মুন্সিগঞ্জে সিমেন্ট ফ্যাক্টরির দূষণে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

ধলেশ্বরি ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীরবর্তী এলাকা ঘিরে গড়ে উঠেছে সিমেন্ট উৎপাদনকারী একাধিক কারখানা। এসব সিমেন্ট কারখানা পরিবেশ দূষণ করছে নিয়মিত। বিপর্যস্ত ও ক্ষতির মুখে পড়ছেন স্থানীয় হাজারো মানুষ।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, খোলা ক্রেনে করে সিমেন্ট ফ্যাক্টরিতে খালাস হচ্ছে ক্লিংকার। বয়লারের চিমনি থেকে ধোঁয়া আকারে বের হয়ে আসছে ফ্লাইঅ্যাশ। যা বাতাসের সাথে মিশে দূষিত করছে আশপাশের পরিবেশ। মুন্সিগঞ্জ থেকে নারায়নগঞ্জ যাওয়ার যাত্রীবাহী লঞ্চ, ট্রলারসহ বিভিন্ন নৌযানের কর্মচারি ও যাত্রীদের নাক মুখ ঢেকেও রেহাই পাচ্ছে না ডাস্ট কিংবা ধুলোবালি থেকে। এনিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই।

সিমেন্ট ফ্যাক্টরিগুলোর জাহাজ লোডিং-আনলোডিং হয় খোলামেলা পদ্ধতিতে। যদি ইনডোর আনলোডিংয়ের মাধ্যমে করে এবং ডাস্ট কালেক্টর সিস্টেম রেখে নিয়মিত পানি স্প্রে করা যেত তাহলে দূষণ অনেকাংশে কমে যেত বলে মনে করেন পরিবেশবিদরা। মুন্সিগঞ্জের ড্রেনেজ সিস্টেম পরিবেশ বান্ধব না হওয়ার কারণে সিমেন্ট কারখানার বর্জ্য নদীতে গিয়ে পড়ছে। ফলে নদীসহ আশপাশের পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।

নদী দূষণ এবং বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থায় অবহেলার জন্য বিভিন্ন সিমেন্ট ফ্যাক্টরিকে অনেক সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত জরিমানা করেছে। জরিমানার পরও সতর্ক হয়নি শাহ সিমেন্ট , এ্যামিরেটস সিমেন্ট, ক্রাউন, প্রিমিয়ার সিমেন্টসহ একাধিক প্রতিষ্ঠান। সিমেন্ট ফ্যাক্টরি গুলোর পাশেই আবাসিক এলাকা রয়েছে। কয়েক হাজার মানুষের বসবাস এখানে। প্রায় প্রতিনিয়ত সিমেন্ট ফ্যাক্টরি গুলোর এমন নির্মম আচরনে অতিষ্ট ও মানবেতর জীবন কাটছে স্থানীয়দের। জনজীবন চরম হুমকির মুখে।

সিমেন্ট ফ্যাক্টরির পাশেই রয়েছে বাচ্চাদের প্রাইমারি স্কুল মাদ্রাসা সহ রেস্টুরেন্ট। খুব কাছাকাছি এবং নদীর এপাড়েই রয়েছে প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। সব মিলিয়ে এখানে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী রয়েছে এখানে। ফ্যাক্টরিগুলোর পরিবেশ দূষণের ফলে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিসহ নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। সিমেন্ট কারখানার কালো ধোঁয়ায় মাথা ব্যাথা, শ্বাস কষ্টসহ আমাদের নানা সমস্যা হয়। পূর্ব-পশ্চিম মুক্তারপুর, হাটলক্ষীগঞ্জ, নয়াগাঁও এলাকার মানুষজন খুব কাছে হওয়ায় তারা প্রায়ই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। নদীর পাড়গুলোতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বৃক্ষরোপণ করা হলেও তা কোন কাজে আসছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শাহ সিমেন্টের একজন শ্রমিক জানান, প্রায়ই কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ি। ভেতরের পরিবেশ এতটাই খারাপ যে শ্বাষ-প্রশ্বাস নিতেও মাঝে মাঝে কষ্ট হয়। এসব থেকে রক্ষার জন্য আমাদের কোনো ব্যবস্থা নেই। শাহ সিমেন্টে দায়িত্বরত নামপ্রকাশে অনিচ্ছু এক কর্মকর্তা জানান, আমরা এ বিষয় গুলো নিয়ে যথেষ্ট আন্তরিক। আমরা চেষ্টা করছি সিমেন্টের ডাস্ট এর বিষয়টি আমাদের প্রতিষ্ঠান মালিক কর্তৃপক্ষকে জানানোর। এটা পরিবেশ ও মানবজীবনের জন্য ক্ষতিকর। আশা করছি মালিক পক্ষ তারা খুব দ্রুতই ব্যবস্থা নিবে।

একদিকে যেমন এই অঞ্চলের দূষণের জন্য প্রধান কারণ সিমেন্ট ফ্যাক্টরি, বিভিন্ন কারখানা। অন্যদিকে এই অঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থানের একটা বড় অংশ এই এখানে।

পরিবেশ অধিদফতরের উপ পরিচালক আখতারুজ্জামান টুকু বলেন, কাঁচামাল আনলোডের ব্যাপারে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার এবং দূষণ কিভাবে কম হয় তা সে ব্যাপারে তাদের অবগত করেছি। তবে আমাদের অভিযান করার কোন নিয়ম নেই। সদর দপ্তর থেকে এসব প্রতিষ্ঠান মনিটরিং করা হয়। আমরা শুধু ফিজিক্যাল দেখাশুনা করি। ডাস্ট দুষন রোডে আমাদের কড়া হুশিয়ারি থাকলে ও ফ্যাক্টরি গুলোকে কোন কথা শোনানো যাচ্ছে না।

অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট শীলু রায় জানান, এ বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি। জেলা আইনশৃঙ্খলা মিটিংয়ে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের সাথে সমন্বয় করে খুব দ্রুতই আমরা ফ্যাক্টরিগুলোর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যাবস্থা গ্রহন করা হবে।

নিউজজি

Leave a Reply

Your email address will not be published.

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.