড়িতে আলু সংরক্ষণের সময়ও বাড়তে থাকে।

গত এক সপ্তাহ ধরে আলুর দাম কিছুটা বেড়েছে। কৃষকও আলু বিক্রি করতে শুরু করেছে। কিন্তু গোলা ভেঙে আলু বিক্রি করতে গিয়ে মাথায় হাত পড়েছে কৃষকের। কারণ, অধিকাংশ গোলায় রাখা অর্ধেকেরও বেশি আলু পচে নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া গোলার বাইরে উঁচু জমিতে পরিত্যক্ত ভিটায় যে আলু সংরক্ষণ করেছিলেন সেগুলোও প্রায় নষ্ট হয়ে গেছে।

এ বছর আলু উত্তোলন মৌসুমে ঘূর্ণিঝড় জোয়ারের প্রভাবে বৃষ্টিতে একদফা আলুর বীজ পচে নষ্ট হওয়ার পর পুনরায় বাড়তি দামে বীজ কিনে আলু রোপন করেছিলেন কৃষক। এতে উৎপাদন খরচ হয়েছিল দ্বিগুন। তারপরে উত্তোলন মৌসুমেও কয়েক দফা বৃষ্টিতে বাড়তি দামের শ্রমিক দিয়ে আলু উত্তোলন করতে গিয়ে ব্যয় আরো বেড়েছে।

মুন্সিগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলায় ৩৫ হাজার ৭৮৬ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ৩০.৬২ মেট্রিক টন করে আলু পাওয়া গেছে। সেই হিসাবে এ বছর ১০ লাখ ৯৫ হাজার ৭৬৭ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হয়েছে। জেলায় আলু সংরক্ষণের জন্য ৬৪টি সচল হিমাগার রয়েছে। এসব হিমাগারে সাড়ে পাচঁ লাখ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে।

বাকি আলু হিমাগারে সংরক্ষণ করতে না পেরে কেউ জমিতে, কেউ আবার বাড়ির গোলায় এবং পরিত্যক্ত উঁচু ভিটায় সংরক্ষণ করে রেখেছিল।

তবে স্থানীয় কৃষকদের দাবি আলু উত্তোলন মৌসুমে দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে প্রচুর পরিমাণ আলু মুন্সিগঞ্জের হিমাগারগুলোতে এসেছে। এ কারণে তারা বীজ আলু ছাড়া তেমন কোনো আলুই হিমাগারে সংরক্ষণ করতে পারেননি। এতে বাড়িতে আলু রেখেছিলেন অনেক কৃষক। তাদের সেই আলু পচে নষ্ট হয়ে গেছে।

আলু ব্যবসায়ী ও কৃষক আমির মোল্লা বলেন, এ বছর গোলায় রাখা অর্ধেক আলু পচে গেছে। গোলার বাইরে পরিত্যক্ত ভিটায় যে সমস্ত আলু রাখা হয়েছিল সব পচে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। এ বছর জমিতে আলু বৃষ্টি পাইছে। তোলার পরে আলু ঘরে নেওয়ার পরেই পচন
ধরেছে।

তিনি বলেন, উত্তরাঞ্চলের আলু এ বছর আমাদের দেশে প্রচুর আসছে। যার কারণে আমরা হিমাগারে আলু রাখতে পারিনি। কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ লাখ বস্তা আলু উত্তরবঙ্গ থেকে মুন্সিগঞ্জের কোল্ডস্টোরে আনা হয়েছে। এজন্য আমরা আলু রাখতে পারি নাই।

কৃষক মানিক তালুকদার বলেন, এ বছর একবার আলু লাগাইলাম বৃষ্টিতে তলায় গেল। আবার লাগাইলাম তোলার সময় আবারো বৃষ্টি হইলো। গোলায় রাখার পর আমাদের আলু নষ্ট হয়ে গেল। এখন আলু ১৫/১৬ টাকা কেজি বিকাইতেছে। কিন্তু আমাদেরতো আলু নাই, সব পচে আগেই নষ্ট হয়ে গেছে। আলু উঠানোর পর আমরা ৫ টাকা কেজিও আলু বিক্রি করছি। বদলি (শ্রমিকের) দামও পামু না।

টঙ্গিবাড়ী উপজেলার নয়াগাঁও গ্রামের সোনিয়া বলেন, স্টোর আগেই বুকিং হয়ে গেছে। আলু রাখতে পারি নাই। বাসায় রেখেছিলাম। ৪ ভাগের ৩ ভাগই পচে নষ্ট হয়ে গেছে।

কৃষক স্বপন মিয়া বলেন, স্টোরে জায়গা না পেয়ে বাড়িতে আলু রাখছিলাম। আলু পচে সব নস্ট হয়ে গেছে। নষ্ট আলু বেপারিরা কিনতে চায় না। বলে, বাজারে যে দামে বর্তমানে আলু বিক্রি হচ্ছে তার অধের্ক দাম দেব। বাধ্য হয়ে অর্ধেক দামে আলু বিক্রি করতাছি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মো. খুরশিদ আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমাদের দেশের কৃষকরা গোলায় আলু সংরক্ষণের পর আর আলু বাছাই করেন না। এ কারণে গোলায় একটি পচা আলু থাকলে তা থেকে দ্রুত অন্যান্য আলুতে পচন ছড়ায়। বৃষ্টিপাতের পরে জমি ভালোভাবে শুকানোর আগে আলু তুললে ও আলু ভেজা থাকলে তা বস্তায় ভরলে কিংবা গোলার মধ্যে রাখলে তা থেকেও দ্রুত আলুতে পচনের সৃষ্টি হয়।

তিনি আরো বলেন, এ বছর আলু রোপন মৌসুমে বৃষ্টিপাতের কারণে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২ হাজার হেক্টর কম জমিতে ৩৫ হাজার ৭৮৬ হেক্টর জমিতে আলু রোপন হয়েছিল। প্রতি হেক্টরে ৩০.৬২ মেট্রিক টন করে আলু উৎপাদন হয়েছে।

ঢাকা পোষ্ট

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.