বিদায় জাপানের রাজনীতির ‘বরপুত্র’ শিনজো আবে

রাহমান মনি: রাজনীতির বরপুত্র বলতে যদি কোনো প্রবাদ থেকে থাকে তাহলে নিঃসন্দেহে জাপানের রাজনীতির আকাশে জ্বলজ্বল করা ধ্রুবতারাদের মধ্যে অন্যতম বরপুত্র হিসেবে প্রথমেই যে নামটি উচ্চারিত হবে তা হচ্ছে সদ্য প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে।

শিনজো আবে ১৯৫৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর টোকিওর একটি বিশিষ্ট রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। প্রাক-যুদ্ধ, যুদ্ধকালীন এবং যুদ্ধ-পরবর্তী জাপানে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক প্রভাব ছিল পরিবারটির।

১৯৭৭ সালে সেইকি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন শিনজো আবে। পরে তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান এবং ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার স্কুল অফ পলিসি, প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে পাবলিক পলিসি অধ্যয়ন করেন।

১৯৭৯ সালের এপ্রিলে কোবে স্টিলের জন্য কাজ শুরু করেন আবে। ১৯৮২ সালে তিনি ওই প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করেন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্বাহী সহকারী, এলডিপি জেনারেল কাউন্সিলের চেয়ারপারসনের ব্যক্তিগত সচিব এবং এলডিপি মহাসচিবের ব্যক্তিগত সচিবসহ বেশ কয়েকটি সরকারি পদে দায়িত্ব পালন করেন।

জাপানের অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের তৃতীয় প্রজন্মের সদস্য শিনজো আবে। তার এক দাদা কান আবে একজন ঝানু রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ইয়ামাগুচি প্রিফেকচারে ছিল তার একচ্ছত্র নেতৃত্ব।

আবের পিতা শিনতারো আবে ছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর জাপানের অন্যতম সফল প্রধানমন্ত্রী ইয়াসুহিরো নাকাসোনের মন্ত্রিসভার পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি ১৯৮২ সালের ২৭ নভেম্বর থেকে ১৯৮৬ সালের ২২ জুলাই পর্যন্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

শিনজো আবের নানা নোবুসুকে কিশি ছিলেন জাপানের ৫৭তম প্রধানমন্ত্রী। ১৯৮৭ সালের ৭ আগস্ট ৯০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হলেও শিনজো আবে পরিবারতন্ত্রের ধারাবাহিকতার সুবিধায় দল এবং দেশের শীর্ষ পদে আসীন হননি। সম্পূর্ণ নিজ যোগ্যতায় মাঠ পর্যায়ের নেতা থেকে ধাপে ধাপে শীর্ষ পদে আসীন হওয়ার গৌরব অর্জন করতে সক্ষম হন।

জাপানের রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম পরিচিত ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আবে শুধু একটি নামই নয়, একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিষ্ঠান।

১৯৯১ সালে পিতার মৃত্যুর পর ১৯৯৩ সালে ইয়ামাগুচি প্রিফেকচারের একটি জেলায় প্রথম নির্বাচিত হন আবে। নির্বাচিত ৪ জন প্রতিনিধির মধ্যে সর্বাধিক ভোট পেয়ে জয়ী হন তিনি।

১৯৯৯ সালে তিনি সামাজিক বিষয়ক বিভাগের পরিচালক হন। তিনি ২০০০-২০০৩ পর্যন্ত ইয়োশিরো মোরি মন্ত্রিসভায় এবং ৩১ অক্টোবর ২০০৫ থেকে ২৬ সেপ্টেম্বর ২০০৬ পর্যন্ত জুনিচিরো কোইজুমি মন্ত্রিসভায় ডেপুটি চিফ ক্যাবিনেট সেক্রেটারি ছিলেন। এরপর তিনি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির সেক্রেটারি জেনারেল নিযুক্ত হন।

কোইজুমি ক্যাবিনেটের ডেপুটি চিফ ক্যাবিনেট সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালনের করার সময় তিনি জাপানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উত্তর কোরিয়া সফর করেছিলেন।

২০০৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৭ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মোট ৩৬৬ দিন প্রথম মেয়াদে শিনজো আবে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তখন তার বয়স ছিল ৫২ বছর। জাপানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে কম বয়সী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তিনি।

২০০৭ সালে মুসলিম বিশ্বের সম্মানে নিজ কার্যালয়ে তিনি ইফতার পার্টির আয়োজন করেন।

২০১২ সালে আবে আবার ক্ষমতায় আসেন। এর মাধ্যমে ১৯৪৮ সালের পর জাপানের ইতিহাসে কোনো প্রধানমন্ত্রী দ্বিতীয়বারের মতো ক্ষমতায় আসেন।

২০১২ সালে অবশ্য অল্প সময়ের জন্য বিরোধী দলের নেতা ছিলেন তিনি।

২০১২ সালের ২৬ ডিসেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি দ্বিতীয় মেয়াদে এবং ২০১৪ সালের ২৪ ডিসেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ১ নভেম্বর পর্যন্ত তৃতীয় মেয়াদে মোট ২ হাজার ৯৬ দিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৭ সালের ১ নভেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ১ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি চতুর্থবারের মতো প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

দলীয় সভাপতি নির্বাচিত হয়ে একই বছর নভেম্বর থেকে তিনি পঞ্চমবারের মতো দায়িত্ব পালন করার ম্যান্ডেট পান।

আর পঞ্চমবার তিনি পুরো দায়িত্ব পালন না করেও জাপানের দীর্ঘমেয়াদী দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রীর রেকর্ড গড়েন। শুধু তাই নয়, আবেই একমাত্র টানা ৪ বার দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

একটানা ২ হাজার ৮২১ দিনসহ মোট ৩ হাজার ১৮৭ দিন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে ইতিহাস গড়েন।

২০২০ সালে স্বাস্থ্যগত সমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি পদত্যাগ করেন। পরে জানা যায়, তিনি আলসারেটিভ কোলাইটিজে ভুগছেন।

শিনজো আবেকে তরুণ ও পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখা হতো। তবে তিনি রাজনীতিতে নিয়ে এসেছেন তৃতীয় প্রজন্মের কিছু রাজনীতিবিদকে। যারা এসেছেন উচ্চপদস্থ এবং রক্ষণশীল পরিবার থেকে।

আবের বড় ভাই হিরোনোবু আবে মিতসুবিশি শোজি প্যাকেজিং করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট এবং সিইও ছিলেন। তার ছোট ভাই নোবুও কিশি পররাষ্ট্রবিষয়ক সিনিয়র ভাইস-মিনিস্টার ছিলেন।

তিনি জাপানের অর্থনীতিকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছেন।

আবে তার সরকারের আর্থিক নীতিমালার জন্য সুপরিচিত। তার সরকারের এই আর্থিক নীতি ‘আবেনোমিকস’ নামে পরিচিত। তিনি প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়িয়ে সামরিক বাহিনীকে শক্তিশালী করেছিলেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আবের সরকার প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে সেনাবাহিনীকে যুদ্ধ করার অনুমতি দেয়। ২০১৪ সালে আবের সরকার সংবিধানে ঐতিহাসিক পরিবর্তন আনে।

আবে ১৯৮৭ সালে একজন সোশ্যালাইট এবং সাবেক রেডিও ডিস্ক জকি আকিয়ে মাতসুজাকিকে বিয়ে করেন। তিনি জাপানের বিখ্যাত চকোলেট প্রস্তুতকারক কোম্পানি মরিনাগার প্রেসিডেন্টের কন্যা।

আবে-মাতসুজাকি দম্পতি নিঃসন্তান ছিলেন ।

গত ১০ জুলাই উচ্চকক্ষের নির্বাচনকে সামনে রেখে ৮ জুলাই পশ্চিম জাপানের নারা শহরের একটি রেলস্টেশনের বাইরে বক্তব্য দেওয়ার সময় আবেকে গুলি করা হয়। সেদিনই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান জাপানের রাজনীতির এই বরপুত্র।

শান্তিপ্রিয় দেশ জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর এমন মৃত্যু নাড়া দিয়েছে পুরো বিশ্বকে।

এ ঘটনায় সন্দেহভাজন তেৎসুইয়া ইয়ামাগামি (৪১) নামের এক ব্যক্তিকে আটক করেছে পুলিশ। ইয়ামাগামি নৌ-সেলফ ডিফেন্স ফোর্সে ২০০২ সালে যোগদান করেছিলেন এবং সেখানে ৩ বছর কাজ করেছিলেন।

শিনজো আবে যখন বক্তৃতা দিচ্ছিলেন, তখন তাকে পেছন থেকে গুলি করা হয়। বেলা সাড়ে ১১টায় আবে বক্তব্য দিতে শুরু করেন। ২ মিনিট পর মাত্র ১০ মিটার পেছন থেকে মোট ৩ রাউন্ড গুলি করা হয় তাকে।

প্রথম গুলিটি মিস হলে ৩ সেকেন্ড পর পরপর আরও দুটি গুলি করা হয় তাকে। একটি গুলি তার ঘাড়ের ডান পাশে এবং অপরটি বাম কলার বোনে আঘাত করে।

গুলিবিদ্ধ আবে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। রক্তক্ষরণ শুরু হলে তাকে সঙ্গে সঙ্গে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।

১২ জুলাই রাজধানীর জোযোজি মন্দিরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাপান রাজনীতির বরপুত্র শিনজো আবের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। আর তার সঙ্গে সঙ্গে ‘আবে’ নামক প্রতিষ্ঠানটির পরিসমাপ্তি ঘটে।

তার মরদেহ মন্দিরে নেওয়ার সময় হাজার হাজার শোকার্ত মানুষ পথের দুধারে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে তাকে বিদায় জানান। এ সময় অনেককেই কাঁদতে দেখা যায়।

আমরা তার বিদেহী আত্মার প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।

আবে কতটা বিনয়ী ছিলেন পাঠকদের কাছে তার একটি উক্তি তুলে ধরলেই বোঝা যাবে-

শিনজো আবে বলতেন, ‘আমি জনগণের জন্য যা করতে পেরেছি তার জন্য আমাকে ধন্যবাদ দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং আমি জনগণের জন্য যা করতে পারিনি সেটার জন্য দুঃখিত।’

উল্লেখ্য, জাপানে বন্দুক সহিংসতার ঘটনা খুব কম। দেশটিতে ছোট বন্দুকের (হ্যান্ডগান) ব্যবহার নিষিদ্ধ।

rahmanmoni@gmail.com

ডেইলি ষ্টার

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.